ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়, ডায়েট নিয়ে এত চিন্তা আসলে এক রোগ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
‘তিন মোন ওজনের’ দামোদর শেঠ অল্পেতে খুশি হবেন কি না জানা নেই, তবে ‘খাই খাই’ রোগ অল্পে শান্ত হওয়ার নয়। এ জঠরজ্বালা সহজে মেটে না। মনও তৃপ্ত হয় না। পাত পেড়ে গোগ্রাসে খাওয়া যাকে বলে, এ ঠিক তেমনই। তবে খেয়েদেয়ে এঁরা শান্ত হন না। তার পরেই ভোগেন দুশ্চিন্তায়। কারও ভয় ওজন বেড়ে যাওয়ার, কেউ ভাবেন অম্বলের কথা। যা খুশি খেয়েদেয়ে এই যে দুশ্চিন্তায় ভোগার লক্ষণ, তা মোটেই সাধারণ নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, এটি আসলে এক ধরনের রোগ— বুলিমিয়া নার্ভোসা। আদতে বিষয়টি ‘ইটিং ডিজ়অর্ডার’, তবে গড়পড়তা বিঞ্জ ইটিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক।
বুলিমিয়া নার্ভোসা কী?
এক প্রকারের ইটিং ডিজ়অর্ডার। তবে এর ধরন আলাদা। খাওয়ার সময় মাত্রাজ্ঞান থাকে না। একবারে হাপুস হুপুস করে অনেকটা খেয়ে ফেলা। সেই খাওয়ার মধ্যে কোথাও যেন আত্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটাই থাকে না। খিদে না পেলেও খেয়ে ফেলা এবং পেটে বিন্দুমাত্র জায়গা না থাকলেও গোগ্রাসে খাওয়ার চেষ্টা, এই রোগের অন্যতম লক্ষণ। আর শুধু খেয়ে ফেলাই নয়, তার পরে অপরাধবোধেও ভোগা বুলিমিয়ার আরও এক উপসর্গ। এই সমস্যায় যাঁরা আক্রান্ত, তাঁরা খাবার দেখলে লোভ সামলাতে পারেন না, আবার খেয়ে ফেলার পরে অত্যধিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এই দুশ্চিন্তা এতটাই যে, তা থেকে হাত-পা কাঁপা, ভয়, আতঙ্ক, এমনকি বিষণ্ণতাও দেখা দেয়।
ভূরিভোজের পরেই অপরাধবোধ, বুলিমিয়ার অন্যতম লক্ষণ।
বুলিমিয়ার ইতি এখানেই নয়। এই সমস্যা থাকলে খাবার খাওয়ার জন্য অপরাধবোধ এতটাই বেশি হয়, যে অনেকে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করতে থাকেন, কেউ আবার মাত্রাতিরিক্ত ব্যায়াম করা শুরু করে দেন। সময়ে অসময়ে ব্যায়াম করতে থাকেন। অথবা হঠাৎ করেই এমন ভয়ঙ্কর ডায়েট শুরু করেন যে, তাতে ক্যালোরির ঘাটতি হয়ে শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। কেউ আবার ল্যাক্সেটিভ জাতীয় ওষুধ খেয়ে ফেলেন, যাতে অতিরিক্ত খাবার বর্জ্যের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। তা করতে গিয়ে অসুস্থও হয়ে পড়েন।
কাদের হয়?
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা বুলিমিয়া নার্ভোসা নিয়ে গবেষণা করেছেন। এ বিষয়ে একাধিক গবেষণাপত্র আছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে মহিলারাই এই রোগে আক্রান্ত হন। এটি যতটা শারীরিক সমস্যা, তার চেয়েও বেশি মানসিক ব্যাধি। এই রোগের সঙ্গে জিনগত সংযোগ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। গবেষকেরা দেখেছেন, দু’ধরনের বুলিমিয়া হয়— ১) পার্জিং বুলিমিয়া, যেখানে প্রচুর পরিমাণে খাওয়ার পরে উদ্বেগে ভুগে বমি করতে দেখা যায় এবং ২) নন-পার্জিং বুলিমিয়া, যেখানে এক বারে অনেকখানি খাবার খাওয়ার পরেই ডায়েট শুরু করতে দেখা যায়, কেউ ব্যায়াম করা শুরু দেন, আবার কেউ ওজন কমানোর ওষুধ খেতে থাকেন। কেউ যদি টানা এমন আচরণ করতে থাকেন এবং তা কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে, তা হলে বুঝতে হবে, তিনি বুলিমিয়া নার্ভোসায় আক্রান্ত।
কী ভাবে সারবে?
ওজন নিয়ে যাঁরা সচেতন এবং ভোজনরসিকও, তাঁদের অনেকেই এই সমস্যায় আক্রান্ত হন। বুলিমিয়া মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছলে তা থেকে অবসাদও আসতে পারে। কেউ নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, কেউ মন অন্য দিকে রাখতে অতিরিক্ত কেনাকাটা করতে শুরু করে দেন। কেউ আবার ওজন কমাতে এতটাই বদ্ধপরিকর হয়ে যান যে, খাওয়াদাওয়া একেবারে বন্ধ করে দেন।
এই রোগের মূল থেরাপি হল— কগনিটিভ বিহেভিয়র থেরাপি। অর্থাৎ রোগীর চিন্তাভাবনাগুলিকে পরিবর্তন করা। এ ক্ষেত্রে উদ্বেগ বা অবসাদ কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়। পাশাপাশি, কাউন্সেলিংও করানো হয়।