যক্ষ্মা বললে প্রথমেই ফুসফুসের সংক্রমণের কথা মনে হয়। কিন্তু যক্ষ্মা বা টিবি দেহের অন্য অঙ্গেও হতে পারে, যাকে বলা হয় এক্সট্রা পালমোনারি টিবি। তারই একটি রূপ হল কিডনির টিবি, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় জেনিটো-ইউরিনারি টিবি বলা হয়। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এই রোগটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে এতটাই অস্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে আসে, যে সহজে তা ধরা পড়ে না। তাই চিকিৎসকদের কাছে এটি ‘হাই ইনডেক্স অব সাসপিশন’-এর রোগ— অর্থাৎ সন্দেহ না করলে রোগটি ধরা কঠিন।
কী ভাবে হয় কিডনির টিবি?
নেফ্রোলজি বিভাগের চিকিৎসক অর্পিতা রায়চৌধুরী বলছেন, “কিডনির টিবি সাধারণত প্রাইমারি নয়, সেকেন্ডারি। অর্থাৎ শরীরের অন্য কোথাও (সবচেয়ে বেশি ক্ষেত্রে ফুসফুসে) টিবি সংক্রমণ হওয়ার পর সেখান থেকে রক্তের মাধ্যমে জীবাণু কিডনিতে পৌঁছয়। অনেক সময়ে এই সংক্রমণ বহু বছর সুপ্ত থাকে। এমনও দেখা যায়, ১০ বছর আগে কারও টিবি হয়েছিল, সেরে গিয়েছে। কিন্ত হঠাৎই কিডনিতে সেই জীবাণু সক্রিয় হয়ে উঠেছে।”
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁদের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি বেশি। যেমন, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড বা ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ গ্রহণকারী, আগে টিবির ইতিহাস রয়েছে যাঁদের, এমন ব্যক্তিরা। উন্নত দেশে টিবি সংক্রমণ তুলনামূলক কম হলেও প্রতিরোধ ক্ষমতা কম রয়েছে, এমন রোগীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের এক্সট্রা-পালমোনারি টিবি দেখা যায়। ফলে এইচআইভি সংক্রমণ থাকলে টিবির পরীক্ষা করানো হয়।
কেন ধরা কঠিন?
কিডনিতে টিবির উপসর্গ অনেক সময়ে সাধারণ ইউরিন ইনফেকশনের মতো মনে হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে তা-ও থাকে না। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, প্রাথমিক লক্ষণগুলি হতে পারে, বারবার জ্বর আসা, ওজন কমে যাওয়া, শরীর খারাপ লাগা, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত আসা, প্রস্রাবে পুঁজ আসা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ইউরিন টেস্টে পুঁজ ও রক্ত থাকলেও কালচারে ব্যাক্টিরিয়া ধরা পড়ে না। এটাই প্রাথমিক ভাবে চিকিৎসকদের মনে সন্দেহ জাগায়। সেই ব্যক্তির যদি আগে টিবির ইতিহাস থাকে, সঙ্গে জ্বর ও ওজন কমে যাওয়ার উপসর্গ দেখা দেয়, তা হলে কিডনির টিবি হয়েছে বলে চিকিৎসক সন্দেহ করতে পারেন।
আরও কিছু লক্ষণ হতে পারে প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা অস্বস্তি (কিন্তু তা সাধারণ ইউটিআই-এর মতো তীব্র নয়), ইউরিনারি ট্র্যাক্ট সরু হয়ে যাওয়া, কিডনি ফুলে যাওয়া, প্রস্রাব জমে যাওয়া এবং তা থেকে পেটে ব্যথা, প্রস্রাব বেরোতে অসুবিধা ইত্যাদি।
কী ভাবে নির্ণয়?
কিডনির টিবি নির্ণয় করা সহজ নয় বলে জানাচ্ছেন অর্পিতা রায়চৌধুরী। তিনি বলেন, “সাধারণ পরীক্ষায় এটি ধরা পড়ে না। প্রয়োজন হয় বিশেষ পরীক্ষার। মাইকোব্যাকটেরিয়াম কালচার— প্রতি সপ্তাহে এক বার করে নমুনা নিয়ে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া জিন এক্সপার্ট পদ্ধতি রয়েছে যাতে দ্রুত ফল পাওয়া যায়।” এই পরীক্ষাটি টিবির জীবাণু ও ড্রাগ রেজ়িস্ট্যান্স চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। অনেক সময়েই প্রথমে ভুল করে ইউরিনারি ইনফেকশন বলে এই রোগের চিকিৎসা করা হয়। ফলে ঠিক চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়।
চিকিৎসা না করলে কী হতে পারে?
চিকিৎসা না হলে কিডনির টিসু ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। ফলাফল, স্থায়ী কিডনি ড্যামেজ, কিডনি ফেলিয়োর, মূত্রনালি ও মূত্রথলিতে ক্ষতি, গুরুতর ক্ষেত্রে জীবনহানিও হতে পারে বলে জানান চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসা কী?
কিডনির টিবির চিকিৎসা মূলত অ্যান্টি-টিবি ওষুধ দিয়ে করা হয়। কত দিন ওষুধ চলবে, তা নির্ভর করে রোগের মাত্রা ও জটিলতার উপরে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। যদি রেনাল অ্যাবসেস তৈরি হয় বা মূত্রনালিতে গুরুতর বাধা সৃষ্টি হয়, তা হলে সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।
ওষুধ প্রতিরোধী টিবি:বাড়তি উদ্বেগ
বর্তমানে মাল্টি-ড্রাগ রেজ়িস্ট্যান্ট টিবির সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষ করে ইমিউনোকম্প্রোমাইজ়ড রোগীদের মধ্যে। তাই দ্রুত ও ঠিক ভাবে রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি।
সংক্রমণ ছড়ায় কী ভাবে?
কিডনির টিবি নিজে থেকে সাধারণত সংক্রামক নয়। মূলত ফুসফুসের টিবি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। তবে কারও শরীরের এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে এই রোগ। টিবি ‘নোটিফায়েবল ডিজ়িজ়’, অর্থাৎ কারও দেহে এই রোগ ধরা পড়লে তা সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরে জানানোর কথা। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে এ দেশে সচেতনতার অভাব রয়েছে।
শেষ কথা
কিডনির টিবি আসলে এক ‘ছদ্মবেশী’ রোগ। সাধারণ ইউরিন সংক্রমণ ভেবে এড়িয়ে গেলে পরে বিপদ বাড়তে পারে। দীর্ঘ দিন জ্বর, ওজন কমে যাওয়া বা মূত্রে অস্বাভাবিকতা থাকলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সমীচীন। এই রোগ যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে, আরোগ্য লাভের পথও ততই সুগম হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে