নকল তাজ বানিয়ে জঙ্গি প্রশিক্ষণ, স্বীকারোক্তি হেডলির

হামলা চালাতে গিয়ে যাতে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তার জন্য জঙ্গিদের প্রস্তুতিতে আস্ত একটি তাজ হোটেল! চমকের পর চমক। ২৬/১১-র মুম্বই মামলায় যত মুখ খুলছেন ডেভিড কোলম্যান হেডলি, তত ওই হামলার আগে জঙ্গিদের প্রস্তুতির বহর দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছেন ভারতীয় গোয়েন্দারা।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ২১:৪৪
Share:

হামলা চালাতে গিয়ে যাতে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তার জন্য জঙ্গিদের প্রস্তুতিতে আস্ত একটি তাজ হোটেল!

Advertisement

চমকের পর চমক। ২৬/১১-র মুম্বই মামলায় যত মুখ খুলছেন ডেভিড কোলম্যান হেডলি, তত ওই হামলার আগে জঙ্গিদের প্রস্তুতির বহর দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছেন ভারতীয় গোয়েন্দারা।

গতকাল মুম্বই হামলার সঙ্গে পাক জঙ্গি ও সে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের নেপথ্য কাহিনি জানিয়েছিল হেডলি। কী ভাবে সে সাত বার ভারতে এসে সরেজমিন নিশানাস্থলগুলি ঘুরে গিয়েছিল তা নিয়েও ভিডিও কনফারেন্সিং-এর মাধ্যমে জেরায় মুখ খোলে হেডলি। আর আজ সে জানাল, তার দেওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে কী ভাবে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল কাসভ ও তার দলবলকে।

Advertisement

হেডলিকে জেরার আজ ছিল দ্বিতীয় দিন। সরকারি আইজীবী উজ্জ্বল নিকমের জেরার মুখে সে জানায়, ২০০৭ সালে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের মুজফফ্‌রাবাদে একটি বৈঠক বসে লস্কর-ই–তৈবা এবং আইএসআই। বৈঠকে আক্রমণের অন্যতম নিশানা হিসাবে বেছে নেওয়া হয় মুম্বইয়ের তাজ হোটেলকে। হেডলি জানিয়েছে, সে সময়ে তাজ হোটেলে প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের একটি সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। জঙ্গিরা সেই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আগত বিজ্ঞানীদের হত্যা করার ছক কষে। হেডলির দাবি, সেইমতো জঙ্গিদের পরামর্শে সে তাজ হোটেলের সামগ্রিক নকশা জানতে মুম্বই উড়ে আসে। সঙ্গে ছিল তার স্ত্রী। নিজেদের মধুচন্দ্রিমায় আসা দম্পতি হিসাবে পরিচয় দিয়ে তাজ হোটেলের দু’তলায় ঘর ভাড়া নেয় হেডলি। কারণ, একে ওই সম্মেলনটি দু’তলার কনফারেন্স হলে হওয়ার কথা ছিল। আর দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ বিজ্ঞানীরই দোতলার ঘরে থাকার কথা ছিল। সেই কারণে সমগ্র দোতলার ভিডিওগ্রাফি করে হেডলি। সেই ভিডিও এর পর চলে যায় জঙ্গিদের কাছে।

তার পরের স্বীকারোক্তি চমকে দিয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের। হেডলি জানিয়েছে, সেই ভিডিওর ভিত্তিতে একটি নকল তাজ হোটেল বানানো হয় পাকিস্তানের মাটিতে। জঙ্গিরা সেখানে কোন দরজা দিয়ে ঢুকে আক্রমণ শানাবে এবং হত্যাকাণ্ড শেষ করে কোথা দিয়ে পালিয়ে আসবে সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কাসভদের। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বলছে, কেন সে সময়ে প্রায় সাত দিন ধরে জঙ্গিরা লড়তে সক্ষম হয়েছিল তা এখন বোঝা যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ধারণা ছিল, ওই জঙ্গিদের কাছে হোটেলের ম্যাপ রয়েছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, আসল তাজে কোথায় কোন গলিঘুঁজি রয়েছে তা নকল তাজে প্রশিক্ষণ চালাতে গিয়ে জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল জঙ্গিদের কাছে। ফলে কোন দিক দিয়ে প্রতি-আক্রমণ আসতে পারে সে সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা ছিল জঙ্গিদের। যদিও শেষ পর্যন্ত কেন বিজ্ঞানীদের সম্মেলনে কোনও হামলা হয়নি তার ব্যাখ্যায় হেডলি বলেছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও বিস্ফোরক কাসভদের হাতে তুলে দিতে ব্যর্থ হয় আইএসআই। ফলে পিছিয়ে দিতে হয় হামলার তারিখ। বেঁচে যান বিজ্ঞানীরা।

আরও পড়ুন

বড়সড় হামলার আশঙ্কা, হঠাৎ গোয়াদরকে নিশ্ছিদ্র দুর্গ বানালো পাক সেনা

গতকালই হেডলি জানিয়েছিল, মুম্বই ছাড়াও তাদের নিশানায় ছিল রাজধানী দিল্লিও। আজ হেডলি জানায়, মুম্বইতে তাজ ছাড়াও জঙ্গিদের নিশানায় ছিল সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির, মুম্বইয়ের নৌ-দফতর, দক্ষিণ মুম্বইয়ে মহারাষ্ট্র পুলিশের সদর দফতরও। পরামর্শ মতো হেডলি ওই সব ভবনের ভৌগলিক অবস্থান কী তা জিপিএস যন্ত্রে সংরক্ষণ করে নেয়, যাতে জঙ্গিদের নিশানা খুঁজতে সমস্যা না হয়। পরে ভিডিও-র সঙ্গেই ওই জিপিএস যন্ত্র তুলে দেওয়া হয় লস্করের কম্যান্ডার সাজিদ মিরের হাতে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে লস্কর এবং আইএসআই, দু’পক্ষ কী ভাবে, কোথায় হামলা চালানো হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত ছক কষে।

গতকালের মতো আজও হেডলি খোলসা করেছে, কী ভাবে জঙ্গিদের ভারত বিরোধী কাজে মদত দিয়ে থাকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। তার দাবি, শুধু লস্করই নয়, হিজবুল মুজাহিদিন, জৈশ-ই-মহম্মদের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলে আইএসআই। তারা ওই জঙ্গিদের আর্থিক, সামরিক ও মানসিক ভাবে সাহায্য করে থাকে। ভারতের কাছে অবশ্য এ তথ্য নতুন নয়। এ দেশে জঙ্গি কার্যকলাপের পিছনে আইএসআইয়ের হাত রয়েছে বলে কয়েক দশক ধরে দাবি করে আসছে নয়াদিল্লি। এ বিষয়ে একাধিক প্রমাণ তুলে দেওয়া সত্ত্বেও তা মানতে চায়নি পাকিস্তান। এখন জেরায় হেডলি পাক যোগাযোগের যে তথ্য আদালতকে জানিয়েছে, তার উপর ভিত্তি করে পাকিস্তানকে নতুন করে একটি ডশিয়্যার তুলে দিতে চলেছে ভারত। নয়াদিল্লির যুক্তি, এ যাবৎ এ দেশে ধৃত জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে যা জানা গিয়েছে তা পাকিস্তানকে জানানো হয়েছে। কিন্তু পুলিশি জবানবন্দি বলে ওই তথ্যের সত্যতা পাকিস্তান মানতে চায়নি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হেডলি আদালতের সামনে কবুল করায় তার বক্তব্য খারিজ করে দেওয়া ইসলামাবাদের পক্ষে এত সহজ হবে না বলেই মনে করছে ভারত। পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছে আমেরিকাও। মার্কিন বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র জন কির্বি বলেন, ‘‘মুম্বই হামলার দোষীরা যাতে শাস্তি পায় তার জন্য ভারতকে সব ধরনের সাহায্য করতে দায়বদ্ধ আমেরিকা।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement