ব্লাড সুগার কমাবেন কী ভাবে? ছবি: সংগৃহীত।
ডায়াবিটিস এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের সহজ উপায় নিয়ে মানুষের আগ্রহ কম নয়। সম্প্রতি এমনই এক দাবি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে সমাজমাধ্যমে, যেখানে বলা হচ্ছে কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাস মেনে চললে মাত্র ৯০ দিনের মধ্যে এইচবিএওয়ানসি (গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন) উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে ফেলা সম্ভব। আদৌ সেই দাবি কতটা সত্য এবং কার্যকর, তা জেনে নেওয়া দরকার ব্লাড সুগারের রোগীদের।
এইচবিএওয়ানসি কী?
ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলির একটি হল এইচবিএওয়ানসি। এটি প্রায় তিন মাসের সময়কালে রক্তে শর্করার গড় মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দেয়। তাই এক দিনের রক্তপরীক্ষার ফলের চেয়ে এটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থার সম্পর্কে বেশি তথ্য দেয়।
ডায়াবিটিসের রোগীদের জন্য ঘরোয়া টোটকা। ছবি: সংগৃহীত
দাবিতে এইচবিএওয়ানসি কমানোর কোন কোন উপায় বলা হয়েছে?
১. নিয়মিত শারীরচর্চা: সুগারের ওষুধ মেটফরমিনের থেকেও বেশি কাজে দেয় ব্যায়াম, যোগাসন ইত্যাদি। পেশি গঠনের ব্যায়ামের সঙ্গে কার্ডিয়ো করলে সবচেয়ে ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে।
২. খাওয়ার পর হাঁটা: খাওয়ার পরেই যদি ১০-১৫ মিনিট হাঁটা যায়, তা হলে রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বাড়তে পারে না। তবে খেয়ে উঠেই না হেঁটে অল্প খানিক ক্ষণ অপেক্ষা করে তার পর হাঁটা উচিত। নয়তো আবার বদহজমের সমস্যা হতে পারে।
৩. লিকুইড ক্যালোরি কমানো: সস, কেচআপ, সফ্ট ড্রিঙ্ক, সোডাজাতীয় পানীয় বা ফলের রস খাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে। এতে সুগার বেড়ে যেতে পারে।
৪. পর্যাপ্ত ঘুমোনো: বিশ্রামের সময়ে শরীরের কোষগুলিতে মেরামতির কাজ হয়। তাই ঘুম এবং বিশ্রাম শরীরকে সুস্থ করে। অগ্ন্যাশয় এবং লিভারের জন্যও ঘুমের টোটকা সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
কী ধরনের খাবার খাওয়া উচিত এই রোগে? ছবি: সংগৃহীত
৫. খাওয়ার মাঝে বিরতি: প্রতি বার খাওয়ার সময়ে যথেষ্ট পুষ্টিভরা খাবার খেতে হবে। এমন ভাবেই খাবেন, যাতে পরবর্তী ৩-৫ ঘণ্টা আর কিছু খেতে না হয়। অল্প অল্প করে মুখ চালানো বন্ধ করতে হবে। নয়তো সুগারের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
৬. খাদ্যাভ্যাস বদলানো: রোজ বিশেষ অনুপাত মেনে খাবারের থালা সাজিয়ে নিন। ২ বাটি সব্জি, প্রোটিনের কোনও একটি উৎস, কার্বোহাইড্রেটের কোনও একটি উৎস। এ ভাবে ২:১:১ অনুপাতে পরিমাণ বুঝে খেতে হবে। আর খাওয়ার গতির দিকেও নজর দিতে হবে।
৭. মানসিক চাপ কমানো: মানসিক চাপের কারণ খুঁজে বার করতে হবে। যদি উদ্বেগ, অবসাদের কারণ খুঁজে তার চিকিৎসা করা যায়, বা অন্য কোনও ভাবে সামলানো যায়, তা হলে ব্লাড সুগারের বিষয়েও শরীর ঠিক মতো সাড়া দেবে।
৮. অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখা: হজম ভাল হলে ব্লাড সুগারও নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য সকালে উঠে এক গ্লাস জল খেতে হবে, সঠিক সময়ে রোজ শৌচালয়ের ব্যবহার করতে হবে, রাত করে খাবার খাওয়ার প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে, পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করতে হবে।
৯. পুষ্টির ঘাটতি মেটানো: ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি ১২ এবং আয়রনের ঘাটতি মেটাতে হবে। রক্তপরীক্ষা করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ খাওয়ার বন্দোবস্ত করুন।
এই অভ্যাসগুলির অনেকগুলি সত্যিই ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হল, সমাজমাধ্যমে এই বিষয়গুলিকে এমন ভাবে তুলে ধরা হচ্ছে যেন, ৯০ দিনের মধ্যে নিশ্চিত ভাবে সবার এইচবিএওয়ানসি কমে যাবে। সেটি সঠিক নয়। ডায়াবিটিসে এক জনের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি কার্যকর হবে, অন্য কারও ক্ষেত্রে তার ফল একেবারেই আলাদা হতে পারে। তাই কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে ফলাফলের নিশ্চয়তা দেওয়া বৈজ্ঞানিক ভাবে সঠিক নয়। কিন্তু এমনিতেই ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই নিয়মগুলি মানা উচিত।
ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের পরিবর্তন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট ‘ম্যাজিক ফর্মুলা’ বা দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতিকে অন্ধ ভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়। এইচবিএওয়ানসি কমানো সম্ভব হলেও তার জন্য একটানা নিয়ম মেনে চলা এবং প্রয়োজন হলে ওষুধের সঠিক ব্যবহার জরুরি। তবে যাঁদের নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এবং যাঁদের ওজন বেশি বলে তাঁদের ক্ষেত্রে ৯০ দিনের এই দাবি সত্যি হতে পারে।