Poila Boishakh 1433 In Tollywood

বসুশ্রীতে উত্তমকুমার গাইছেন, রাস্তার ভিড়ে দাঁড়িয়ে ট্রাম! পয়লা বৈশাখের স্মৃতিকথায় তারকারা

সেই রামও নেই, সেই রাজত্বও। এখনও বসুশ্রী সিনেমাহলে টলি তারকারা একজোট হন পয়লা বৈশাখে। ছোটরা প্রণাম করেন বড়দের। উত্তমকুমারের আমলে যে জৌলুস ছিল, সেটা কি এখন আছে? অতীত ফিরে দেখল আনন্দবাজার ডট কম।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩০
Share:

সত্তরের দশকের তারকাদের বর্ষবরণ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দৃশ্য ১: সময়টা সত্তর-আশির দশক। বা তারও আগে। পয়লা বৈশাখের আগের দিন থেকে সাজোসাজো রব টালিগঞ্জের স্টুডিয়োগুলোয়। একমুঠো ছবির মহরত। তাতে উপস্থিত থাকবেন ছবির পরিচালক, অভিনেতা, কলাকুশলীরা। আমন্ত্রিত অন্যান্য অভিনেতা, কলাকুশলীও। টলিউড তখন আক্ষরিক অর্থেই ‘পরিবার’।

Advertisement

দৃশ্য ২: দক্ষিণ কলকাতার বসুশ্রী সিনেমাহলের ঝাড়পোঁছ চলছে। বাংলা নববর্ষের দিনে এখানেই জড়ো হবেন উত্তমকুমার থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সুচিত্রা সেন থেকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় হয়ে গোটা টলিউড। দিনকয়েক আগে থেকে হলমালিক মন্টু বসু সবাইকে সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছেন।

পয়লা বৈশাখের ভোর। দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট, বাগবাজার-সহ সমস্ত মন্দিরে তিলধারণের জায়গা নেই। গিজগিজ করছে লোক। ব্যবসায়ীর ভিড় বেশি। তাঁরা লক্ষ্মী-গণেশপুজোর পাশাপাশি ব্যবসার খাতাপুজো করাবেন। সেই ভিড়ে দাঁড়াতে হত ছবির প্রযোজকদেরও! ওটাই যে তাঁদের ব্যবসা। বাড়ির পুজো, ব্যবসার পুজো সকাল সকাল মিটতেই গুটিগুটি পায়ে সকলে বসুশ্রী সিনেমাহলে। তার পর?

Advertisement

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, উত্তমকুমার। ছবি: ফেসবুক।

অতীত স্মৃতি বুনতে আনন্দবাজার ডট কম-এ সূত্রধরের দায়িত্বে বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তিনি তখন বাংলা ছায়াছবির নতুন জনপ্রিয় নায়ক। উত্তমকুমারের সঙ্গে দারুণ সখ্য। পর্দার ‘দুই ভাই’-এর মতোই উত্তমকুমার বড়, বিশ্বজিৎ ছোট ভাই। “শুধু কি উত্তমকুমার? ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়— কে না আসতেন!” অধুনা মুম্বইবাসী বর্ষীয়ান তারকা স্মৃতিমেদুর। টুকরো স্মৃতির কোলাজ জুড়ে সেই সময়কে যেন জীবন্ত করার চেষ্টা তাঁর। বিশ্বজিৎ বললেন, “পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন ছবির মহরত। যেন ঢল নামত নতুন ছবির ঘোষণায়! সেই তালিকায় যাঁরা নাম লেখাতে পারতেন না, তাঁদের জন্য অক্ষয়তৃতীয়া। আমি নিজে কত ছবির মহরত করেছি।”

সে দিন ধুতি-পাঞ্জাবি, শাড়ির দিন। নতুন পোশাক পরে, পুজো দিয়ে, পুজোর মিষ্টি নিয়ে উপস্থিত সকলে। মেয়েরা সকলের কপালে পুজোর ফুল ছুঁইয়ে দিচ্ছেন। কপালে এঁকে দিচ্ছেন সিঁদুরের ফোঁটা। পয়লা বৈশাখে কোনও ছোটবড় ভেদাভেদ নেই। সবাই যেন এক বাড়ির সদস্য। প্রযোজকেরা অফিসে নতুন লক্ষ্মী-গণেশ, পুজো করা খাতা রেখে চলে আসতেন স্টুডিয়োয়। প্রায় প্রত্যেক ফ্লোরে অন্তত একটা করে ছবির মহরত। চা, শিঙাড়া, মিষ্টির ছড়াছড়ি। কাঠের চেয়ার পাতা। সেখানে সবাই বসতেন। মহরত মিটলে চা-জলখাবার খাওয়ার পালা। কেউ শুধু মুখে যেন ফ্লোর থেকে বেরিয়ে না যান, কড়া নজর থাকত প্রযোজকের।

Advertisement

অতিথি, আমন্ত্রিতদের জন্য যে কাঠের চেয়ার পাতা হত, সেগুলো কারা পাততেন?

সত্যজিৎ রায়ের একাধিক ছবির প্রযোজক অরোরা ফিল্মসের বর্তমান কর্ণধার অঞ্জন বসু সেই গল্প শুনিয়েছেন। জানিয়েছেন, সে সময়ে তিনি এবং তাঁর সমসাময়িকেরা নতুন প্রজন্ম। তাঁদের ঘাড়ে দায়িত্ব আগেভাগে সেই চেয়ার পেতে রাখার, যাতে কোনও আমন্ত্রিত দাঁড়িয়ে না থাকেন। “বাড়ির পুজো সেরে আমরা তাড়াতাড়ি চলে আসতাম। হাতে হাতে কাজ করব বলে। খুশি মনেই বড়দের নির্দেশ পালন করতাম। কী যে ভাল লাগত”, বললেন অঞ্জন। এখন আর চেয়ার পাতার দায়িত্ব তাঁর নেই। কারণ, তিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘সিনিয়র’। এখন আর মহরতের চলও নেই। তবে তাঁর প্রযোজনা সংস্থার অফিসে আজও লক্ষ্মী-গণেশপুজো হয়।

অনুষ্ঠানে সুপ্রিয়া দেবী, তরুণকুমার, দ্বিজেন মুখোপাধ্যয়, বাসবী নন্দী, উত্তমকুমার, শ্যামল মিত্র। ছবি: ফেসবুক।

এটা সেই আমলের মহরতের ছবি। বসুশ্রী সিনেমাহলে তখন কী হত?

পুরনো দিনের গল্প শোনাতে গিয়ে টুকরো ছবি তুলে ধরেছেন রঞ্জিত মল্লিক। তাঁর কথায়, “ওরে বাবা, সে ভিড় দেখার মতো ছিল। ভিতরে উত্তমকুমার গাইছেন। সিনেমাহল কানায় কানায় ভর্তি। মন্টুবাবু বাইরে অ্যামপ্লিফায়ারের ব্যবস্থা করেছেন। উত্তমকুমারের গান শুনবেন বলে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন পথচলতি মানুষ। অনুষ্ঠান শেষ হলে তবে তাঁরা নড়তেন। আমরা বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতাম।” মন্টুবাবু প্রয়াত। এখনও বসুশ্রী সিনেমাহলে টলিপাড়ার জমায়েত হয়। ছোটরা প্রণাম করেন বড়দের। কিন্তু উত্তমকুমারের আমলে যে জৌলুস ছিল, সেটা কি এখন আছে? “কোথায় সেই আন্তরিকতা! মহরত তো হয়ই না। কারণ, এখন সে ভাবে বাংলা ছবিই তৈরি হয় না। সিঙ্গল স্ক্রিন কমতে কমতে তলানিতে। সব কেমন বদলে গিয়েছে। হারিয়ে গিয়েছে আমাদের সময়।” প্রতি বছর এই দিনটায় পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে রঞ্জিতবাবুর। মনকেমন করে তাঁর।

বাস্তব ঘটনা, এখন সব কিছুই ‘কর্পোরেট’ হয়ে গিয়েছে। সেই ঝাঁ-চকচকে ব্যাপার থাবা বসিয়েছে বাঙালির সাধের নববর্ষ উদ্‌যাপনেও। রঞ্জিতবাবু তাই আগের মতো হৃদয়ের টান খুঁজে পান না। বিশ্বজিৎবাবুর কথায়, “সারা বছর যেখানেই থাকি, পয়লা বৈশাখে আমি বসুশ্রী সিনেমাহলে। সকাল থেকে ফুলে, মালায় সেজে উঠত গেট। মন্টুবাবু এবং সাংবাদিক-পরিচালক অজয় বিশ্বাস দাঁড়িয়ে থেকে তত্ত্বাবধান করতেন।” ভিতরে তারকায় ঠাসা। তার পর যাঁরা অনুষ্ঠানের পাস পেতেন, তাঁরা উপস্থিত থাকতেন। প্রত্যেক শিল্পী একটি করে গান গাওয়ার সুযোগ পেতেন। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, আরতি মুখোপাধ্যায়— সেই আমলের সমস্ত ‘হু’জ় হু’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত। তবলায় খ্যাতনামী রাধাকান্ত নন্দী। শিল্পীরা সে দিন সকালে অন্য কোনও গানের অনুষ্ঠান রাখতেন না বসুশ্রীতে গাইবেন বলে। অনুষ্ঠান শেষ হত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান দিয়ে। অনুষ্ঠানশেষে প্রত্যেককে মন্টুবাবু নিজে আপ্যায়ন করতেন।

সিনেমাহলের একপাশে কয়েকটি সিঁড়ি। সেগুলো পেরিয়ে ম্যানেজার, হলমালিকের বসার ঘর। সেখানে মন্টু বসুর সঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তমকুমার, জহর রায়রা বসে। বড়দের সঙ্গে হয়তো বাড়ির ছোটরা গিয়েছে সেখানে। তার গাল টিপে প্রশ্ন তাঁদের, “কী গো, কোন ক্লাসে পড়ো?” মনে করিয়ে দিলেন অরোরা ফিল্মস কর্পোরেশনের অঞ্জনবাবু। “একবার ভারী মজা হয়েছিল। বাবা নতুন গাড়ি কিনেছেন। উত্তমকুমার হঠাৎ বায়না জুড়লেন, ‘শুনেছি, এক প্রযোজক নতুন গাড়ি কিনেছেন। আমি তাঁর গাড়িতে চেপে বসুশ্রীতে যাব। আবার বাড়ি ফিরব। ওই গাড়িতেই চাপব। অন্য কোনও গাড়িতে নয়। তিনি গাড়ি না দিলে অনুষ্ঠান করতেই যাব না!’” উত্তমকুমারের আবদার কে ফেলবে? নব্য প্রযোজকের উপর দায়িত্ব বর্তেছিল উত্তমকুমারকে আনা-নেওয়া করার। গল্প বলতে বলতে গর্বে, আনন্দে গলা বুজে এসেছে তাঁর।

অনুষ্ঠানশেষে গ্রুপ ফোটোতে শিল্পীরা। ছবি: ফেসবুক।

সে সময়ের বাংলা ছায়াছবিতে যেমন গানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তেমনই নববর্ষের অনুষ্ঠানেও। আরতি মুখোপাধ্যায় যত দিন কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন, তত দিন বসুশ্রীর অনুষ্ঠানে গেয়েছেন। “বরাবর সাদা শাড়ি পরতে ভালবাসি। ওই দিনও নতুন সাদা শাড়ি পরে পৌঁছে যেতাম নির্দিষ্ট সময়ে। যে বছর আমার যে গান জনপ্রিয় হত, সেটাই গাইতাম। সেটা আধুনিক হতে পারে। কিংবা ছবির গান।” অনুষ্ঠানশেষে বাড়িমুখো আরতি। “ওই দিন আমাদের অলিখিত ছুটি। সারা দিন প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো। ভালমন্দ খাওয়াদাওয়া— এই আর কি”, মুম্বই থেকে ফোনে স্মৃতিকথায় নিজের অভিজ্ঞতা জুড়ে দিলেন গায়িকা।

পয়লা বৈশাখের মিলনমেলায় দিনভর হুল্লোড় টলিউডের। মহরত, বসুশ্রীর অনুষ্ঠান মিটলে তবে ছাড়া পেতেন তারকারা। একদিনের বৈঠকী আড্ডা ফেলে, খুব যে বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল তাঁদের, তেমনই নয়। কেবল একটু ব্যতিক্রম সত্যজিৎ রায়ের নায়িকা মাধবী মুখোপাধ্যায়। তিনি বরাবর এসব থেকে দূরে। নিজের পরিবারে। বড়পর্দার চারুলতার দাদু বিখ্যাত চিত্রশিল্পী শীতল বন্দ্যোপাধ্যায়। সাদার্ন পার্কের মামাবাড়ি পয়লা বৈশাখের দিন গমগম করত। বাড়ির সমস্ত সদস্য ঝেঁটিয়ে সেখানে হাজির। কীর্তনের আসর বসাতেন সেই সময়ের খ্যাতনামী চিত্রকর শীতলবাবু। নাম করা কীর্তনিয়ারা আসর মাতাতেন। তার পর খাওয়াদাওয়ার এলাহি আয়োজন।

পাশাপাশি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, উত্তমকুমার। ছবি: ফেসবুক।

মাধবী বড় হয়েছেন। অভিনয়ে এসেছেন। কিন্তু পয়লা বৈশাখের দিন মামাবাড়িতে যাওয়ার রেওয়াজ বন্ধ করেননি। “আমার ছবির মহরত থাকলে যেতেই হত। সেটা মিটলেই আমি বাড়িমুখো।” বিয়ের পর নিজের সংসার হয়েছে। সেখানে বিশেষ দিনে বিশেষ রান্নাবান্না করতেন। সে কথা বলতে বলতে হেসে ফেলেছেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। “জানেন, পয়লা বৈশাখে কোনও দিন কাউকে কিচ্ছু কিনে দিইনি। পোশাকও না! আমি শুধু পেয়ে এসেছি। সবাই দু’হাত ভরে আমায় দিয়েছেন।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement