—প্রতীকী চিত্র।
জঙ্গলের মাঝে সরু পিচের রাস্তার দু’ধারে শাল, পিয়াল, অর্জুন গাছের ডালে ঝুলছে রকমারি পতাকা। ঘাসফুল, পদ্ম আর কাস্তে-হাতুড়ির। সে রাস্তার ধারেই মাটির ঘরের সামনে উঠোনে বসে শালপাতার থালা বুনছিলেন রানি মুর্মু। পাঁচশো থালা বুনলে দুশো টাকা মেলে। তার সঙ্গে খেতমজুরি করে যেটুকু আয়। রানি বলছিলেন, ‘‘শুধু লক্ষ্মীর ভান্ডারে কি চলে? সরকারি বাড়ি পাইনি। ঘরে প্রচারে এলে, নেতাদের বলতাম। কিন্তু রাস্তা থেকেই তো চলে গেলেন!’’
পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের জঙ্গলমহলে সিঁদুরডাঙা গ্রামের বাসিন্দা রানির মতোই অপ্রাপ্তির কথা জানানোর লোক খুঁজছেন কেতুগ্রামের মুরুন্দির শিবু মাঝি। ভাঙাচোরা মাটির ঘরে ত্রিপলের ছাউনিতে বাস। তাঁদের গ্রাম থেকে গত কয়েকটি ভোটে ভাল ভোট পেয়েছে বিজেপি। শিবুর প্রশ্ন, ‘‘সে জন্যই কি আমার মতো গরিব মানুষ বাড়ি পাচ্ছে না?’’
পূর্ব বর্ধমানের ১৬টি আসনেই গত বিধানসভা ভোটে জিতেছিল তৃণমূল। তার মধ্যে কাটোয়া, কেতুগ্রাম, আউশগ্রামের মতো কয়েকটিতে ব্যবধান ছিল হাজার বারো বা তারও কম। মঙ্গলকোট, গলসির মতো কেন্দ্রে প্রায় ২০ হাজার বা বেশি ব্যবধান থাকলেও, ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) কোথাও ২৪, কোথাও ৩২ হাজার ভোটারের নাম বাদ। বীরভূম লাগোয়া আউশগ্রাম, কেতুগ্রাম ও মঙ্গলকোট, এই তিন কেন্দ্রে তৃণমূলের পর্যবেক্ষক ছিলেন অনুব্রত মণ্ডল। গরু পাচার মামলায় তিনি গ্রেফতার হওয়ার পরে, সেগুলির দায়িত্ব পান দলের পূর্ব বর্ধমান জেলা নেতৃত্ব। আপাত-শান্তি বিরাজ করলেও, ভোটে উঁকি দিচ্ছে নানা অঙ্ক।
কেতুগ্রামে গত তিন বারের তৃণমূল বিধায়ক শেখ সাহানেওয়াজ এ বারও প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছেন বিজেপির অনাদি ঘোষ (মথুরা)। এ ছাড়া, বাম সমর্থিত আইএসএফ, হুমায়ুন কবীরের আমজনতা উন্নয়ন পার্টি এবং কংগ্রেস— তিন পক্ষই সংখ্যালঘু মুখকে প্রার্থী করেছে। এসআইআরে এখানে ৩৯ হাজারের বেশি নাম বাদ পড়েছে। বেশির ভাগই সংখ্যালঘু প্রধান কেতুগ্রাম ১ ব্লকের। কাঁটারি গ্রামের হানিফ শেখ, ইশা হক শেখদের প্রশ্ন, ‘‘আমাদের ২০০২ সালের তালিকায় নাম ছিল। এ বারও আছে। কিন্তু ছেলেমেয়েদের নাম বাদ! এটা কী ভাবে সম্ভব?’’ বিজেপির আশা, এত ভোটার বাতিল এবং সংখ্যালঘু চার প্রার্থীর ভোট ভাগাভাগির ফসল তুলবে তারা। বীরভূমের জেলা সভাধিপতি কাজল শেখের ভাই সাহানেওয়াজ যদিও এ সব আমল দিচ্ছেন না। বলছেন, ‘‘এসআইআরে হয়রানির ক্ষোভে যত ভোট আমাদের ঘরে আসবে, তা নাম বাদের সংখ্যাকে ছাপিয়ে যাবে।’’
পাশের কেন্দ্র মঙ্গলকোটে বইছে অন্য চোরাস্রোত। বাম আমলের শেষ দিকে একাধিক তৃণমূল কর্মী খুন হন এলাকায়। বহু নেতা-কর্মী অত্যাচারিত হন বলে অভিযোগ। তাঁদের অনেকের দাবি, ক্ষমতায় এসে দল আর মূল্য দেয়নি। অনেকে নিষ্ক্রিয়, অনেকে অন্য দলে। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে এলাকায় দলের সংগঠন তৈরি করা নেতা বিকাশ চৌধুরী সম্প্রতি শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। বিকাশের আক্ষেপ, ‘‘ওরা আমাকে দলটা করতে দিল না!’’ তাঁর দাবি, ‘‘তৃণমূল ফল ভুগবে। সংখ্যালঘুরাও ওদের পাশ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে। মঙ্গলকোট এ বার বিজেপির।’’ তৃণমূল প্রার্থী অপূর্ব চৌধুরীর প্রতিক্রিয়া, ‘‘দীর্ঘদিন যাঁরা মানুষের সঙ্গে নেই, তাঁদের কথার গুরুত্ব নেই।’’
আউশগ্রাম ও গলসিতে এ বার প্রার্থী বদলেছে তৃণমূল। আউশগ্রামে লড়ছেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহার। গলসিতে প্রার্থী জামালপুরের বিদায়ী বিধায়ক অলোক মাঝি। এই দুই বিধানসভা এলাকা থেকে কয়েকশো একর করে জমি নিয়ে বাম আমলে তৈরি হয়েছিল পানাগড় শিল্পতালুক। সেখানে চালু রয়েছে গোটা চারেক বড় কারখানা ও বেশ কিছু ছোট শিল্প। এলাকার সিপিএম নেতা কোহিনুর গঙ্গোপাধ্যায়ের দাবি, জমিদাতা সব পরিবার থেকে কারখানায় নিয়োগের চুক্তি হলেও, তা হয়নি। বড় কারখানাগুলিতে হাজার দুয়েক ঠিকা শ্রমিকের মধ্যে স্থানীয় মাত্র শ’পাঁচেক। স্থানীয় বাসিন্দা সন্দীপ নন্দী জানান, তাঁদের পরিবারের বিঘা চারেক জমি গিয়েছে শিল্পতালুকে। তাঁর ক্ষোভ, ‘‘চাকরি তো পেলামই না, উল্টে, কারখানার দূষণে জেরবার আমরা।’’ এই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রাজু পাত্র বুলডোজ়ার নিয়ে মনোনয়ন জমা দিতে যাওয়ার পরে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফোন করে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। উজ্জীবিত রাজুর দাবি, ‘‘আমি ভূমিপুত্র, এলাকার সমস্যা মেটাতে পারব। তাই সংখ্যালঘুরাওআমার পাশে।’’
আউশগ্রামে গত বারের প্রার্থী কলিতা মাজির উপরেই ভরসা রেখেছে বিজেপি। পরিচারিকার কাজ করা কলিতার প্রশংসা শোনা গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর মুখে। তবে তিনি হেরে যান। তাঁকে আবার প্রার্থী করায় অখুশি ছিল দলেরই একাংশ। কলিতার বক্তব্য, ‘‘পরিবারে মনোমালিন্য থাকেই। আগের বার নতুন ছিলাম। এ বার অভিজ্ঞ। জিতে প্রথম কাজ হবে, আদিবাসী-সহ সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের উন্নয়ন।’’ সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অশেষ কোনারের কটাক্ষ, ‘‘রাষ্ট্রপতি আদিবাসী বলে যারা রামমন্দির উদ্বোধনে তাঁকে ডাকেনি, তাদের মুখে এ সব কথা মানায় না।’’ তাঁর দাবি, ‘‘বিজেপি থেকে ভোট ফিরবেই, তৃণমূলের অনেকেও এ বার আমাদের ভোট দেবেন।’’
জেলা তৃণমূল সভাপতি রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় কাটোয়ার ছ’বারের বিধায়ক। এ বার তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রার্থী তাঁরই ভাইপো রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এক বাড়িতেই থাকেন তাঁরা। রণজিতের অভিযোগ, ‘‘ওঁকে (রবীন্দ্রনাথ) শিখণ্ডি করে এলাকায় তৃণমূলের কিছু লোক অনাচার করছে। বিজেপিকে পাঁচ বছর অন্তর শুধু ভোটের সময়ে দেখা যায়। বিকল্প একমাত্র কংগ্রেস।’’ বিজেপি প্রার্থী তথা দলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি কৃষ্ণ ঘোষের দাবি, ‘‘তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ গেরুয়া-ঝড়ে পরিণত হচ্ছে।’’লড়াই কি এ বার কঠিন? জেলা তৃণমূল সভাপতি রবীন্দ্রনাথের জবাব, ‘‘কিচ্ছু কঠিন নয়। যাঁরা এত কথা বলছেন, তাঁরা মানুষের পাশে নেই। শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন। জেলার দু’-তিনটি আসনে হয়তো হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।’’
এসআইআরে বাদ যাওয়া ভোটারের অঙ্ক, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের চোরাস্রোত এবং প্রকল্পের সুবিধা বা চাকরি না পাওয়ার মতো ক্ষোভ— বড় কাঁটা গোটা তিনেক। কাকে, কোনটা বেঁধে, দেখার অপেক্ষা।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে