shiboprosad Mukherjee birthday

‘বছর চব্বিশের বাচ্চা ছেলেটার বহু বদল ঘটেছে, শিবুর মতো মানুষকে চোখের সামনে দেখাটা বিরল ব্যাপার’

শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর কাছে ‘শিবু’, যাঁর উপর রাগ করতে পারেন, অভিমান করতে পারেন, যে তাঁকে আগলে রাখে। সেই পরিচালক শিবপ্রসাদ ৫২ বছর পূর্ণ হচ্ছে বুধবার। তাঁর জন্মদিনে কলম ধরলেন সহ পরিচালক নন্দিতা রায়।

Advertisement

নন্দিতা রায়

শেষ আপডেট: ২০ মে ২০২৬ ০৮:৫৯
Share:

শিবপ্রসাদের জন্মদিনে কলম ধরলেন নন্দিতা রায়। গ্রাফিক্স-আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক।

শিবুর সঙ্গে যখন আলাপ তখন সে একটা ২৪ বছরের বাচ্চা ছেলে। পড়াশোনা শেষ করে আমার সঙ্গে তখন কাজ করতে শুরু করেছিল। প্রথম দিনই দুটো জিনিস দেখেছিলাম— ওর ‘প্যাশন’, অন্যটা হল, অসম্ভব বৈচিত্র ছিল ওর মধ্যে। তখন আমি মোটের উপর টেলিভিশনের সফল পরিচালক। ও আমার সঙ্গে কাজ করা শুরু করে। প্রথম দিকে ছিল দিশাহীন এক তরুণ। অনেক কিছু করতে চায়। কিন্তু, কোনটা আসলে ঠিক করে করবে সেটা বুঝে উঠতে পারছিল না। সেই শিবুর ৫২ পূর্ণ হল। তবে পরিচয়ের পরে, এই এতগুলো বছরে এটা বুঝতে পেরেছি, শিবুর মতো একটা মানুষকে চোখে সামনে দেখাটাও একটা সৌভাগ্যের বিষয়।

Advertisement

এতগুলো বছরে মানুষ শিবুকে পাল্টাতে দেখেছি ক্রমাগত। ওর আচরণ থেকে ব্যবহার অনেক কিছুর ক্ষেত্রে নিজের মধ্যে বদল এনেছে। আর সেটা ভালর জন্যই। যে বদলটা চোখে পড়ার মতো সেটা হল, আগের থেকে শিবু অনেক ঠান্ডা হয়েছে। একটা সময় ভীষণ দোলাচলে থাকত শিবু। একসঙ্গে অনেক কিছু করতে চাইত। খুব দিশাহীন থাকত। কিন্তু এখন যে ভাবে আমাদের প্রযোজনা সংস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাতে বুঝতে পারি, সেই বাচ্চা ছেলেটা একেবারে পরিণত হয়ে উঠেছে।

এতগুলো বছর এত কাছ থেকে দেখছি। আমার মনে হয়, শিবুকে শাসন করতে পারি সেই জায়গাটা আমার এখন আছে। আসলে ওকে আমি সবসময় ঠিক পথটা দেখিয়ে দিই। কারণ, আমার অভিজ্ঞতা তো ওর থেকে বেশি। ওর উপর রাগ করি, অভিমান করি। কিন্তু আবার মনে হয়, ওকে যেন ঠিক শাসন করতেও পারি না। একটা কথা বলতেই হয়, এই ‘উইন্ডোজ় প্রযোজনা সংস্থা’ আমাদের তো যৌথ প্রয়াস। কিন্তু এই সংস্থাকে দাঁড় করানোর পিছনে ও এত ঝড়ঝাপটা নিজে একা হাতে সামলেছে, যেটা আমি টের পর্যন্ত পাইনি। বলা ভাল, ও আমাকে টের পেতে দেয়নি। আসলে আমার সেটা ভাল লাগে। মনে হয়, এটাও ওর বেড়ে ওঠার লক্ষণ। আসলে আমাকে শিবু আগলে রাখে। অন্য দিকে, ও জানে কোনও জায়গায় বিপদে পড়লে পিছনে আমি আছি। আমি কখনও ওর কাজে হস্তক্ষেপ করি না। কারণ, প্রথম থেকেই ওকে আমি বেড়ে উঠতে দিতে চেয়েছিলাম। অনেক ক্ষেত্রে ও ভুল করেছে। কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ও এগিয়ে গিয়েছে। আসলে শিবু যখন আমার কাছে আসে তখন একটা মাটির তাল হিসেবে পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম, এই মাটির তাল থেকে সোনা তৈরি করতে পারব। আসলে আমি মানুষ চিনতে পারি। সে ভাবেই শিবুকে চিনতে পেরেছিলাম।

Advertisement

‘ইচ্ছে’ ছবির সেটে শট বোঝাচ্ছেন শিবপ্রসাদ।

এতগুলো ছবি আমরা একসঙ্গে করেছি। কখনও কেউ শুনবে না যে আমাদের সেটে কোনও অশান্তি হয়েছে। কারণ, শিবু অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার ছেলে এবং নিজের কাজটা দারুণ ভাবে জানে। তবে রাগও রয়েছে, রেগে গেলে রক্ষে নেই। তখন কারও ছাড় নেই। যদিও বাইরের মানুষজনের কাছে ওর একটা ভাবমূর্তি আছে। আর শিবু সেই ভাবমূর্তিটা বজায় রেখেই চলে। অনেকে ওকে ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ বলে থাকেন। আমার সেই শিবুকেও ভাল লাগে। তবে শিবুর উচ্ছ্বাস বা আনন্দের জায়গা কিন্তু ওর মা। সত্যি বলতে, মাকে ঘিরেই ওর জীবন। এখন শুটিং চলছে, অনেকদিন বাইরে আছে। বলছে, মাকে ছাড়া আর ভাল লাগছে না। আসলে মায়ের সামনে শিবু বাচ্চা হয়ে য়ায়। আধো আধো করে কথা বলে। মাকে আদর করে। এই শিবুকে কেউ চেনে না। আর শিবু মারাত্মক ভাবে শাহরুখ খানের ফ্যান। শাহরুখের যে কোন সিনেমা হলে বসে দেখবে, স্ক্রিনে শাহরুখ এলেই ‘গুরু’ বলে চিৎকার করব, সিটি বাজাবে। এটা অন্য শিবু। আমার আসলে ওর সব ক’টা দিকই ভাল লাগে।

ক্যামেরাবন্দি নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

এতগুলো বছর ওর সঙ্গে আছি। কখনও শিবুকে কোনও দাবি করতে দেখিনি। মানুষ জন্মদিনে উপহারের আশা করে। কেউ আবার ভাল খাবার খেতে চায়, ও তেমনটা নয়। কোনও দামি রেস্তরাঁয় খেতে যায় না, বাড়িতে সেদ্ধভাত, পেঁপের তরকারি ও সন্ধেবেলা মুড়ি-শসা, ব্যস! কাজের মধ্যে থাকাটা ওর কাছে ‘সেলিব্রেশন’। ও কাজ ছাড়া থাকতে পারে না। তাই ঘুরতে যাওয়া বা ছুটি কাটানো ব্যাপারটা উপভোগ করে না। সেটা ওর স্ত্রী জিনিয়াও জানে, ওকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া মানে শাস্তি দেওয়া। ছবি ও কাজ শিবুর জীবনের প্রথম প্রেম। শিবুর মতো মানুষকে চোখের সামনে দেখাটা বিরল ব্যাপার। এটা আমার সৌভাগ্য।

‘বহুরূপী’ ছবির শুটিংয়ের ফাঁকে।

শিবুর তিনটে সত্তাই দুর্দান্ত। অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক— তিনটে ভূমিকাতেই ও দারুণ। তার মধ্যে অভিনেতা শিবু অনবদ্য। শুটিংয়ের আাগে ওর নায়িকারা স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। কারণ, ও কাজের ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে। কিন্তু ক্যামেরার সামনে ও অন্য মানুষ। আর একটা বিষয়, প্রযোজক হিসাবে ওর উন্নতি করার আরও জায়গা আছে বলেই আমার মনে হয়। আমি শুধু চাইব, শিবুর যাতে সারাজীবনে কোনও বদল না ঘটে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement