পর্দায়, পর্দার বাইরে নবনীতা মালাকার। ছবি: ফেসবুক।
জলপাইগুড়ির নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। আবার বড় মেয়ে তিনি। সুন্দরী, মেধাবী, বুদ্ধিমতী। নাচ-গান-অভিনয় পারেন। অল্পেই সন্তুষ্ট কন্যে বাবার আদরের। নবনীতা মালাকার, যাঁকে দর্শক ধারাবাহিক ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এ ‘রোহিণী’ হিসাবে দেখছেন।
খলনায়িকা এত সুন্দরী! দর্শক বোধহয় ভাল করে রেগেও উঠতে পারছেন না আপনার উপর?
বুধবার কাকতালীয় ভাবে শুটিং ছিল না নবনীতার। আনন্দবাজার ডট কম-এর কাছে নিজেকে উজাড় করলেন তাই অকপটে। হাসতে হাসতে বললেন, “জলপাইগুড়ির মেয়েটি তো নায়িকা হবে বলে কলকাতায় পা রেখেছিল। অভিনয়দুনিয়ায় এসেছিল। একাধিক ধারাবাহিকে ইতিবাচক চরিত্রে অভিনয়ও করেছি। দেখা গেল দর্শক খলনায়িকা হিসাবেই আমায় বেশি চাইছেন!” জানালেন, সত্যিই তাঁর উপর দর্শক রাগেন না। উল্টে সমাজমাধ্যমে জানতে চান, “এত মিষ্টিমুখের একটি মেয়ে কী করে হাসতে হাসতে খুন করে?”
এ ভাবেই পর্দায় হাসতে হাসতে ‘দুষ্টুমি’ করেন নবনীতা মালাকার। ছবি: ফেসবুক।
তার পর ভাঙলেন আসল রহস্য। নবনীতা বললেন, “ধারাবাহিক ‘এই ছেলেটা ভেল ভেলেটা’য় আমার চরিত্র ইতিবাচক ছিল।’ হঠাৎ করে সেটি নেতিবাচক হয়ে যায়। কিন্তু আমি ইতিবাচক অভিনয়ই করব। ফলে, নেতিবাচকতাকে ইতিবাচকতার মোড়কে মুড়ে ফেললাম। দেখলাম, দর্শকের পছন্দ হচ্ছে।” তার মধ্যেই তিনি কালার্স বাংলার ‘মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য’ ধারাবাহিক (২০১৭) বা ‘সাগর জ্যোতি’তে ইতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। “জানেন, কালার্স বাংলার ধারাবাহিকে ‘লক্ষ্মীপ্রিয়া’ হয়েছিলাম। দর্শক দেখে বলতেন, যেন জ্যান্ত লক্ষ্মীপ্রতিমা!” তার পরেও তিনি খলনায়িকা হিসাবেই জনপ্রিয়। সেই সময় প্রচুর কাজ ছেড়েছেন। শুধু নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করবেন বলে!
মা-বাবা সেই সময়ে বুঝিয়েছিলেন নবনীতাকে। অভিনেত্রীকে লড়তে হবে। নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। ছোট বোনকে মানুষ করতে হবে। বাবার পাশে দাঁড়াতে হবে। নিজের দায়িত্বও নিতে হবে। তার মধ্যেই নবনীতার মা পক্ষাঘাতে বিছানা নিয়েছেন! এ বার কী করবেন তিনি? “আস্তে আস্তে নিজেকে বোঝালাম, পর্দায় থাকতেই হবে। হেরে গিয়ে জলপাইগুড়িতে ফিরে যাব না। কারণ, পরিবারের সবার দায়িত্ব যে আমার!” ক্রমশ নেতিবাচকতাতেই ইতিবাচকতা খুঁজে পেয়েছেন। “পর্দার নায়িকা হতে চেয়েছিলাম। নানা ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে ঈশ্বর আমায় বাস্তব জীবনের ‘হিরোইন’ বানিয়ে দিয়েছে!” এ ভাবেই বুঝিয়েছেন নিজেকে।
নায়িকা থেকে খলনায়িকা নবনীতা! ছবি: ফেসবুক।
ধারাবাহিক ‘নিমফুলের মধু’তে কাজের পর নবনীতা অঙ্কুশ হাজরা-ঐন্দ্রিলা সেনের ছবি ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’-এ কাজ করেছেন।
দুই নাকে নথ। পরনে দক্ষিণ ভারতীয় সিল্ক। ধারাবাহিক ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এ নবনীতার সাজ আলোচিত। আদালতের দৃশ্যে আইনজীবী হিসাবে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত। পর্দায় তাঁকে নায়ক-নায়িকা ভয় পান। বাস্তবের ‘দুষ্টু লোক’দের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর মন্ত্রগুপ্তি কী সুন্দরী নবনীতার? গলায় যেন ব্যথার আভাস। নবনীতা অকপট, “দুষ্টু লোকেরা আমায় ছাড়েনি তো! প্রচণ্ড কষ্ট দিয়েছে! অনেক অত্যাচার সয়েছি। চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে। পাথর হয়েছি। তবে আজ পর্দার ‘রোহিণী’ হতে পেরেছি!” বলতে বলতে ফিরে গিয়েছেন অতীতে। তিনি উত্তরবঙ্গের মেয়ে। কথায় বাঙাল ভাষার ছোঁয়া। ক্যামেরার সামনে কী করে অভিনয় করতে হয়, জানতেন না। শুরুতে তাই খুব নিন্দা কুড়োতে হয়েছে অভিনেত্রীকে। “বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। সকলের সঙ্গে মিষ্টিমুখে কথা বলি। ইন্ডাস্ট্রিতে দেখি সে সবের কোনও মূল্যই নেই! খুব কষ্ট হত।”
ঐন্দ্রিলা সেনের সঙ্গে ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’-এ অভিনয় করেছেন নবনীতা। ছবি: ফেসবুক।
১১ বছর ধরে দুঃখের আগুনে পুড়তে পুড়তে তিনি আজকের নবনীতা মালাকার, যিনি আজ সব সইতে পারেন।
ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন দেখাও কি বন্ধ করে দিয়েছেন? কলেজবেলায় প্রচুর প্রেমপ্রস্তাব পেয়েছেন। অভিনয়ে আসার আগে বিয়ের অনেক সম্বন্ধও এসেছে...। ফের ফোনের ও পারে হাসিমাখা কণ্ঠস্বর। নবনীতা বললেন, “কাজের শুরুতে বয়স কম। ভীষণ অপরিণত। সবাইকে তখন আপন ভাবতাম। নিজের মনে হত। জীবন ঘা দিতে দিতে বুঝিয়েছে, কেউ আপন হয় না। কেবল মা-বাবা আর ঈশ্বর ছাড়া।” চোখ খুলেছে নবনীতার। তিনি কলকাতায় নিজের ফ্ল্যাটে থাকেন। নিজেই ঝুল ঝাড়েন, ঝাঁট দেন! সন্ধ্যাবাতিও দেখান ঈশ্বরকে। আর মনে মনে বলেন, “কোনও আত্মীয় কখনও সহযোগিতা করেননি। আজ তাঁরা আমার পরিচয়ে পরিচিত হতে চান! নিজের বলতে মা-বাবা-বোন। তাঁরাও অনেক দূরে। একা ফ্ল্যাটে তুমি আর আমি। তুমিই আমার আপন। আমায় দেখো ঠাকুর।”