সংসদ চত্বরে তৃণমূলের মহিলা সাংসদদের বিক্ষোভ। —নিজস্ব চিত্র।
রাজ্য জুড়ে এলপিজি নিয়ে সমস্যা অব্যাহত। অভিযোগ, গ্যাস বুক করার পরেও সিলিন্ডার মিলছে না। কোথাও কোথাও গ্যাস বুকিং করাই যাচ্ছে না। সুন্দরবনেও এই উদ্বেগের ছায়া দেখা গিয়েছে। গ্যাসের অভাবে ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে যেতে পারছেন না মৎস্যজীবীরা। ফলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিকে দিকে বাণিজ্যিক গ্যাসে কালোবাজারির অভিযোগও উঠছে। সিলিন্ডার না পাওয়ায় একাধিক জায়গায় মা ক্যান্টিন বন্ধ করে দিতে হয়েছে বলে খবর। স্কুলে মিড ডে মিল রান্না করতে হচ্ছে কাঠের উনুনে। এলপিজি-র আকালে সার্বিক উদ্বেগ নিয়ে শুক্রবার সংসদের বাইরে বিক্ষোভ দেখিয়েছে তৃণমূল।
সকাল থেকে তৃণমূলের মহিলা সাংসদেরা লোকসভার বাইরে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ দেখান। দাবি, এলপিজি নিয়ে কেন্দ্র যা বলছে, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই। দু’দিন আগেই কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক জানিয়েছিল, গ্যাস সরবরাহের সময়ে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। বুকিংয়ের পর আড়াই দিনের মধ্যেই রান্নার গ্যাস মিলবে। কিন্তু তৃণমূলের দাবি, আদৌ তা হচ্ছে না। বাস্তবে আট থেকে ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও গ্যাস পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।
তৃণমূলের তরফে বিক্ষোভে ছিলেন মহুয়া মৈত্র, মিতালী বাগ, জুন মালিয়া, দোলা সেন, শতাব্দী রায়, মালা রায়রা। মিতালী বলেন, ‘‘যে ভাবে হঠাৎ করে এলপিজি গ্যাস গায়েব হয়ে গেল, তাতে মানুষের হেঁশেলে নাভিশ্বাস উঠছে। মিড ডে মিল থেকে শুরু করে বাড়ির রান্না, সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে আসছেন না। তাই আমরা সংসদের বাইরে প্রতিবাদ করছি। এর জন্য যত দূর যেতে হয় যাব। মানুষ তো না খেয়ে বাঁচতে পারবে না!’’ আড়াই দিনে গ্যাস সরবরাহের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মহুয়া। তিনি বলেন, ‘‘দেশে এলপিজি-র সঙ্কট চলছে। মানুষ আতঙ্কিত। গ্যাসের জন্য এখন লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। সরকার বলছে, আড়াই দিনে সিলিন্ডার পাওয়া যাবে। কিন্তু আদতে তা হচ্ছে না। আমি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের চ্যালেঞ্জ করছি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখুন পরিস্থিতি কী। আমাদের প্রধানমন্ত্রী গত পাঁচ দিন সংসদে আসেননি। তিনি কেরলে ভোটের প্রচার করে চলেছেন।’’
সুন্দরবনের বেশির ভাগ ট্রলারেই রান্নার জন্য বাণিজ্যিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেই জোগান কমে গিয়েছে। চড়া দাম দিলেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে দিন পনেরো থাকতে হয়। রতন দাস নামের এক মৎস্যজীবী জানান, মঙ্গলবার তাঁদের ট্রলার নিয়ে বেরোনোর কথা ছিল। কিন্তু সিলিন্ডার না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। আগে এই সমস্ত ট্রলারে জ্বালানি কাঠে রান্না হত। গ্যাস না থাকায় সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভে ফের হাত পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
বসিরহাট পুর এলাকায় পুরাতন বাজারে মা ক্যান্টিন গ্যাসের অভাবে তিন দিন ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে। প্রতি দিন তিনশোর বেশি মানুষ এখান থেকে খাবার সংগ্রহ করেন। দাবি, গ্যাস অফিসে বার বার যোগাযোগ করেও লাভ হয়নি। এ ছাড়া, একাধিক সরকারি স্কুলে মিড ডে মিল তৈরির জন্য কাঠের জ্বালের সাহায্য নিতে হচ্ছে।
বিরাটির বাসিন্দা ঝুমা বারুই জানান, ১০ মার্চ তিনি মোবাইল থেকে গ্যাস বুক করেছিলেন। কিন্তু বুকিং নিশ্চিত করে কোনও মেসেজ পাননি। শুক্রবার গ্যাসের দফতরে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর বুকিং হয়নি। অনলাইনেই বুকিং করতে হবে বলে জানিয়ে দেন কর্তৃপক্ষ। রাত ১০টার পর চেষ্টা করার পরামর্শ তাঁকে দেওয়া হয়েছে।
রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে প্রকাশ্যে অবৈধ ভাবে অটোতে গ্যাস ভরার অভিযোগ উঠেছে জয়নগরে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন জানলেও তার বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করছে না। দিকে দিকে বাণিজ্যিক গ্যাস বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে। তার জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দাম দিতে হচ্ছে। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে শুক্রবার সকালে একটা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার গুদাম খালি হয়ে গিয়েছে। গুদামে গিয়েও সিলিন্ডার পাননি সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর পর তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সিলিন্ডার শেষ। দাবি, কর্তৃপক্ষকে আগাম টাকা দিয়ে রেখে, একাধিক বার ইমেল করেও গ্যাস পাওয়া যায়নি। নদিয়ায় গোপনে দ্বিগুণ দামে রান্নার গ্যাস বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। অন্য দিকে, গ্যাসের অভাবে হুগলির শ্রীরামপুরের রাধাবল্লভ মন্দিরে ভোগের ‘মেনু’তে কাটছাঁট করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছেন, ভোগের সঙ্গে আগের মতো ভাজাভুজি পাওয়া যাবে না।
এলপিজি সঙ্কট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার মুখ খুলেছিলেন। তিনি জানান, কিছু মানুষ অযথা আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা করছেন। তাঁরা আদতে দেশের ক্ষতি করছেন। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব প্রত্যেক দেশের উপরে পড়েছে বলে জানান মোদী। তাঁর দাবি, সরকার যথাসম্ভব পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। রাজ্য সরকারগুলিকে গ্যাসের কালোবাজারি রুখতে তৎপর হওয়ার অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সঙ্কটে একসঙ্গে কাজ করার বার্তা দেন। তার পরেই শুক্রবার সকালে বিক্ষোভের ঝাঁজ বাড়াল তৃণমূল।
এ দিকে কলকাতায় গ্যাসের কালোবাজারি রুখতে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। সকাল থেকে গ্যাস সরবরাহের দফতরে ঘুরছেন এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের আধিকারিকেরা। গ্যাসের মজুত কোথায় কেমন আছে, তা খতিয়ে দেখছেন। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছেন। বৃহস্পতিবারই এলপিজি নিয়ে এসওপি জারি করেছিল রাজ্য সরকার। তার পর এই তৎপরতা শুরু হল।