Asha Bhosle

ওঁর মাপের শিল্পী আর জন্মাবেন না

তিনি বরাবরই স্পষ্টবক্তা। গান তোলার ব্যাপারে খুব ‘সিরিয়াস’ ছিলেন। সঙ্গীত পরিচালক যখন শেখাতেন, মন দিয়ে শুনতেন। অল্প গুনগুনও করতেন। সাধারণত, এক বার মহড়া করেই গান তুলে নিতে পারতেন।

আরতি মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১০
Share:

আশা ভোসলে। — ফাইল চিত্র।

আশাজির সঙ্গে আমার দীর্ঘ সাড়ে ছ’দশকের পরিচয়। সেই কোন ছোটবেলায় মার্ফি কনটেস্টে প্রথম হওয়ার পরে আলাপ। সেই পরিচয় থেকে ধাপে ধাপে ঘনিষ্ঠতা, যা শেষ হয়ে গেল তাঁর মৃত্যুতে। যখন প্রথম পরিচয়, তখনও আশাজি কিংবদন্তি হয়ে ওঠেননি। বরং লতা মঙ্গেশকর, গীতা দত্তের মতো শিল্পীদের পাশে নিজস্ব জায়গা খুঁজছেন। ধীরে ধীরে দেখলাম, কেমন করে তিনি হয়ে উঠলেন ভারতীয় লঘুসঙ্গীতের এক জন অপরিহার্য শিল্পী। লতা মঙ্গেশকরের পাশে যিনি জায়গা করে নিলেন এবং লতাদিদির পরেই যাঁর নাম উচ্চারিত হতে লাগল। শুধু হিন্দি নয়, বাংলা গানের জগতেও তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

আশাজির সঙ্গে প্রচুর আড্ডা দিয়েছি। তিনি বরাবরই স্পষ্টবক্তা। গান তোলার ব্যাপারে খুব ‘সিরিয়াস’ ছিলেন। সঙ্গীত পরিচালক যখন শেখাতেন, মন দিয়ে শুনতেন। অল্প গুনগুনও করতেন। সাধারণত, এক বার মহড়া করেই গান তুলে নিতে পারতেন। কঠিন গান হলে বলতেন, ‘‘অউর এক রিহার্সাল কি জ়রুরত হ্যায়। আপ আইয়ে গা। নেহি তো বোলিয়ে গা কাঁহা জানা হ্যায়। ম্যায় পহুঁচ যাউঙ্গি।’’ এতটাই পেশাদার এবং ভদ্র ছিলেন। গানের সম্পর্কে খুব সাবধান থাকতেন। গান ‘হিট’ হলে তবে তো তিনি জনপ্রিয় হবেন। তাই কাজে কখনও ফাঁকি দিতেন না বা তাড়াহুড়ো করতেন না।

আশাজির সঙ্গে হিন্দি গান ছাড়াও বাংলা গান গেয়েছি। আশাজি হয়তো খুব ভাল বাংলা জানতেন না। কিন্তু বাঙালিদের সঙ্গে মিশতেন। ভাঙা ভাঙা বাংলা বলার চেষ্টা করতেন। লতাদিদি তো মানস মুখোপাধ্যায়ের কাছে রীতিমতো বাংলা শিখতেন। মানস মুখোপাধ্যায় গায়ক শানের বাবা। আশাজিও বাঙালিদের সঙ্গে বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করতেন। তখন তো তাঁর চার পাশে প্রচুর বাঙালি। পঞ্চমদা ছিলেন। যদিও বাড়িতে তাঁরা হিন্দিতে কথা বলতেন। তা ছাড়া, শচীন দেব বর্মণ, কিশোরদা, হেমন্তদা, মান্নাদা, সলিলদা, আমি— সবাই তো বাঙালি। আরও কেউ কেউ ছিলেন। গানের উচ্চারণে কোনও ভুল হলে কিশোরদা কিংবা হেমন্তদা শুধরে দিতেন। আশাজি বাড়িতে বাংলা বলতেন বাংলা উচ্চারণ শেখার জন্য। আমি গেলে বলতেন, ‘‘কী হল? এটা কী করে করলে?’’ যেটুকু জানতেন, সেটুকু বলার চেষ্টা করতেন। উচ্চারণে ভুল হলে ধরিয়ে দিতাম। সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে নিতেন। শেখার অদম্য ইচ্ছে ছিল।

আশাজি খুব ভাল রান্না করতেন। আমি খেয়েছি। একটু মরাঠি ধরনের রান্না। খেতে ভাল লাগত। পঞ্চমদা সাধারণত আশাজির রান্না ছাড়া খেতেন না। রেকর্ডিংয়ে গেলে খুব চা খেতে দেখেছি। দুধ-চা। কিন্তু রেকর্ডিং শেষ না করে খেতেন না। গানের আগে খাওয়াদাওয়ার পাট রাখতেন না। হয়তো টানা কাজ হচ্ছে, তখন বললেন, ‘‘খিদে পেয়েছে। একটু তাড়াতাড়ি করবেন?’’

একটা গানকে কত ভাল করা যায়, তার চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। হয়তো আমার আর আশাজির ডুয়েট। রেকর্ডিংয়ে গিয়ে সমানে বলতে থাকতেন, ‘‘অ্যায়সা কর।’’ পঞ্চমদা বলতেন, “দুই বোনই গানের ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে। একটুও অবহেলা করে না।’’ আশাজি গানের পিছনে প্রচুর পরিশ্রম করতেন। সেই পরিশ্রমকে কুর্নিশ করতে হয়। কত জনের কাছে শিখেছেন! সেই শিক্ষকদের কথাও বলতেন রেকর্ডিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে। বাড়িতে গেলে দেখতাম, বড়ে গুলাম আলি সাহেবের গান শুনছেন।

আশাজি চলে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকে চুপ করে বসে আছি। কত কথা মনে পড়ছে! এত বছরের স্মৃতি! আমি নিশ্চিত, আশা ভোঁসলের মাপের শিল্পী আর জন্মাবেন না। ওই মাপের শিল্পী এক বারই আসেন এ পৃথিবীতে।

অনুলিখন: সিজার বাগচী

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন