ভুট্টা গাছ বাড়তেই জমিতে দেওয়া হচ্ছে সার। রায়গঞ্জের রায়পুরে। ছবি: গৌর আচার্য।
ভুট্টা খেতের অদূরে টিন-বাঁশের বেড়া দেওয়া বেশির ভাগ ঘর। গ্রামে দোকানের সামনে আড্ডা চলছে। দেখে বোঝার উপায় নেই, বছর দেড়েক আগে এখানে উথালপাথাল হয়েছে। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার দিঘলগাঁও।
প্রেমিক যুগলকে হাত বেঁধে রাস্তায় ফেলে বেপরোয়া ভাবে পেটাচ্ছিল যে যুবক, যে এলাকায় শাসকদলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত, চোপড়ার সেই তাজিমুল হক ওরফে জেসিবি-র ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমেছড়াতেই রাজ্যে হইচই পড়ে যায়। উঠে আসে অভিযোগ— সালিশির নামে রাতভর ডেরায় আটকে অত্যাচার, মোটা টাকা আদায়, এলাকায় জমি দখল-সহ আরও নানা কিছু। দিঘলগাঁওয়েই ডেরা তাজিমুলের। তার খোঁজ করতে গ্রামের কয়েক জন বললেন, ‘‘কিছু দিন জেলে ছিল। এখন জামিন পেয়ে এলাকাতেই আছে। কোথায় আছে, বলতে পারব না। জানেন তো, ওর মাথার উপরে কার হাত!’’ এলাকার চার বারেরবিধায়ক এবং এ বারেও চোপড়া বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী হামিদুল রহমান বলেন, ‘‘ওই যুগলকে মারধর করাটা ঠিক হয়নিজেসিবি-র। এখন সব ঠিক আছে। তৃণমূল ওকে প্রশ্রয় দেয় বলে যাঁরা অভিযোগ করেন, তাঁরা ঠিক বলেন না।’’ তবে এলাকাবাসী জানাচ্ছেন, গত পঞ্চায়েত ভোটে এইএলাকায় তৃণমূল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছিল। তাই ভোট এলে তাঁদের দুশ্চিন্তা হয়।
দুশ্চিন্তার কারণ আরও আছে। রাজ্যে হইচই পড়েছিল ট্যাব-দুর্নীতি নিয়ে। সরকারি প্রকল্পের টাকা পাইয়ে দিতে অন্য জনের অ্যাকাউন্টের নথি দিয়ে পড়ুয়াদের জন্য বরাদ্দ হওয়া সরকারি ট্যাবের টাকা হাতানো। অভিযুক্তদের একটি বড় অংশই চোপড়ার বাসিন্দা। এলাকাবাসীর দাবি, কাজের অভাবেই তরুণ প্রজন্ম জেসিবি-র দল বা ট্যাব-কাণ্ডের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। এলাকার চা বাগানগুলির জমি দখল করার ‘সিন্ডিকেট’-এ ঢুকছে। রাজ্যের যে সব জেলায় পরিযায়ী শ্রমিকদের বাস তুলনায় বেশি, তার মধ্যে উত্তর দিনাজপুর অন্যতম। জেলায় অন্তত দু’লক্ষ শ্রমিক পরিযায়ী। হামিদুল বলেন, ‘‘এলাকায় রাসায়নিক সার তৈরির হাব গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসংস্থান হবে।’’ কবে হবে, স্পষ্ট জবাব মেলে না।
তবে, এমন হামিদুলকেও চাপে ফেলেছে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। কারণ, এলাকার ভোটারদের মধ্যে বহু সংখ্যালঘুর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। গোয়ালপোখরে তৃণমূলের প্রার্থী, বিদায়ী বিধায়ক তথা মন্ত্রী গোলাম রব্বানিও চাপে। তাঁর নিজের নাম তালিকায় তুলতেই আদালত পর্যন্ত দৌড়তে হয়েছিল। মন্ত্রী জানান, তাঁর এলাকায় ৬৯ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার। তালিকায় ৪৫ হাজার ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। ফলে, ট্রাইবুনালে আবেদন জানিয়ে কত জন ভোটাধিকার ভোটের আগে ফেরত পাবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ইটাহার বিধানসভা কেন্দ্রের উজানতোড় গ্রামের যুবক তাপস রায় হায়দরাবাদে পরিযায়ী শ্রমিক। ভোটের জন্য গ্রামে ফিরেছেন। তাঁর ক্ষোভ, ‘‘এখানে কাজ নেই। আমার মতো অনেককে বাইরে কাজ করতে যেতে হচ্ছে।’’ তাপসের বাবা শোভারাম রায়ের কথায়, ‘‘ছেলে বাইরে থাকে বলে ওর খরচ বেশি। কয়েক বিঘা জমিতে ভুট্টা লাগিয়েছি। তাতেই চলছে।’’ রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের পানিশালায় রায়গঞ্জ-শিলিগুড়ি জাতীয় সড়কের ধারেপ্রায় একশো একর জমিতে এখন ভুট্টার চাষ। যেখানে এমস হাসপাতালগড়ে ওঠার কথা ছিল। এলাকারবাসিন্দা শাহনাজ আলি বলেন, ‘‘আমার কয়েক বিঘা জমি হাসপাতালের জন্য দেব বলেছিলাম। ৫০ জনের মতো মানুষ জমি দিতে তৈরি ছিলেন। কিন্তু এমস আর হল কই!’’ রায়গঞ্জে এমসের কথা যিনি বলতেন সর্বত্র, তিনি কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। ভোট এলে তাঁর কালিয়াগঞ্জের বাড়ি লোকজনে গমগম করত। প্রিয়রঞ্জন প্রয়াত হওয়ার পরে তাঁর বাড়ি শুনশান। তবে রায়গঞ্জের কংগ্রেস প্রার্থী তথা জেলা কংগ্রেস সভাপতি মোহিত সেনগুপ্ত বলছেন, ‘‘প্রিয়দার স্বপ্ন বাস্তব করতে চাই আমরা।’’
কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের রাধিকাপুর স্টেশন লাগোয়া এলাকায় বহির্বাণিজ্যের পরিকাঠামো গড়েওঠার কথা ছিল। বহু কাজের সুযোগ হবে, স্বপ্ন ছিল এলাকাবাসীর। এলাকার বাসিন্দা দিলীপ রায় বলেন, ‘‘কবে বহির্বাণিজ্যের পরিকাঠামো হবে, কবে চালু হবে, কেউ জানে না!’’ বিজেপির ‘গড়’ বলে পরিচিত কালিয়াগঞ্জে অনেক তেলকল রয়েছে। সেগুলিও ধুঁকছে। আশ্রমিক জীবন ছেড়ে এ বার কালিয়াগঞ্জে বিজেপির প্রার্থী উৎপল ব্রহ্মচারীর দাবি, ‘‘রাধিকাপুরে বহির্বাণিজ্যের পরিকাঠামো, আমদানি-রফতানির হাব গড়তে দলীয় সাংসদ কার্তিকপাল তদ্বির করছেন। তেল সংস্থাগুলিকে নিয়ে স্থানীয় ব্র্যান্ড গড়া যায় কিনা, দেখা হবে।’’ এলাকার উন্নয়ন সে ভাবে না হওয়া, কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে করণদিঘিতে। চাকুলিয়ায় স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রশ্ন তুলছেন কংগ্রেসের প্রার্থী আলি ইমরান রমজ (ভিক্টর)। তবে বিদায়ী বিধায়ক তথা এ বারের প্রার্থী মিনহাজুল আরফিন আজাদের দাবি, এই ভোটের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এসআইআর।
উত্তর দিনাজপুরের ন’টি আসনের মধ্যে গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূল সাতটি নিজের দখলে রেখেছিল। বিজেপি জিতেছিল কালিয়াগঞ্জ এবং রায়গঞ্জে। রায়গঞ্জে বিজেপিরটিকিটে জিতে তৃণমূলে যান কৃষ্ণ কল্যাণী। এ বারও তিনি রায়গঞ্জে তৃণমূল প্রার্থী। এ বার রায়গঞ্জ-সহ জেলার অন্তত তিনটি আসন দখলে নিতে মরিয়া বিজেপি। তার মধ্যে বিদায়ী বিধায়ক তথা রাজ্যের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সত্যজিৎ বর্মণের হেমতাবাদ কেন্দ্রটি রয়েছে। হেমতাবাদ, করণদিঘি, ইটাহার, চাকুলিয়া, গোয়ালপোখরের মতো এলাকাগুলি কৃষিপ্রধান। সব বিধানসভা এলাকাতেই প্রচুর ভুট্টা চাষ হয়। সিপিএমের জেলাসম্পাদক আনওয়ারুল হকের কটাক্ষ, ‘‘জেলায় কাজ নেই। অথচ, কৃষিভিত্তিক শিল্প, বিশেষত, ভুট্টা প্রক্রিয়াকরণ শিল্প হতে পারত। লম্বা ভুট্টা গাছের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ।’’ উত্তর দিনাজপুরের বিজেপি সাংসদকার্তিক পাল বলেন, ‘‘জেলায় কৃষিভিত্তিক বাণিজ্যের প্রসার এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলেও, তৃণমূল সে দিকে তাকায়নি।’’ সত্যজিৎ বলেন, ‘‘কৃষক পরিবারের ছেলে আমি। এলাকায় ভুট্টার হাব গড়ার জন্য চেষ্টা করছি।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে