ছবি: গৌতম প্রামাণিক
বছর সতেরো আগের কথা। বহরমপুর ব্যারাক স্কোয়ার মাঠে মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলছে। জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার রাজেশ কুমারও মাঠে হাজির ছিলেন। ওই খেলার ধারা বিবরণী দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জেলা পুলিশের গাড়ির চালক সুশান্ত রাহাকে। তিনিও স্বাভাবিক নিয়মেই ধারাভাষ্য দিয়ে চলেছেন। আচমকা সুশান্ত রাহার বদলে ধারাভাষ্যে ভেসে এল সেই সময়ের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বর কানে যেতেই পুলিশ সুপার রাজেশ কুমার তটস্থ। তিনি বলেই ফেলেন, ‘‘এটা কী হল! সিএম-এর তো আসার কথা ছিল না!’’ পরক্ষণেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ পুলিশ সুপারের ‘ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল’। তাকিয়ে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী নয়, তাঁর কণ্ঠস্বর অবিকল নকল করে মাইকে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন সুশান্ত রাহা। পুলিশ সুপার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘‘সাবাশ রাহা! সাবাশ! চালিয়ে যাও।’’
সেই ‘নন ম্যাট্রিক রাহা’ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সাফল্য না পেলেও রাজ্যের বিনোদন জগৎ তিনি জয় করেছেন অবলীলায়। একটি টিভি চ্যানেলের প্রতিযোগিতামূলক বিনোদন অনুষ্ঠানে ‘সেরা মজারু’ হয়েছেন। আর একটি টিভি চ্যানেলে ‘হাসতে তাঁদের মানা’ শীর্ষক প্রতিযোগিতামূলক বিনোদন অনুষ্ঠানে তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন। অন্য আরও একটি টিভি চ্যানেলের ‘টক্কর’ শীর্ষক প্রতিযোগিতামূলক বিনোদন অনুষ্ঠানে তৃতীয় হয়ে অভিনেতা চিরঞ্জিতের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন সুশান্ত। অভিনেতার কাছ থেকে পুরস্কার নিয়েই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি। বাংলা সিনেমার অভিনয় জগতেও তিনি আজ নিজেকে সফল অভিনেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এ পর্যন্ত তিনি ছ’টি বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেছেন। অরুণ রায় পরিচালিত সিনেমা ‘এগোরো’তে অভিনয় করেছেন। অভিনয় করেছেন মুম্বই-এর এস কে পরিচালিত বাংলা সিনেমা ‘মিসটেক’-এ। প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য পরিচালিত তিনটি বাংলা সিনেমা— ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত ও ‘গোয়েন্দা’য় সুশান্ত রাহা অভিনয় করেছেন। তিনি অভিনয় করেছেন অনুরাগপতি পরিচালিত সিনেমা ‘অপু কাজলের গল্প’-এ।
তিনি দু’টি টিভি ‘সিরায়াল’-এও অভিনয় করেছেন। ‘পূর্ব পশ্চিম’ ও ‘ধূপছায়া’ নামের দু’টি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। পুলিশের মধ্যে ‘প্রতিভাবান পুলিশ’ (মেরিটোরিয়াস পুলিশ) শীর্ষক জাতীয় স্তরের একটি পুরস্কার দেওয়া হয়। আগে সেই পুরস্কার তুলে দিতেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি। কয়েক বছর থেকে সেই প্রথা বাতিল হয়। এখন সেই পুরস্কার তুলে দেন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। সুশান্ত রাহা বলেন, ‘‘২০১৪ সালে আমাকে ‘মেরিটোরিয়াস’ পুরস্কার দেওয়া হয়। রেড রোডের একটি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই পুরস্কার আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন।’’
একটি টিভি চ্যানেলের প্রতিযোগিতামূলক বিনোদন অনুষ্ঠানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গি হুবহু নকল করে বিচারক, তথা বিশিষ্ট হাস্যকৌতুক অভিনতা হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা পেয়েছিলেন সুশান্ত। সেই সুখস্মৃতিতে সুশান্ত রাহা আজও বিভোর।
ডাক বিভাগের কর্মীর ছেলে সুশান্ত প্রথম জীবনে বহরমপুরের একটি বিখ্যাত ক্লাবের ‘এ ডিভিশন’ ফুটবল দলের গোলকিপার ছিলেন। সেই সূত্রে তিনি দৌড় ও ঝাঁপের মতো তিনটি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে পুলিশের কনস্টেবলের চাকরি পেয়েছিলেন। পরে আবারও পরীক্ষা দিয়ে পুলিশের গাড়ির চালক হন। এখন তিনি সিআইডি বিভাগের গাড়ির চালক। ফুটবল খেলার পাশাপাশি তিনি কৈশোর থেকেই অভিনয়ের প্রতি বিশেষ রকমের অনুরক্ত ছিলেন। সেই অনুরাগ তাঁকে টেনে নিয়ে যায় ‘বহরমপুর রেপার্টরি থিয়েটার’-এ। তখন দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থা জারি ছিল। ওই সময় বহরমপুরের ‘প্রান্তিক’ নাট্যগোষ্ঠীর কর্ণধার অঞ্জন বিশ্বাসের নাটক ‘নানা হে’ দেশ কাঁপিয়েছিল। পরে রেপার্টরি থিয়েটার’ সেই ‘নানা হে’, প্রদীপ ভট্টাচার্যের ‘স্বরবর্ণ’ ও ‘মুক্তধারা’ নাটক নিয়ে দিল্লিতে জাতীয় নাট্যোৎসবে যোগ দেয়। সেই নাট্যদলের এক জন অভিনেতা হিসাবে সুশান্ত রাহাও দিল্লি পাড়ি দিয়েছিলেন।
নাটকের পাশাপাশি বহরমপুরের এক রেশন ডিলার অসিত দত্ত ওরফে গনাদা ও ব্যাঙ্ককর্মী টোকন মুখোপাধ্যায়ের কাছে তিনি হাস্যকৌতুক শেখেন। সেই শিক্ষা তাঁকে আজ দেশের অন্যতম সেরা কৌতুকাভিনেতায় পরিণত করেছে। তিনি এখন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু, প্রাক্তন মন্ত্রী আনিসুর রহমান, বিশিষ্ট কৌতুকাভিনেতা নবদ্বীপ হালদার ও ‘কেষ্ট মুখার্জী’র মতো অনেকের কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গি অবিকল নকল করে মানুষকে মুগ্ধ করেন। কয়েক বছর আগের কথা। তখন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী আনিসুর রহমান। বহরমপুর ব্যারাক স্কোয়ার মাঠে পঞ্চায়েতরাজের রাজ্য উৎসবের আসর বসেছে। মঞ্চে উঠলেন সুশান্ত রাহা। মাইক থেকে ভেসে আসা আওয়াজ শুনে মন্ত্রী হতচকিত। মন্ত্রী হতবাক! তিনি ভাবতে শুরু করেন, ‘‘একই মেলায় হুবহু একই রকমের দুটো পঞ্চায়েত মন্ত্রীর আবির্ভাব হয় কী করে!’’ অবশেষে মাইকের কাছে গিয়ে চক্ষুকর্ণের বিবাদ মিটিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন, দ্বিতীয় পঞ্চায়েতমন্ত্রী হলেন পুলিশের গাড়ির চালক সুশান্ত রাহা। তখন আনিসুর রহমানের সে কী হাসি!
বছর সতেরো আগের কথা। ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন। কয়েক জন পুলিশ অফিসারকে নিজের বাংলোয় নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছেন মুর্শিদাবাদ তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার রাজেশ কুমার। নিমন্ত্রিতের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন পুলিশের গাড়ির চালক সুশান্ত রাহা। পুলিশ সুপার তাঁর অধস্তনদের বলেন, ‘‘ইকটা কোথা মাথায় রাখতে হোবে। কাম করতে হবে। লেকিন পোশ্নো হচ্ছে পদমো কোথায় আছে? পদমো আছে নদীতে। পদমো তুলতে আঁচড় খেলে চোলবে না। নেতা আছে, মনতিরি আছে। ওদের আঁচোড় খেলে চোলবে না। হামি আইপিএস আছি। কাম করবো চলে যাবো।’’ এটা বলার পরেই সুশান্তের কছে রাজেশ কুমারের ফরমাস, ‘‘হামার ই কোথাটার নকল বোলো। দেখি তুমি কোতো বোড়ো ওস্তাদ আছো সুশান্ত!’’ নিমেষে অবিকল নকল করায় পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ডেপুটি পুলিশ সুপাররা সবাই হেসে কুটিকুটি। সে কী হাসি! সুশান্ত কিন্তু হাসেননি।