চা হাতে চলছে আড্ডা। — নিজস্ব চিত্র
বোলতার চাকের মতো ভিড়টা গমগম করছে।
— পাতুদা, একটা লাল চা, লেবু মেরে দাও তো!
— হবে না।
— সে কি গো! এখনও তো উনিশে মে আসতে এ হপ্তা। এর মধ্যেই লেবু শেষ?
— বাজারে ৫টাকা জোড়া লেবু সে খেয়াল রাখো?
— আরে বাজার যার গরম তার দাম উঠবেই।
তা বলে লেবু চা বন্ধ! তুমিও শেষে পাল্টি খাচ্ছ পাতুদা?
পাশ থেকে কে যেন ফোড়ন কাটল, “তোরই বা লাল লেবুর জন্য এত বায়নাক্কা কেন?’’
রঘুনাথগঞ্জে নির্বাচনী অফিসের নাকের ডগাতেই পাতুদার চায়ের দোকানে নিত্য দিন জমজমাট আড্ডায় রীতিমতো ঠোকাঠুকি।
হরেক রকম লোক। তাপু হালদার প্রাথমিক শিক্ষক। রূপম রায় মার্চেন্ট নেভির ইঞ্জিনিয়ার। ভোটের সময়ে এসেছেন বাড়িতে। ‘দাদু’ সৌমিত্র দাস ছোট ব্যবসায়ী। ব্যবসা রাজীব চট্টোপাধ্যায়েরও। আর কত জন!
পাতুদা বলছেন, “চা তৈরি করতে করতে কান খাড়া হয়ে থাকে ওদের দিকেই। ওদের আড্ডা থেকে আমি অনেক জেনেছি। জেনেছি দিদির ডিগ্রি নিয়ে হুলুস্থূলু কাণ্ড। মোদির ডিগ্রিটাও নাকি জাল। নারদা-সারদা সব বুঝতে পারি, কিন্তু গুছিয়ে বলতে পারি না।”
ভাল নাম সন্তোষ দাস, বাবা সেই কবে ডেকেছিলেন ‘পাতু’ বলে। সেই থেকে ছেলে-বুড়ো সবাই ডাকছে ‘পাতুদা’। লটারির দোকান দিয়ে শুরু। এখন চা আর টা, পাশে আছে লটারি।
ঠোকাঠুকির ঠেকে পাতুদা প্রায় নিশ্চিত, ‘‘জঙ্গিপুরে জাকির ফুল ফোটাচ্ছেই! মিছিলে কত লোক দেখেছো? এ শহরে মিছিল তো কম দেখলাম না, কিন্তু জাকিরের মিছিল এক নম্বরে।” ‘‘আরে রাখো তোমার জাকির’’ — পাতুদাকে হাঁকিয়ে দেন দাদু— “শহরের ভোটেই পিছোবে জাকির। ওর লিড তো মাত্র দু’টি পঞ্চায়েতে, আহিরণ আর জরুরে। সোমনাথ ওকে মারবে মির্জাপুর আর দফরপুরে। বাকি উনিশ-বিশ।”
তাপু কিন্তু জঙ্গিপুরের হিসেবটা অত সহজ দেখছে না। তুড়ি মেরে বলছে, “জোটের কাঁথায় আগুন। আরে বাবা, তৃণমূলকেই যদি ঠেকাবি তবে ঠোকাঠুকি কেন? মাস্টারমশায়ের বয়সটার কথা তো একবার ভাববি। ৮৩ পেরিয়েছে। উনি জোটেও নেই, ভোটেও নেই। সব বহরমপুরি দাদার প্ল্যান, বুঝবি না!” সুতির আজাহার চা খেতে খেতেই শুনছিলেন আড্ডা। তিনি এসেছিলেন পরিবহণ দফতরের কাজে। কয়েক বার হালকা ভাবে বলার চেষ্টা করছিলেন— ‘‘জঙ্গিপুরে জাকিরদা কতদূরে দাদা?’’ তাঁর প্রশ্ন শুনেই আগাপাশতলা চেয়ে দেখল কয়েক জোড়া চোখ। আড্ডায় এ আবার কে ? পাশ থেকে লাল চায়ে চুমুক দিতে দিতেই ভেসে এল, “আহিরণ টপকে এসে জাকির জরুরে আটকে গেছে দাদা! শহরে ঢুকতে পারছে না।”
রাজীব অবশ্য বলছেন, “কাঠফাটা রোদে জোড়া ফুল শুকিয়েই গিয়েছিল প্রায়। বৃষ্টির জল পেয়ে ফের যেন জেগে উঠছে একটু একটু করে।” জাকির ভক্ত দুলাল দত্ত অবশ্য হিসেব নিকেশের ধারই ধারছেন না। বলছেন, “আরে, অধীর চৌধুরীই তো বলে দিয়েছেন, জঙ্গিপুর ছাড়া ২১টায় জোট। মানে জাকির জিতছে।” প্রবীণ শিক্ষক পেনসনের হিসেব নিতে এসেছিলেন ট্রেজারিতে। দুধ-চা শেষ করে গেলাসটা আস্তে করে টেবিলে নামালেন। বললেন, “অধীর বলেছেন, জঙ্গিপুরে জোট জিতবে না। কারণ তিনি জোটের প্রার্থী হিসেবে যাকে বেছেছিলেন তিনি যাবেন তিন নম্বরে। তা হলে ভুলটা কী বলেছেন?”
হা! হা! হা! ফোকলা দাঁত বের করে হাসছেন পাতুও। সেটা বুঝে, নাকি না বুঝে, সেটা অবশ্য ঠাহর হল না।