খলিলুরের শপথগ্রহণ। —নিজস্ব চিত্র।
যাবতীয় হিসাব উল্টে বাংলাদেশের অন্তর্বতিকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে বিদেশমন্ত্রী করা। প্রথম বার জিতে আসা একঝাঁক সাংসদকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া। জোটসঙ্গীদের পূর্ণমন্ত্রিত্ব না দেওয়া। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এমন নেতাদের সঙ্গে, জামায় কালির দাগ না-লাগা প্রবীণদেরও সমগুরুত্বে ঠাঁই দেওয়া।
এক কথায়, আজ শপথ নেওয়া বাংলাদেশের নতুন মন্ত্রিসভায় রয়েছে এমনই সব রাজনৈতিক পাঁচফোড়ন, যা নিয়ে এখনই নাড়াচাড়া করতে চাইছে না সাউথ ব্লক। বরং সতর্ক নজর রাখতে চাইছে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সরকারের অগ্রগতির দিকে। আজ শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্পিকার ওম বিড়লা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পাঠানো চিঠি তুলে দিয়েছেন বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে। চিঠিতে তারেককে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মোদী। জানিয়েছেন, ‘আমাদের বহুমুখী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে, সংযোগ বাণিজ্য, প্রযুক্তি শিক্ষার মতো ক্ষেত্রে উভয়ের লক্ষ্য পূরণে আপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করতে আগ্রহী। দুটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে ভারত এবং বাংলাদেশ পরস্পরের সুস্থায়ী উন্নয়নে ভূমিকা নিতে পারে।’
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ, প্রবীণ নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টু, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর ঢাকা থেকে ফোনে বলেন, “ভারত-সহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার কথা কয়েক দিন আগেই আমাদের চেয়ারম্যান এবং অধুনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন। সেই সূত্র ধরেই বলতে চাই, ভারতের সঙ্গেও সম্পর্কের উন্নতির পথে এগোবো আমরা। তবে এক রাতেই সব কিছু শুধরে যাবে এমনটা নয়। বেশি কিছু সংঘাতবিন্দু রয়েছে। সেগুলির মীমাংসা দরকার। যেমন শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নিয়ে থাকার বিষয়টি নিয়েও অনেক কথা উঠছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বলেছিল ২০১৪, ২০১৮ এবং ২৪-এও নির্বাচনের নামে লোক ঠকানো হয়েছে। ভারত তথাপি আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থেকেছে, তাই আওয়ামী লীগ বিরোধিতা এবং ভারত বিরোধিতার বয়ান এ দেশে এক হয়ে গিয়েছিল।” তাঁর কথায়, “ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ভাল করলে আমরাও তো উপকৃত হব। অ্যাডাম স্মিথের কথা উদ্ধৃত করে বলা যায়, প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্য ভাল না করতে পারলে কোনও দেশেরই অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধির কোনওসুযোগ নেই।”
প্রথম বার মন্ত্রী হয়েছেন জহির উদ্দীন স্বপন। পেয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের দায়িত্ব। বাম ঘরানা থেকে উঠে আসা এই বিএনপি নেতা ঢাকা থেকে ফোনে বললেন, “আমরা এত দিন দেখেছি ফ্যাসিবাদী সরকার গণমাধ্যমের গলা টিপে ধরতে চেয়েছে। দেখেছি নিজেদের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করার জন্য, গণমাধ্যমকে নিজেদের মতো করে চালনা করার জন্য গণবিরোধী শক্তিকে কাজে লাগানো হয়েছে। এ বার তা বন্ধ করার চেষ্টা করব।”
তবে এই মন্ত্রিসভার সবচেয়ে বড় চমক জড়িয়ে রয়েছে বিদেশমন্ত্রী বাছাইয়ে, যা কিনা ভারতের ভবিষ্যতের কূটনৈতিক দৌত্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পেশায় প্রকৌশলী খলিলুর রহমানকে বিদেশমন্ত্রী করায় অবাক অনেকেই। মনে করা হচ্ছে ইউনূস সরকারের একটা ছাপ এই সরকারে থেকে গেল। তিনি ছিলেন ইউনূস সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা। মন্ত্রিসভার সচিব করা হয়েছে নাসিমুল গনিকে যিনি ইউনূস সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব ছিলেন। গনিকে নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুল তাহরীরের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। চর্চা ছিল, তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সচিব হুমায়ুন কবীরকে বিদেশমন্ত্রী করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে মন্ত্রিসভায় না রেখে কেন খলিলুরকে আনা হল, তাতে বিস্মিত বাংলাদেশেররাজনৈতিক মহল।
প্রথম বারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে নির্বাচিত সংসদ সদস্য থেকে ২৩ জন এবং দু’জন প্রকৌশলী (টেকনোক্র্যাট) মন্ত্রী রয়েছেন। বিএনপি'র প্রবীণ নেতাদের মধ্যে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ। অতীতে এঁরা সবাই বিএনপি-র মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। মেয়েদের মধ্যে একমাত্র আফরোজা খানম রিতা পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন। অন্যতম সংখ্যালঘু মুখ নিতাই রায় চৌধুরী। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রথম সরকারে তিনি প্রথমে প্রতিমন্ত্রী পরে পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। তারেক তাঁর মায়ের অত্যন্ত আস্থাভাজন এই নেতা তথা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীকে এ বারও পূর্ণ মন্ত্রী করেছেন শুধু নয়, তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি মন্ত্রকের দায়িত্বও দিয়েছেন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে