বুড়িয়ে যাচ্ছে ত্বক, ঝরছে চুল, কারণ কি এসি? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
গরমের ঘেমেনেয়ে অফিসে ঢুকেই শান্তি। বাতানুকূল যন্ত্রটির কল্যাণে গোটা ঘরেই তখন বরফ শীতল আবহাওয়া। বাইরের চড়া রোদ আর প্রায় ৪০ ডিগ্রি ছুঁতে চলা তাপমাত্রায় যা স্বর্গীয় স্বাদের মতো, খানিক ক্ষণ বসলেই শরীর ও মন জুড়িয়ে যাবে। তবে এ তো ক্ষণিকের আরাম। এই যে অফিসে টানা ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা এসি ঘরে বসে থাকতে হয়, তার বড় রকম প্রভাব পড়ে ত্বকে ও চুলে। বাড়িতে এসি চালিয়ে থাকা ও অফিসে থাকার মধ্যে কিন্তু পার্থক্য আছে। অফিসের সেন্ট্রাল এসিতে টানা থাকলে যে পরিমাণ আর্দ্রতা ত্বক ও চুল থেকে হারিয়ে যায়, বাড়িতে ততটা হয় না। কৃত্রিম ঠান্ডায় একই সঙ্গে বুড়িয়ে যায় ত্বক এবং জেল্লা হারাতে থাকে চুল।
বাড়ি ও অফিসের এসি-র মধ্যে তফাৎ কী?
সেন্ট্রাল এসি বড় জায়গাকে ঠান্ডা করার জন্য বাতাস থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প শুষে নেয়। এটি একটি বড় মাপের ড্রায়ার হিসেবে কাজ করে। এই সিস্টেম এমন ভাবে চলে, যা বাতাসকে আরও বেশি শুষ্ক করে তোলে। বাড়ির এসি ছোট ঘর ঠান্ডা করে। ঘরের আয়তন কম হওয়ায় এবং দরজা-জানলা বার বার খোলা ও বন্ধ হওয়ার কারণে বাইরে থেকে কিছু পরিমাণ আর্দ্রতা ভিতরে ঢোকে। ফলে বাড়ির বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা অফিসের তুলনায় বেশি থাকে।
বাতানুকূল ঘরে বেশি ক্ষণ থাকলে কী প্রভাব পড়বে ত্বকে ও চুলে? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক।
সেন্ট্রাল এসি যুক্ত বড় ঘরগুলিতে জানলা খোলার কোনও উপায় থাকে না। সেখানে একই বাতাস বার বার ফিল্টার হয়ে পুনর্সঞ্চালিত হতে থাকে। একে বলে ‘রিসাইক্লিং’। এই প্রক্রিয়ার কারণে বাতাসে অক্সিজেন ও জলীয় কণার ভারসাম্য হারিয়ে যায়। এমন পরিবেশে টানা ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় থাকলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন ধীর গতিতে হয়। যে কারণে ত্বকের কোষে পুষ্টি উপাদান পৌঁছতে দেরি হয়। ফলে ত্বক বুড়িয়ে যেতে থাকে। বাড়িতে সাধারণত প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা পরিবর্তন করা যায় বা কখনও স্লিপ মোড ব্যবহার করা যায়। ফলে শরীর দীর্ঘ ক্ষণ শুষ্ক আবহাওয়ায় থাকে না।
কী প্রভাব পড়ে ত্বক ও চুলে?
খসখসে হয়ে যায় ত্বক, টান ধরতে থাকে। ত্বক ফেটে সাদাটে দাগ পড়ে অনেক সময়ে। ত্বকের উপরের স্তর বা এপিডারমিস তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখতে বাতাসের উপর নির্ভর করে। বাতাসে আর্দ্রতা কমে গেলে ত্বক থেকে জল বাষ্পীভূত হতে শুরু করে, ফলে ত্বক শুকিয়ে যেতে থাকে। খুব তাড়াতাড়ি বলিরেখা পড়ে যায়।
ত্বকের দুই প্রোটিন, কোলাজেন ও ইলাস্টিনের ক্ষতি হয় দীর্ঘ সময় ধরে বাতানুকূল ঘরে থাকলে। এই দুই প্রোটিন ত্বককে টানটান রাখে। তাই এদের ক্ষতি হলে অকাবার্ধক্য দেখা দিতে পারে খুব তাড়াতাড়ি।
শুধু ত্বক নয়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ঠান্ডা বাতাস ঠোঁটকেও রুক্ষ করে তোলে। তাই ঠোঁটের কোমলতা ও মসৃণতা বজায় রাখতে ব্যবহার করতে পারেন পেট্রোলিয়ামজাত জেলি। চাইলে লিপগ্লসও লাগিয়ে রাখতে পারেন।
শুষ্ক হয়, বুড়িয়ে যেতে থাকে ত্বক। ছবি: ফ্রিপিক।
এগ্জ়িমা, সোরিয়াসিসের মতো চর্মরোগ থাকলে কৃত্রিম ঠান্ডায় তা আরও বেড়ে যেতে পারে। ত্বকের উপর প্রাকৃতিক তেল বা সেবামের একটি আস্তরণ থাকে। এসি-র ঠান্ডা তা নষ্ট করে দেয়, ফলে ত্বকের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যায়। এতে ত্বকের নানা রকম সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
একই প্রভাব পড়ে চুলেও। চুল তার স্বাভাবিক জৌলুস হারিয়ে রুক্ষ ও শুষ্ক হয়ে যায়। এসি ঘরের বাতাস থেকে শুধু আর্দ্রতা টানে না, এটি চুলের কিউটিকলের (বাইরের আবরণ) থেকেও আর্দ্রতা শুষে নেয়। ফলে চুলে প্রোটিনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
কৃত্রিম ঠান্ডায় দীর্ঘ সময়ে থাকলে রুক্ষ হয় চুলও। ছবি: ফ্রিপিক।
চুল সহজে জট পাকিয়ে যায়, চুল পড়ার পরিমাণও বাড়তে পারে। ডগা ফাটার সমস্যাও দেখা দেয়।
রেহাই পাওয়ার উপায় কী?
অফিসে এসি ঘরে থাকতেই হবে। তাই কিছু নিয়ম মেনে চলা যেতে পারে। দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার জল পান করলে ভাল। শরীরে জল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য ঠিক থাকলে, ত্বক ও চুলও সজীব থাকবে।
অফিসে কাজের মাঝখানে অন্তত বার দুয়েক ময়েশ্চারাইজ়ার লাগাতে পারেন। ডেস্কে একটি ফেস মিস্ট স্প্রে রাখুন। ত্বকে টান ধরলে স্প্রে করে নিন।
চুল ভাল রাখতে আলগা করে বেঁধে রাখুন বা হালকা স্কার্ফ দিয়ে মাথা ঢেকে রাখতে পারেন।
অফিসে যাওয়ার আগে চুলে হালকা হেয়ার সিরাম লাগিয়ে নিতে পারেন, এতে চট করে আর্দ্রতা হারাবে না।
ভেজা চুলে কখনওই বাতানুকূল ঘরে বেশি ক্ষণ বসবেন না। এতে চুল অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যেতে পারে, দেখা দিতে পারে ডগা ফেটে যাওয়ার সমস্যাও।
যদি সম্ভব হয়, আপনার ডেস্কে একটি ছোট পোর্টেবল হিউমিডিফায়ার রাখতে পারেন। এটি আপনার আশেপাশের বাতাসে আর্দ্রতা বজায় রাখবে।
টানা ১০ ঘণ্টা এসিতে না বসে মাঝে মাঝে ৫-১০ মিনিটের জন্য বিরতি নিন ও বাইরে বেরিয়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কিছু ক্ষণ সময় কাটান।
ডেস্কের আশেপাশে 'মানিপ্ল্যান্ট' বা 'স্নেক প্ল্যান্ট' এর মতো কিছু গাছ রাখতে পারেন। এগুলি প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা আর্দ্রতা ধরে রাখে।
বাড়ি ফিরে সম্ভব হলে ঈষদুষ্ণ জলে ভাল করে স্নান করে ভাল মানের ময়েশ্চারাইজ়ার মুখে মালিশ করতে হবে। রাতে চুলে নারকেল তেল মালিশ করতে পারলে চুলের জেল্লা হারাবে না।