Celebrity Interview

আমার ‘শাস্তিমূলক বদলি’ হয়েছিল, তবে কেউ কাবু করতে পারেনি! এখন ভাবলেই নস্টালজিক লাগে

এক ভোট নিয়ে আসে আরও বহু ভোটের স্মৃতি। সে সব সময়, সে সময়ের রাজনীতি কেমন ছিল? পুরনো সে সব ভোটের কথা ফিরে এল তারকার কলমে।

Advertisement

পরান বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫০
Share:

ভোটের স্মৃতি নিয়ে পরান বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

যখন ভোট দেওয়ার বয়স হয়নি, আমি তখন থেকেই ভোটে শামিল। ভোটের দিন যাঁরা ভোটকেন্দ্রে বসতেন সেখানে আমরা যেতাম, টুকটাক কাজ করে দিতাম। কোনও দরকারি কাগজ হয়তো এগিয়ে দিলাম, আঠা দিয়ে কিছু একটা সাঁটিয়ে দিলাম। এই সবের বদলে আমাদের জিলিপি আর গজা খেতে দেওয়া হত। এখন তো এ সব ভাবাই যায় না। আমাদের সময় ভোট মানে উৎসব। ছোট থেকেই সিঁথি এলাকায় থাকি। পুরো এলাকা জুড়ে দেখতাম, কালীচরণ ঘোষ রোড থেকে সাউথ সিঁথি পর্যন্ত সারা রাস্তা জুড়ে রংবেরঙের ত্রিকোণ কাগজ কেটে কেটে সুতোয় আটকে টাঙানো হত। মনে হত, কোনও উৎসবে সেজে উঠেছে পাড়াগুলো। চোঙা নিয়ে বলতে বলতে চলে যেত একদল কর্মী, আবার পরিক্রমা হত পাড়ায় পাড়ায়। তখন কংগ্রেস ছিল, ফরওয়ার্ড ব্লক ছিল, আরএসপি ছিল। সিপিএম তখন হয়নি, সিপিআই ছিল। একই পাড়ার ছেলেরা কেউ হয়তো কংগ্রেসের পোস্টার মারছিল, তার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। সেই ছেলেটাই আবার সিপিআইয়ের পোস্টার সাঁটাতে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে হাত লাগাল। কাজ শেষ করে সবাই একসঙ্গে চা খাচ্ছে। বোঝার উপায় ছিল না, কে কোন দলের সমর্থক।

Advertisement

নস্টালজিক পরান বন্দ্যোপাধ্যায় ছবি: সংগৃহীত

মনে আছে, আমাদের এখানে রাধা সিনেমার মালিক ছিলেন বলাই বিশ্বাস, তিনি এক বার ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁকে ঘিরে ভোটের দিন স্লোগান চলছে ‘মিষ্টি যদি খেতে চাও, বলাই বিশ্বাসকে ভোট দাও’। রাজনীতির স্লোগান, কিন্তু কী স্লোগান ভাবুন! ভোটের দিনটা আমাদের কাছে ছিল ছুটির দিন। সবাই পাড়ায় হইহই করছে। সবাই ঠেক করে বসে থাকত। তখন টানা রিকশা ছিল বেশি। এক এক করে ভোটারদের নিয়ে যাওয়া হত ভোটকেন্দ্রে। এক মাসিমা হয়তো ভোট দিতে যাচ্ছেন। রিকশায় উঠবেন, দুই দলের সমর্থকই বলে উঠল, ‘মাসিমা, মনে আছে তো!’ মাসিমা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ বাবা’। অন্য দলের সমর্থককেও একই উত্তর দিলেন ভালবেসে, একগাল হেসে। এখন এ সব বলতে পারবে কেউ? বিধিভঙ্গের অভিযোগ উঠবে।

প্রথম ভোট দেওয়ার স্মৃতি উস্কে কী বললেন পরান? ছবি: সংগৃহীত

আমি প্রথম ভোট দিয়েছি ১৯৬২ সালে। সিপিআইকেই দিয়েছিলাম। বাড়ি থেকে কেউ বলে দেননি। ভোটচিহ্নটা পছন্দ হয়েছিল। কাস্তে আর ধানের শিষের ছবি ছিল, তাই দিয়েছিলাম। সত্তরের দশকে সব ওলটপালট হয়ে গেল। ১৯৬৭-তে রাজনীতির দলগুলোয় পরিবর্তন এল, নকশাল এল। ১৯৭৭-এ জরুরি অবস্থা এল। বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়ে গেল। সারা দেশে তখন সাংঘাতিক অবস্থা। কখন কী হয়ে যাবে কেউ জানে না। আমি তখন সরকারি চাকরি করতাম, পিডব্লিউডি রোডস-এ। আমার তখন ‘শাস্তিমূলক বদলি’ হয়েছিল বহরমপুরে। আমাদের কর্মচারীদের একটা সংগঠন ছিল, তার সদস্য ছিলাম আমি। কংগ্রেসের রাজত্ব ছিল তখন, আমাদের ভাল চোখে দেখত না কেউ। দূরে দূরে অনেকেরই বদলি হয়ে গিয়েছিল। আমি পাঁচ মাস থেকে চলে এসেছিলাম। বাকি পাঁচ মাস ‘নো ওয়ার্ক নো পে’-তে ছিলাম। জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পরে আবার যার যার জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

Advertisement

‘নস্ট্যালজিক’ পরান বন্দ্যোপাধ্যায় ছবি: সংগৃহীত

আমি তো থিয়েটার করতাম, বহরমপুরেও থিয়েটারের লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। আমায় কেউ কাবু করতে পারেনি। সেইসময় পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব নিলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। ১৯৭৭-এ নির্বাচন হল, বিরাট ধাক্কা খেল কংগ্রেস। ক্ষমতায় এল সিপিএম। সেইসময়ও প্রত্যেক প্রার্থীর নিজস্ব তাঁবু থাকত, তাঁরা ডেকে ডেকে খাওয়াতেন পাড়ার ছেলেদের। আমাদের সেইসময় সেটাই ছিল আনন্দ। এখন তো আর ভোটকেন্দ্রে যেতে পারি না। প্রবীণ নাগরিক হওয়ার জন্য এখন বাড়িতে আসে। আমারও বাড়িতে এসেছিল। তবে কৈশোরে উৎসবমুখর ভোটের কথা মনে পড়লে এখনও ‘নস্টালজিক’ লাগে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement