ওজন কমানোর জন্য কি এই প্রদাহরোধী ডায়েট করা যায়? ছবি: সংগৃহীত।
কারও লক্ষ্য মেদ গলিয়ে তন্বী হয়ে ওঠা, কেউ চান পেটে গোলমাল বদহজম কমুক, কারও উদ্দেশ্য সুস্থ থাকা। লক্ষ্য আলাদা, সমস্যা আলাদা। তার জন্যই তৈরি হচ্ছে রকমারি ডায়েট। কিটো ডায়েট, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং, মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট, ড্যাশ ডায়েট ছেড়ে এখন চর্চা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ডায়েট বা প্রদাহরোধক ডায়েট নিয়ে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা আমির খান জানিয়েছেন, মাইগ্রেন কমাতে গিয়ে এমন ডায়েট শুরু করেছিলেন। আর তার প্রভাবে অজান্তেই ১৮ কেজি ওজন কমিয়ে ফেলেছেন। তার পরই শুরু হয়েছে এ নিয়ে আরও বেশি চর্চা। ওজন কমানোর জন্য কি এই ডায়েট করা যায়, না কি এর লক্ষ্য আলাদা?
কলকাতার পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক জানাচ্ছেন, এটি এমন এক ধরনের ডায়েট যার লক্ষ্য হল শরীরে প্রদাহ কমানো। কোনও বিশেষ খাবার নয়, বরং ফাইবার, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস রয়েছে, এমন খাবারই দৈনন্দিন তালিকায় জোড়া হয়। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত খাবার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলাও এই ডায়েটের জরুরি শর্ত।
কেন হইচই প্রদাহরোধক ডায়েট নিয়ে?
শরীরে যখন আঘাত লাগে বা জীবাণু প্রবেশ করে, তখন শরীর নিজেকে রক্ষা করার জন্য এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। একে বলা হয় ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ। এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু প্রদাহ কোনও কারণ ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে চলতে থাকলে তা কোষের ক্ষতি করতে শুরু করে। দেখা দেয় নানা রকম শারীরিক সমস্যা।
পুষ্টিবিদেরা বলছেন, খাদ্যতালিকায় বদল করে প্রদাহ বশে রাখা সম্ভব। আর তেমনটা হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। সুস্থ শরীরে বাঁচা যাবে দীর্ঘ দিন।
ডায়েটের লক্ষ্য
ওজন কমানো নয়, বরং এই ডায়েটের লক্ষ্য হল শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকা, প্রদাহজনিত অসুখ থেকে মুক্তি পাওয়া। অনন্যা বলছেন, ‘‘ডায়াবিটিস, ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স, পিসিওএস, ফ্যাটি লিভারের সমস্যা, কার্ডিয়োভাস্কুলার অসুখ, হাইপারটেনশন, আর্থ্রাটাইটিস, অ্যাজ়মা, এগ্জ়িমা, সোরিয়াসিস, ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজ়িজ়ের মতো অসুখ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই ধরনের ডায়েট উপযোগী।’’
আমির খান অবশ্য সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে জানিয়ছিলেন, তিন এই ডায়েট শুরু করেছিলেন মাইগ্রেনের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে।
ডায়েটের খাদ্যতালিকা কেমন হবে?
শাকসব্জি থেকে ফলমূল, দানাশস্য, ডাল— প্রতিটি খাবারের নিজস্ব কিছু পুষ্টিগুণ রয়েছে। অনন্যা বলছেন, ‘‘এই ডায়েটে মূলত জোর দেওয়া হয় উদ্ভিজ্জ খাবার এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের উপর। লক্ষ্যই থাকে এমন ধরনের খাবার বাছাই করার, যাতে রক্তে শর্করার মাত্রা আচমকা বেড়ে না যায়। একই সঙ্গে জোর দেওয়া হয় অস্বাস্থ্যকর এবং প্রক্রিয়াজাত খাওয়াদাওয়া এড়িয়ে চলার ব্যাপারেও।’’
অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ডায়েটে যা খাওয়া যায়
ফল ও শাকসবজি: বেরি জাতীয় ফল, লেবু জাতীয় ফল (কমলা, বাতাবি, মুসাম্বি), গাঢ় সবুজ শাক এবং ব্রকোলি বা ফুলকপি জাতীয় সবজি।
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: অলিভ অয়েল, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, বীজ (যেমন- তিসি বা কুমড়োর বীজ) এবং অ্যাভোকাডো।
ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার: সামুদ্রিক মাছ (যেমন- সার্ডিন, ম্যাকারেল বা রূপচাঁদা), তিসি বীজ এবং আখরোট।
দানাশস্য: ওট্স, ব্রাউন রাইস এবং মিলেট (বাজরা, জোয়ার বা কাওন)।
ডাল: যে কোনও ধরনের ডাল, বিন, কাবলি ছোলা।
ভেষজ ও মশলা: হলুদ, আদা, রসুন এবং দারচিনি।
ফারমেন্টেড বা মজানো খাবার: (পেটের স্বাস্থ্যের জন্য) টক দই, কেফির এবং কাঞ্জি।
প্রদাহ কমাতে হল এড়িয়ে চলা দরকার যে খাবার
পরিশোধিত চিনি ও মিষ্টি: অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার, মিষ্টি, কোল্ড ড্রিঙ্ক বা প্যাকেটজাত ফলের রস। এগুলি সরাসরি শরীরে প্রদাহ বাড়ায়।
ময়দা: ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার যেমন— সাদা পাউরুটি, বিস্কুট, কেক বা পিৎজ়া।
ডুবো তেলে ভাজা খাবার: শিঙাড়া, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা চিপ্স জাতীয় অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার।
প্রক্রিয়াজাত মাংস: সসেজ, নাগেটস, সালামি বা ক্যানবন্দি মাংস। কারণ এই খাবারগুলি লম্বা সময় ধরে ভাল রাখতে রাসায়নিক ব্যবহার হয়।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল: অতিরিক্ত মদ্যপান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করে।
ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিরিক্ত ওমেগা-৬ যুক্ত তেল: ডালডা, সয়াবিন তেল বা সূর্যমুখী তেলের অতিরিক্ত ব্যবহার। এগুলোর বদলে সর্ষের তেল বা অলিভ অয়েল বেশি ভাল।
এমন ডায়েটের সমস্যা কোথায়?
· রান্নার আগে উপকরণ নিয়ে ভাবনাচিন্তা দরকার। রাঁধতে হবে এমন ভাবে, যাতে পুষ্টিগুণ নষ্ট না হয়।
· মেনুতে সীমাবদ্ধতা, চিনি বাদ, ভাজাভুজি এড়িয়ে চলা ক্লান্তিকর মনে হতে পারে।
· উদ্ভিজ্জ খাবারে বেশি জোর দেওয়ার কারণে প্রোটিনের অভাব যাতে না হয়, সতর্ক থাকতে হবে।
প্রাপ্তবয়স্কেরা সকলেই এই ডায়েট করতে পারেন। কারণ, এটি কোনও ক্র্যাশ ডায়েট নয়। বরং সুস্থ থাকার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে ডায়টেটি। তবে পুষ্টিবিদ সতর্ক করছেন, দীর্ঘমেয়াদি অসুখ থাকলে ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। তা ছাড়া, কেউ যদি মনে করেন, দু’দিনেই আশাজনক ফল মিলবে, সেটিও ঠিক নয়।