হিটস্ট্রোক কেন হয়, বিপদ এড়াতে কী করণীয়? ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
বৈশাখি গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত। তাপমাত্রার পারদ চড়ছে। গরম যত বাড়ছে, ততই শারীরিক অস্বস্তি চরমে উঠছে। ঘড়ির কাঁটা বেলা ১০টা পার করার আগেই চড়া রোদ। অনেকেই রাস্তায় বেরিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, হিটস্ট্রোকে আক্রান্তও হচ্ছেন অনেকে। কেবল দিনের বেলা নয়, রাতেও হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা প্রবল। বিশেষ করে যাঁরা জল কম খান, যাঁদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল অথবা ক্রনিক অসুখ রয়েছে, তাঁরা বেশি ঝুঁকিতে।
কেন রোদে বেরোলে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে?
শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা সাধারণত ৯৮.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকে। মস্তিষ্ক এবং ত্বকের ঘর্মগ্রন্থি এই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। আরও কিছু ভিটামিন ও খনিজেরও ভূমিকা থাকে। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস এই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিটি পরিচালনা করে। সে-ই হল শরীরের ‘থার্মোস্ট্যাট’। প্রচণ্ড গরমে বেশি ক্ষণ থাকলে ত্বকের স্নায়ুপ্রান্ত এবং রক্তনালিগুলি তাপমাত্রার পরিবর্তন শনাক্ত করে মস্তিষ্কে সঙ্কেত পাঠায়। শরীর যখন অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, হাইপোথ্যালামাস দু’টি প্রধান কাজ করে— ত্বকের কাছের রক্তনালিগুলি প্রসারিত করে অতিরিক্ত তাপ নিঃসরণ করে এবং ঘর্মগ্রন্থিগুলি সক্রিয় করে তুলে ঘাম বাষ্পীভূত করার মাধ্যমে অতিরিক্ত তাপ শরীর থেকে বার করে দেয়। কিন্তু যখন প্রচণ্ড রোদে কেউ বেশি ক্ষণ থাকেন বা তাঁর শরীর কোনও কারণে দুর্বল থাকে, তখন এই প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। ফলে এক দিকে যেমন ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে সোডিয়াম, পটাশিয়ামের মতো খনিজ লবণ বেরিয়ে গিয়ে জলশূন্যতার লক্ষণ দেখা দেয়, তেমনই অতিরিক্ত তাপ শোষিত হতেও পারে না। ফলে হার্টের উপর চাপ বাড়তে থাকে, পেশির খিঁচুনি হয়। একেই বলে হিটস্ট্রোক। তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গেলে শরীরের থার্মোস্ট্যাট ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে ও মস্তিষ্কের কোষগুলির ক্ষতি হতে থাকে, ফলে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। মানসিক বিভ্রান্তি, সিদ্ধান্তহীনতা, অসম্ভব দুর্বলতা অনুভব করা, মাথা ঘোরা, বমি ভাবের সমস্যা দেখা দেয়।
অসুস্থ বোধ করলে কী করণীয়?
তাপমাত্রার পারদ আরও চড়বে। ইতিমধ্যেই কিছু জেলায় তাপপ্রবাহের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কাজেই হিটস্ট্রোকের বিপদ এড়াতে কয়েকটি বিষয়ে সাবধানতা নিতেই হবে। চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদার জানাচ্ছেন, হিটস্ট্রোকে আক্রান্তকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা এসি ঘরে নিয়ে গেলে যত না উপকার হয়, তার চেয়ে স্নান করালে বা ঘাড়ে, কানে, বাহুমূলে আইসপ্যাক দিলে উপকার হবে বেশি।
সকাল দশটার পরে এবং বিকেল পাঁচটার আগে রাস্তায় না বেরোনোই ভাল। কিন্তু এই রুটিন মেনে চলা সম্ভব না হলে সর্তকতা মানতে হবে। বাইরে গেলে ছাতা নিতে হবে, সানগ্লাস ব্যবহার করতে হবে। মাস্ক বা সুতির ওড়না দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে নেওয়া ভাল। সঙ্গে জল রাখতে হবে।
গরমে প্রচুর ঘাম হয়। ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে নুন বেরিয়ে যায়। ফল ডিহাইড্রেশন। তাই প্রচুর জল খেতে হবে। জলের পাশাপাশি মাঝেমাঝে ইলেকট্রোলাইট পানীয়, নুন-চিনি-লেবু মেশানো জল, পুদিনার শরবত, শসার রস খেতে হবে।
দিনে অন্তত দু’বার স্নান করতেই হবে। ছোটরা বাইরে থেকে এলে তাদেরও স্নান করিয়ে দেওয়া ভাল। এতে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
বাইরে বেরোনোর আগে জল খেয়ে বেরোন, আবার রোদ থেকে এসে কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে জল খেতে হবে। প্রস্রাব ঠিক মতো হচ্ছে কি না, খেয়াল রাখতে হবে। গরম থেকে এসেই ঠান্ডা জল খাবেন না। এতে সর্দি-কাশি, গলাব্যথার সম্ভাবনা থাকে।
জ্বর এলে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খাবেন না। দু’-এক দিনে জ্বর না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
গরমে হালকা খাবার খেতে হবে। মশলাদার খাবারের পরিবর্তে পাতে থাকুক তেতো, আমডাল, মাছের ঝোল, লাউ, টক দই, মরসুমি ফল ইত্যাদি। ডাবের জল, বাড়িতে তৈরি ফলের রস, লস্যি, আখের রস, ছাতুর শরবত খেলে শরীর ভাল থাকবে।