প্রজন্ম ধরে চলে আসা শিশুর পথ্য সুরক্ষিত তো? প্রতীকি ছবি।
সদ্যোজাতকে বড় করার সময় ভীষণ কাজে আসে অভিজ্ঞদের পরামর্শ। অনেক সময় শিশুর কান্নার কারণ তার মা বুঝতে না পারলেও, অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝে যান ঠাকুমা-দিদিমারা। তাঁদের কথায়, বাচ্চা মানুষ করতে গিয়েই এই সব শিখেছেন।
সন্তানকে বড় করার কৌশল এ ভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে। জ্বরজারি হলে, পেটখারাপ হলে বা অসুখ-বিসুখ হলে এখন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বহু বছর আগে যখন হুট করে ডাক্তার মিলত না, তখন সন্তানের নানা সমস্যার সমাধান খোঁজা হত পথ্যে। এমন ভাবে চলে আসা নানা পথ্য বা নিয়ম আজও অনেকে মানেন। কিন্তু তার সবটাই কি নিরাপদ?
গাজিয়াবাদের শিশু রোগের চিকিৎসক নরেন্দ্র ঝা এক সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন, অনেক সময় খুব সাধারণ এবং ছোটখাটো বিষয়ও শিশুর স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।চিকিৎসক হিসাবে এমন অনেক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন তিনি, যখন ঘরোয়া পথ্য বা দীর্ঘ দিনের চলে আসা নিয়মের খেসারত দিতে হয়েছে শিশুকে। এমনই কয়েকটি বিষয় নিয়ে সতর্ক করেছেন তিনি।
মুখে মধু: দুধের শিশুর মুখে মধু দেওয়ার চল আছে অনেক জায়গায়। পরিষ্কার কাপড়ে একটু মধু দিয়ে অনেকে শিশুর জিভ পরিষ্কার করেন। চিকিৎসক বলছেন, এমন অভ্যাস কখন, কার জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠবে তা বলা কঠিন। বিশেষত, এক বছরের কম বয়সিদের জন্য এই অভ্যাস বিপজ্জনক। মধু ‘ক্লসট্রিডিয়াম বটুলিনাম’ নামে এক ধরনের ব্যাক্টেরিয়া সংক্রমণের যোগসূত্র হয়ে উঠতে পারে। এই ব্যাক্টেরিয়ার প্রভাবে ‘ইনফ্যান্ট বটুলিজ়ম’ হয়। এই অসুখে সরাসরি প্রভাব পড়ে শিশুর স্নায়ুতন্ত্র এবং পেশিতে। তার ফলে দুর্বলতা, খিদে না হওয়া, ক্ষেত্র বিশেষে শ্বাসকষ্টের সমস্যাও শুরু হতে পারে।
তেলের ব্যবহার: শিশুর জন্মের পর থেকেই তেল দিয়ে দলাইমলাই করার চল রয়েছে প্রায় সব প্রদেশেই। কেউ সর্ষের তেল বেছে নেন, কোথাও আবার নারকেল তেল ব্যবহার করা হয়। শিশুর নাকে, কানেও তেল দেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা বলেন, ছোট শিশুর জন্য কোনও তেলই দেওয়া ঠিক নয়। চিকিৎসক সতর্ক করছেন, নাকে-কানে তেল দেওয়ার প্রবণতা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষত কানের মধ্যে তেল দিলে তা ভিতরে প্রবেশ করে। তা থেকেই সমস্যার সূত্রপাত হয় অনেক সময়।
কাড়া: সর্দি-কাশিতে কাড়া খাওয়ার চল রয়েছে। আদা, গোলমরিচ, লবঙ্গ, দারচিনি, তুলসী ফুটিয়ে এই পানীয় প্রস্তুত করা হয়। শিশুদের ঠান্ডা লাগলে অনেকেই তাদেরও এই পানীয়টি খেতে দেন। কারার উপাদানগুলি প্রাকৃতিক, তা ছাড়া এতে প্রদাহনাশক গুণ রয়েছে। তবে চিকিৎসক মনে করাচ্ছেন, পানীয়টি বড়দের জন্য, ছোটদের জন্য নয়। তাদেরও নিয়ম করে কাপ কাপ কারা খাওয়ালে পাকস্থলিতে গিয়ে সমস্যা হতে পারে। পেট গরমের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বমি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
পায়ে পেঁয়াজ: জ্বর হলে জ্বর কমাতে অনেকে শিশুর পায়ের পাতায় পেঁয়াজ ঘষেন। এতে লাভ না হয়ে ক্ষতি হতে পারে। পেঁয়াজের রস শিশুর ত্বকে সহ্য না-ও হতে পারে। চিকিৎসক বলছেন,‘‘টোটকার বদলে শিশুর জ্বর হলে সময় মতো ওষুধ খাওয়ানো, জ্বর মাপা, কী কী লক্ষণ দেখা দিচ্ছে সেগুলিতে নজর রাখা দরকার।’’
ওষুধের ভুলভ্রান্তি: ছোটদের ওষুধ এবং ওষুধের মাত্রায় অনেক তফাত থাকে। ভুল মাত্রায় ওষুধ দেওয়া হল তাদের লিভার, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেকেই বড়দের ওষুধ শিশুদের খাইয়ে দেন। এমন প্রবণতা খুবই বিপজ্জনক। তাঁর পরামর্শ, চিকিৎসকের কথা শুনে চলা জরুরি।