মোদীর কর্পোরেট মন্ত্রে ফাঁপরে আমলারা

ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করতে চান? আড়াইশো শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান, আপনি নিজেকে কেন ওই পদের জন্য যোগ্য বলে মনে করেন। কর্পোরেট ঘরানায় সরকারি প্রশাসন চালানোর চেষ্টা করছেন নরেন্দ্র মোদী। সেই প্রচেষ্টায় এ বার এ এক নতুন পদক্ষেপ।

Advertisement

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০১৫ ০৩:৪০
Share:

ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করতে চান? আড়াইশো শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান, আপনি নিজেকে কেন ওই পদের জন্য যোগ্য বলে মনে করেন।

Advertisement

কর্পোরেট ঘরানায় সরকারি প্রশাসন চালানোর চেষ্টা করছেন নরেন্দ্র মোদী। সেই প্রচেষ্টায় এ বার এ এক নতুন পদক্ষেপ।

কর্পোরেট জগতে এ সব হামেশাই হয়ে থাকলেও সরকারি আমলাদের এ সব অভ্যাস নেই। শুধু নির্দিষ্ট আবেদনপত্র জমা দিলেই চলত। সরকারি স্তরে কর্পোরেট কায়দাকানুন নিয়ে আসার চেষ্টা শুরু হওয়ায় এ বার আমলারা পড়েছেন ফাঁপরে। মনে মনে ওয়াশিংটনে পাড়ির ইচ্ছে রয়েছে। কিন্তু নিজেকে যোগ্য বলে দাবি করতে গিয়ে হিতে বিপরীত হবে কি না, সেই শঙ্কাতেও ভুগছেন অনেকে। সরকারি সার্কুলার দেখে তাই অনেকেই কর্পোরেটে কর্মরত বন্ধুদের ফোন করে পরামর্শ নিচ্ছেন, কী ভাবে আড়াইশো শব্দে নিজেকে যোগ্য বলে প্রমাণ করা যায়।

Advertisement

নরেন্দ্র মোদী সরকারের ‘কর্পোরেট গভর্ন্যান্স’-এর নমুনা অবশ্য এটাই প্রথম নয়। এর আগে সমস্ত মন্ত্রকে নির্দেশ গিয়েছিল, ‘এ মাসের সেরা কর্মী’ এবং ‘এ বছরের সেরা কর্মী’ বাছতে হবে। যিনি সেরা হবেন, তিনি আর্থিক পুরস্কার না পেলেও শংসাপত্র পাবেন। নর্থ ব্লক বা সাউথ ব্লকের অলিন্দের দেওয়ালে তাঁর নাম-ছবি ঝোলানো হবে। মন্ত্রকের ওয়েবসাইটেও ছবি দেওয়া হবে। উদ্দেশ্য একটাই। কর্মীদের কাজে উৎসাহ দেওয়া। সরকারি কর্মীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে শিব খেরা বা চেতন ভগতের মতো ‘কর্পোরেট গুরু’ বা ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’-দেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রকে। দফতরে ঢোকা-বেরোনোর সময় রেকর্ড করার ব্যবস্থাও হয়েছে।

অনেকেই অবশ্য প্রশ্ন করছেন, এতে কী সত্যিই ফল মিলবে? পোড়খাওয়া আমলাদের অনেকের মত, কর্পোরেট জগৎকে অন্ধ অনুকরণ করলে তার উল্টো ফলও হতে পারে। কর্পোরেট সংস্থায় যে পেশাদার মনোভাব দেখা যায়, সরকারি স্তরে তার দেখা মেলে না। এক প্রবীণ অফিসার বলেন, ‘‘এখানে দফতরের এক জনকে মাসের সেরা কর্মী ঘোষণা করলে অন্যরা তাঁর উপরেই সব কাজ চাপিয়ে দিয়ে বলবে, তুমিই যখন সেরা, তুমিই সব কাজ করো।’’ অনেকে মনে করতে পারেন, উপরওয়ালাকে তোষামোদ করে বাকিরা সেরা কর্মী হচ্ছে। ফলে তাঁর কাজ করার ইচ্ছে চলে যেতে পারে।

কর্পোরেট জগতের মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের পদক্ষেপের আগে সব কিছু খতিয়ে দেখা দরকার। অ্যানালিটিক কনসালট্যান্ট-এইচআর সার্ভিসেস-এর ডিরেক্টর তুষার বসু বলেন, ‘‘এই ধরনের নতুন পদক্ষেপের আগে সংস্থায় এবং কর্মীদের মধ্যে সমীক্ষা হওয়া দরকার। কর্মীদের কাজের ক্ষেত্রে কতখানি কর্তৃত্ব, স্বাধীনতা, দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ভাবনা, ঊর্ধ্বতন ও নিচুতলার কর্মীদের সমর্থন, টিম ওয়ার্ক, টিম স্পিরিট—এই সব বিশ্লেষণের পরেই সব স্তরে আলোচনা করে সঠিক পদক্ষেপ করা দরকার।’’

কিছু দিন আগে বিভিন্ন মন্ত্রকের শীর্ষ স্তরের কর্মরত সচিবদের থেকেও ‘আউট অফ দ্য বক্স আইডিয়া’ চেয়ে পাঠিয়েছিল ক্যাবিনেট সচিবালয়। প্রশ্ন করা হয়েছিল, যে ভাবে গতানুগতিক পথে কাজ চলছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে কী ভাবে কাজ করা যায়? যদি আপনাকে পুরো স্বাধীনতা দিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে কী কী পদক্ষেপ করবেন?

তখনও সচিবরা বিপাকে পড়েছিলেন। ভেবেছিলেন কিছু লিখতে গিয়ে কোপের মুখে পড়তে হবে কি না? এ বার ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাসে মিনিস্টার (ইকনমিক) পদে আবেদন করতে গিয়ে ‘আমি কেন যোগ্য’ লিখতে গিয়ে যুগ্ম সচিবরা একই সমস্যায়। ওই পদে নিযুক্ত আমলা অর্থ মন্ত্রকের অর্থ বিষয়ক দফতরের অধীনে কাজ করবেন। ফলে অর্থ মন্ত্রকের আমলাদের উৎসাহই বেশি। কিন্তু দাঁতে পেন্সিল কামড়ে তাঁদের প্রশ্ন, কেন এ সব জানতে চাওয়া হচ্ছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসলে কর্মীদের নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে কতখানি ধারণা আছে, তা বোঝার জন্যই এ সব জানতে চাওয়া। অর্থ মন্ত্রকের এক যুগ্ম সচিবের বক্তব্য, ‘‘এ উভয় সঙ্কট। ওয়াশিংটনেও যাওয়া হবে কি না, ঠিক নেই। এ দিকে আমার দুর্বলতাও ফাঁস হয়ে গেল।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement