দিনভর ক্লান্তি, অনীহার নেপথ্যে কারণ কী? ছবি: সংগৃহীত।
সারা দিন ক্লান্তিতে ধুঁকছে শরীর? কাজে অনীহা, ব্যর্থতার অনুভূতি, শক্তির অভাবে ভুগছেন দীর্ঘ দিন ধরে? এ সব কিছুর জন্য কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছে ব্যস্ত জীবন। অনেকেই মনে করেন, ক্লান্তি, অনুপ্রেরণার অভাব বা অর্থকষ্টের কারণ শুধু দুর্ভাগ্য এবং কাজের চাপ। কিন্তু প্রতি দিনের কিছু ছোট ছোট অভ্যাসও ধীরে ধীরে মানসিক, শারীরিক এবং আর্থিক ভাবে পিছিয়ে দিতে পারে আপনাকে। এমন অনেক সাধারণ অভ্যাস রয়েছে যে, মানুষ বুঝতেই পারেন না সেগুলিই শক্তি, সময় এবং অর্থ নষ্ট করছে। সমাজমাধ্যমেও এখন ‘সাইলেন্ট বার্নআউট’ নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক দেখালেও ভিতরে ভিতরে মানুষ ক্লান্ত, অনুৎসাহী এবং মানসিক ভাবে অবসন্ন হয়ে পড়ছেন। তার কারণগুলি কী কী?
রোজের কোন কোন অভ্যাসের কারণে সাফল্যের চাবিকাঠি খুঁজে পাচ্ছেন না?
১. ফোন দেখা: সকালে ঘুম থেকে উঠেই চোখ রাখেন ফোনের দিকে? এই অভ্যাসের কারণে মন ও শরীরের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। মস্তিষ্ক পুরোপুরি জেগে ওঠার আগেই ই-মেল, মেসেজ, সমাজমাধ্যমের কন্টেন্ট-এ ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। অবসর পেলেই ফোন হাতে তুলে নেওয়া এখন প্রায় সকলেরই স্বাভাবিক অভ্যাস। কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম মনোযোগের চক্র ভেঙে দেয় এবং মস্তিষ্ককে ক্রমাগত উত্তেজিত অবস্থায় রাখে। এর ফলে মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায় না। এতে কাজের প্রতি আগ্রহ ও ধৈর্য কমে যেতে পারে।
সকালে উঠেই ফোন দেখার অভ্যাস থেকে দূরে থাকুন। ছবি: সংগৃহীত
২. টাকা খরচ: অনলাইনে খাবার অর্ডার করা এখন খানিকটা নির্ভর করে খেয়ালখুশির উপর। খিদে না পেলেও অথবা ঘরে খাবার থাকলেও হুটহাট বাইরের খাবার কিনে ফেলার প্রবণতা বেড়েছে চারদিকেই। তাৎক্ষণিক আনন্দের জন্য দীর্ঘকালীন অসুবিধা ডেকে আনছেন। একে তো অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে, তায় পেট ও হজমের সমস্যা চাগাড় দিয়ে উঠছে এর ফলে।
৩. দেরিতে ঘুমোনো: মধ্যরাতে ঘুমোনো, চোখ বুজে আসার আগে পর্যন্ত ফোন ঘাঁটার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ডেকে আনে। এর ফলে যথেষ্ট বিশ্রাম পাচ্ছে না শরীর, ঘুমও পর্যাপ্ত হচ্ছে না। সুতরাং, শরীর ও মস্তিষ্ক— দুয়ের উপরই প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘ দিন ধরে কম ঘুম হলে ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ধীরে ধীরে কাজের উদ্যমও কমে যায়।
৪. অন্যের সঙ্গে তুলনা: সমাজমাধ্যমে অন্যের সাফল্য, ভ্রমণ, সম্পর্ক বা জীবনযাপন দেখে অনেকেই নিজের জীবনকে ব্যর্থ বলে ভাবতে শুরু করেন। মনোবিদদের মতে, এই অভ্যাস আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং সব সময় অপূর্ণতার অনুভূতিতে ভোগায়। ফলে নিজেদের জীবনে সুখ ও আনন্দ খুঁজেই পান না তাঁরা।
৫. সবেতেই রাজি হওয়া: সবাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকেই নিজের সময়, কর্মশক্তি এবং মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলেন। মনোবিদদের মতে, নিজের ক্ষমতা ও ইচ্ছে অনুযায়ী সীমারেখা তৈরি করতে না পারলে দ্রুত মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে। তাই কোনও কোনও বিষয়ে ‘না’ বলতে শিখতে হয়। নয়তো অনিচ্ছা সত্ত্বেও সবেতে রাজি হয়ে গেলে ক্লান্তি আসতে বাধ্য।
৬. নিজেকে সময় না দেওয়া: কাজ, পরিবার, দায়িত্ব— সব সামলাতে গিয়ে অনেকেই নিজের পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দেন না। বাদ পড়ে যায় বিশ্রাম বা মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন। কিন্তু পেশাদারদের মতে, নিয়মিত নিজের জন্য সময় না রাখলে ধীরে ধীরে অবসাদ ও ক্লান্তি জমতে থাকে। হাজারো ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে সময় দিতেই হয়। সেখান থেকেই ছোট ছোট আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়।
সারা দিন বসে থাকলে শরীরে ক্লান্তি ভর করবে। ছবি: সংগৃহীত
৭. সক্রিয় না থাকা: ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে কাজ করে চলেছেন। নড়াচড়া না করেই সারা দিনটা কেটে যাচ্ছে। এই যাপনে শরীর যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, মনও নিঃশ্বাস নেওয়ার ফুরসত পাচ্ছে না। অনেকেই ভাবেন, ব্যায়াম শুধু ওজন কমানোর জন্য প্রয়োজন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত শারীরচর্চা করলে শক্তি বাড়ে, মানসিক চাপ কমে এবং মনও ভাল থাকে। নয়তো দীর্ঘ ক্ষণ বসে থেকে থেকে ক্লান্তি আরও বাড়তে পারে।
৮. কাজ ফেলে রাখা: কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা একই সঙ্গে সময় নষ্ট করে এবং মানসিক চাপ বাড়ায়। অসমাপ্ত কাজের চাপ অনেক সময় আপনাকে আরও অবসন্ন ও নিরুৎসাহী করে তুলতে পারে। হাতে কাজ থাকলে দ্রুত তা শেষ করে ফেলার চেষ্টা করুন। তাতে দুশ্চিন্তাও কমবে, কাজও সময় মতো শেষ হয়ে যাবে।
৯. নেতিবাচক চিন্তা: অবসাদকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত বটেই। তা বলে সারা দিনই যদি ব্যর্থতা, না পারা, না হওয়া নিয়ে ভাবতে থাকেন, তা হলে মনে বিষণ্ণতা জাঁকিয়ে বসতে পারে। এর ফলে কাজ বা জীবনের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে ক্ষতি বই লাভ হয় না কোনও প্রকারের। তাই আশার আলো দেখতে শেখা দরকার। ভাল কিছু ঘটার অপেক্ষায় পদক্ষেপ করা দরকার।