Anik Dutta death

রুচিশীল ছবিও যে বাণিজ্যিক সাফল্য পেতে পারে, ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ বানিয়ে দেখিয়ে দেন অনীকদা

প্রয়াত অনীক দত্ত। পরিচালকের প্রথম ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ কী ভাবে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল, তা নিয়ে লিখলেন আর এক পরিচালক সুমন ঘোষ।

Advertisement

সুমন ঘোষ

শেষ আপডেট: ২৭ মে ২০২৬ ১৯:১৮
Share:

অনীক দত্তের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও লিখলেন সুমন! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

অনীক দত্তের সঙ্গে আলাপ ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির মাধ্যমে। তার পরে কত আলোচনা, আড্ডা। বাংলার নবজাগরণ থেকে রামমোহন রায়— আলোচনার পরিধি ছিল বিরাট। সেই সঙ্গে ছিল ওঁর রসবোধ। তাই অনীকদার চলে যাওয়া আমার জন্য ক্ষতি অবশ্যই।

Advertisement

অনীকদাকে নিয়ে লিখতে গেলে প্রথমে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির কথাই আসে। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ মুক্তি পায় ২০১২ সালে। তার আগে বাংলায় ঠিক দুই ধরনের ছবি হত। এক দিকে হত সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ছবি। যে ছবির নির্দিষ্ট দর্শক ছিলেন গ্রাম ও মফস্‌সলের মানুষ। অন্য দিকে গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মতো পরিচালকেরা তৈরি করতেন ‘আর্ট ফিল্‌ম’। আর ঋতুপর্ণ ঘোষ ও অপর্ণা সেনের ছবির বক্তব্য তুলনামূলক ভাবে আপামর জনতার আর একটু কাছের ছিল। যদিও সাধারণ দর্শকের থেকে কিছুটা দূরত্ব বরাবরই ছিল তাঁদের ছবির। সেই জায়গায় আবির্ভাব অনীক দত্তের ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর।

‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ভীষণ ভাবে রুচিশীল মননের ছবি। কিন্তু বাঙালি দর্শক হইহই করে প্রেক্ষাগৃহ ভরিয়ে ছিল সেই ছবি দেখতে। এই ছবির আগে দীর্ঘ দিন বাংলা ছবিতে রসবোধের স্থান ছিল শূন্য। ‘কমেডি’ ছবি হয়তো ছিল। কিন্তু সেগুলি অনেকেরই মোটা দাগের মনে হত। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ সে জায়গায় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল। তবে প্রথম দু’দিনে কেউ আন্দাজ করতে পারেননি, এই ছবি এমন বিপুল সাড়া ফেলবে।

Advertisement

তখন সদ্য মুক্তি পেয়েছে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’। আমি আমেরিকায়। ওখান থেকেই দেখি ছবিটি। আমি অভিভূত হয়ে যাই। ভাবতে পারিনি, বাংলায় এমন ছবিও সম্ভব! সঙ্গে সঙ্গে এক সংবাদপত্রে ছবিটি নিয়ে আমি লিখলাম। সেখানে তরুণ মজুমদার ও সত্যজিৎ রায়ের ছবির সঙ্গে তুলনা টানি ইচ্ছা করেই। আসলে, আত্মবিশ্বাসহীন বাঙালিকে এই নামগুলির মাধ্যমে ধাক্কা দিতে হয়। তার পরে বিভিন্ন জায়গায় ছবিটি নিয়ে শুরু হল লেখালিখি। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ক্রমশ হয়ে উঠল বক্সঅফিসে সফল ছবি। বাংলা ছবির ইতিহাসে ওই ছবি চিরকালীন হয়ে থাকবে। রুচিশীল ভাবেও যে সাধারণ মানুষকে ছবি দেখানো যায়, তা বুঝিয়ে দেয় ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’।

সংবাদপত্রে আমার সেই লেখা পড়ে অনীকদা একটি মেলও পাঠিয়েছিলেন। সেখান থেকেই ওঁর সঙ্গে আলাপ, আড্ডার শুরু। ব্যক্তি অনীক দত্তকে নিয়েও লিখতেই হয়। এমন ‘ক্লাস’-এর লোক ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। পুঁথিগত বিদ্যা নয় শুধু, সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ ছিলেন অনীকদা। ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় সমান ভাবে দক্ষতা ওঁর। ওঁর ছবির মাধ্যমে বাংলা ছবিতে যে পরিবর্তন এসেছিল, তা সেই সময়ে খুবই প্রয়োজন ছিল। শুধু ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ নয়। ‘বরুণবাবুর বন্ধু’, ‘অপরাজিত’-র মধ্যে রুচি ছিল, আবার সারল্যও ছিল। ওঁর ছবিতে অকারণ ‘আঁতলামো’ ছিল না। নিজে উচ্চশিক্ষিত হলেও তার ভার থাকত না ছবিতে। কাজের সঙ্গে যেন দর্শক যোগ তৈরি করতে পারে, সেটিই ছিল মূল লক্ষ্য।

‘পথের পাঁচালী’র নির্মাণ নিয়ে তৈরি ছবি ‘অপরাজিত’। সাধারণ দর্শককে এই ছবি দেখাতে প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে আসা খুব সহজ ছিল না। কিন্তু অনীক দত্ত সেটা করে দেখিয়েছিলেন। কোনও অতিনাটকীয়তা ছাড়াই সেই ছবি রমরমিয়ে চলেছিল। সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে সবচেয়ে ভাল গবেষণা যদি কারও থাকে, তিনি অনীক দত্ত। এমন একজন মানুষের চলে যাওয়া বাংলা চলচ্চিত্রের কাছে বড় ক্ষতি তো বটেই।

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement