ভোটের বাদ্যি বিহারে। সে রাজ্যের জন্য উপুড়হস্ত শুধু নয়, যার পর নাই তৎপর এখন নরেন্দ্র মোদীর সরকার। এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গকে অবহেলার অভিযোগে ফের মুখর হয়ে উঠল তৃণমূল। তাদের অভিযোগ, চলতি অর্থবর্ষ থেকেই অনগ্রসর জেলায় লগ্নিতে উৎসাহ দিতে কর ছাড়ের ঘোষণা করা হয়েছিল বাজেটে। বিহারে ভোটের মুখে কেন্দ্র ঘোষণা করেছে, ওই রাজ্যে কোন কোন জেলায় সেই ভাতা মিলবে। আর আর্থিক বছরের সাড়ে চার মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরেও পাশের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গকে শুনতে হচ্ছে ‘কাজ চলছে’, শিগ্গিরই হবে!
তৃণমূল নেতাদের প্রশ্ন, বিহারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও কি ২০১৬-র নির্বাচনের মুখে গিয়ে এ ব্যাপারে ঘোষণা হবে? এবং সেটাকে ভোটের ভেট হিসেবে তুলে ধরে ফায়দা লোটার চেষ্টা চালাবে বিজেপি?
এটা ঘটনা, নীতীশ কুমারের রাজ্যে গিয়ে পরশু বিহারের জন্য সওয়া এক লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দফতর জানায়, বাজেটের ঘোষণা অনুযায়ী বিহারের পিছিয়ে পড়া এলাকায় লগ্নির ক্ষেত্রে উৎসাহভাতা হিসেবে কর ছাড় দেওয়া হবে। এর পরে কাল নীতীশ যখন দিল্লিতে, সে সময়ই অর্থ মন্ত্রক ঘোষণা করে দেয়, বিহারের ২১টি জেলাকে অনগ্রসর চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিহার সফরের আগের দিনই তার বিজ্ঞপ্তিও জারি হয়ে যায়। এতেই ক্ষুব্ধ তৃণমূল। তাদের মতে, এটা পশ্চিমবঙ্গকে অবহেলার আরও একটি দৃষ্টান্ত।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বাজেটে ঘোষণা করেছিলেন, অন্ধ্রপ্রদেশের বিভাজনের পর অধিকাংশ শিল্পই তেলঙ্গানায় চলে গিয়েছে। তাই নবগঠিত অন্ধ্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ কর ছাড় দেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের অনগ্রসর জেলাগুলিতেও আগামী পাঁচ বছর এই কর ছাড়ের বন্দোবস্ত করবে কেন্দ্রীয় সরকার। অর্থ মন্ত্রক কাল ঘোষণা করেছে, পটনা, নালন্দা, গয়া, মধুবনি, মুজফ্ফরপুর-সহ বিহারের ২১টি জেলা এই সুবিধা পাবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন জেলা এই সুবিধা পাবে তা ঠিক হয়নি এখনও। কবে সিদ্ধান্ত হবে এ ব্যাপারে? অর্থ মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেন, ‘‘কাজ চলছে। খুব শীঘ্রই এই ঘোষণা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’’
সাধারণত নতুন লগ্নির ক্ষেত্রে উৎসাহাভাতা হিসেবে বিনিয়োগকারী সংস্থাকে আয়করের উপর ১৫% ছাড় দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের অনগ্রসর জেলাগুলির জন্য ২৫ কোটি টাকার বেশি লগ্নির ক্ষেত্রে ৩০% হারে ছাড় দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করে রেখেছেন জেটলি। কারখানার যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করার খরচ করার জন্য যে লগ্নি করতে হয়, সে ক্ষেত্রেও ১৫%-এর বদলে ৩০% ছাড় দেওয়া হবে। চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে ২০২০-র ৩১ মার্চ পর্যন্ত এই সুবিধা মিলবে।
তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় বাজেট অধিবেশনের শেষ পর্বে অর্থ বিল পাশ হওয়ার সময় এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন লোকসভায়। জেটলি জবাব দেন, বাজেটে যা ঘোষণা হয়েছে, সেই অনুযায়ীই সুবিধা পাবে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার। সৌগতবাবু জানাচ্ছেন, বাদল অধিবেশনের সময়ও জেটলি তাঁকে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের অনগ্রসর জেলাগুলির নাম ঘোষণা করে খুব শীঘ্রই বিজ্ঞপ্তি জারি হবে। কিন্তু এখনও তা হয়নি। এটাকে রাজ্যের প্রতি অবহেলা হিসেবেই দেখছে তৃণমূল।
তৃণমূলের জাতীয় মুখপাত্র ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, ‘‘আমরা ছ’দফা দাবি জানিয়ে আসছি কেন্দ্রের কাছে। কোনও দাবিই পূরণ হয়নি।’’ এই ছ’দফা দাবির মধ্যে রয়েছে রাজ্য সরকারের ঋণ ও সুদ মকুব, অনগ্রসর এলাকা উন্নয়ন তহবিলে বরাদ্দ করা অর্থের বকেয়া টাকা মঞ্জুর, বিশেষ এলাকা উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ, একশো দিনের কাজে বকেয়া অর্থ মঞ্জুর করার বিষয়গুলি। এর উপরে গত সপ্তাহে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২১ হাজার কোটি টাকার অর্থ সাহায্যের দাবি জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
অর্থ মন্ত্রক সূত্রের দাবি, জেলাগুলিকে চিহ্নিত করার কাজ চলছে। যত দ্রুত সম্ভব এই ঘোষণা হবে। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। অর্থ মন্ত্রকের কর্তারা মানছেন, জেলাগুলি চিহ্নিত হলে সেখানে বিনিয়োগ করতে শিল্পপতিরা বেশি উৎসাহিত হবেন। তবে তাঁদের যুক্তি, দেরিতে অনগ্রসর জেলাগুলির নাম ঘোষণা কর ছাড় মিলবে এ বছরের ১ এপ্রিল থেকেই।