কিশোরকুমারের সঙ্গে লতা।
জীবনে খোদাতালার কাছ থেকে যা যা পেয়েছি, তার মধ্যে একটি বিশেষ সৌভাগ্য, স্বয়ং লতাজির কাছ থেকে গান তোলা। জানি না, কতটা কী গাইতে পেরেছি! কিন্তু আমার ভজন গানের এক জন শিক্ষক লতা মঙ্গেশকর। একটি বৈষ্ণব ভজন কী করে গাইতে হবে ভাবতে ভাবতেই লতাদিদির শরণাপন্ন হওয়া।
তখন তো আমি কলকাতায়, উনি মুম্বইয়ে। কিন্তু ফোন করতেই লতাজি অকৃপণ। ফোনেই আদর করে আমায় পুরো ভজনটা তুলিয়ে দিলেন। সঙ্গীতের এক জন শিক্ষার্থী হিসেবে জীবনে এ আমার বিরাট প্রাপ্তি। অত বড় কিংবদন্তী কণ্ঠ হয়েও সঙ্গীতের সামনে কী ভাবে নতজানু হতে হয়, তা-ও লতা মঙ্গেশকরকে দেখে দেখে শিখেছি। এই তো ২০১৪-র কথা! গোয়ায় আমার অনুষ্ঠানে একেবারে সামনে বসে আমায় শুনছেন লতাজি, ওঁর ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরের পুরো পরিবার। দেড় ঘণ্টা, দু’ঘণ্টা লতাজি মন দিয়ে গান শুনছেন। এর পরে উইংসের ধারে উঠে এসে, অত বড় শিল্পী যা বলছেন, তা ভাবলে আজও শিহরন হয়। লতাজি আমায় বললেন, ‘‘খাঁ সাহাব কেয়া অচ্ছি আওয়াজ আপকো দি হ্যায়!’’ আমি তখন শুধু ভাবছি, কথাটা কে বলছেন! লতা মঙ্গেশকরের মতো স্বর ভগবান আর কাকেই বা দিয়েছেন। আর তিনি আমায় এ কথা বলছেন। সত্যিকারের গুণী শিল্পীই বোধহয় এমন বলতে পারেন।
লতা মঙ্গেশকর কেমন শিল্পী সে কথা দয়া করে আমায় বলতে বলবেন না। ওঁর গানের কোনটা বেশি ভাল, তা-ও আমি বিচার করার কেউ নই! ছোট থেকে লতাজিকে শুনছি। তখন ভাবিনি কোনও দিন ওঁর কাছে যেতে পারব। ইতনা সুরেলি, জবরদস্ত, যার কোনও শেষ নেই। আমার জীবনে তিন-চার বার লতাজির সঙ্গে দেখা হয়েছে। খুব ভালবাসা পেয়েছি। ওঁর বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের নামে পুরস্কারের আসর বা অনুষ্ঠান মঞ্চেও লতাদিদি আমায় ডেকেছেন।
পরে ভেবে দেখেছি, আসলে কিন্তু ওঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা ঠিক এক প্রজন্মের নয়। লতাদিদির বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর আমার দাদা (মায়ের মেসো) উস্তাদ নিসার হুসেন খানের থেকে বয়সে অল্পই বড় ছিলেন। আমার দাদাজি তথা গুরু, নিসার হুসেন সাহেবের তানকারি, ছুট তান, বোল তান বা তারানা
লতাদিদির গোটা পরিবার খুব ফলো করতেন। পরে বুঝেছি ওঁর বাবার এই ঝোঁকটাই লতাদিদি, আশাদিদিদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছিল। আশাদিদির সঙ্গে তো আমার সঙ্গীত নিয়ে নিয়মিত এখনও কথা হয়। উনি প্রায়ই ফোন করেন। ফোনেই সঙ্গীতচর্চা, তার পরে তানপুরা নিয়ে আমরা বসে পড়ি। এই নতুন বছরে জানুয়ারির ২ তারিখেও আশাদিদির ফোন এসেছিল। তখনও জানি না, বছরের শুরুটাই সঙ্গীতভুবনে এত বড় দুঃসংবাদ বয়ে আনবে। লতাজির শরীর খারাপের খবরের পর থেকেই খুব খারাপ লাগছিল। এই কোভিড পরিস্থিতিতে যাঁদের হারিয়েছি, সঙ্গীত জগতের অন্য নক্ষত্রদের কথাও মনে পড়ছিল।
আমার সঙ্গে আদির (লতার ভাই হৃদয়নাথের পুত্র আদিনাথ মঙ্গেশকর) নিয়মিত কথা হয়। ওঁর কাছেই লতাদিদির হালহকিকতের সব খবর জানতে পারছিলাম। বয়স হয়েছিল। কঠিন লড়াই চলছিল। তবু ভাবছিলাম, উনি হয়তো ঘুরে দাঁড়াবেন!
আমি বার বার বলব, এ আমার পরম সৌভাগ্য, লতাজির স্নেহ, সাহচর্য আমি জীবনে পেয়েছি। এত বড় শিল্পীর কাছে মৃত্যুও অতি তুচ্ছ। লতা মঙ্গেশকরের চিরতরুণ কণ্ঠ, সুর কখনও স্তব্ধ হতে পারে না।
অনুলিখন : ঋজু বসু