আতঙ্ক ছড়াচ্ছে উত্তরে

প্রাণ দিয়ে বাঁচিয়ে গেলেন মেয়েকে

কোলের মেয়েকে আঁকড়ে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছেন এক তরুণী মা। বেগো বসুমাতারি। নিউ আমগুড়িতে বাড়ি। তাঁর জন্যই কাচের চুড়ি আর একরত্তি মেয়ের জন্য জুতো কিনতে বাজারে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী পেশায় অটো চালক দাওরাও বসুমাতারি। রান্নাবান্না থাকায় বেগো যেতে চাননি।

Advertisement

রাজীব চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৬ অগস্ট ২০১৬ ০৩:১১
Share:

মেয়েকে নিয়ে বেগো বসুমাতারি।

কোলের মেয়েকে আঁকড়ে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছেন এক তরুণী মা। বেগো বসুমাতারি। নিউ আমগুড়িতে বাড়ি।

Advertisement

তাঁর জন্যই কাচের চুড়ি আর একরত্তি মেয়ের জন্য জুতো কিনতে বাজারে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী পেশায় অটো চালক দাওরাও বসুমাতারি। রান্নাবান্না থাকায় বেগো যেতে চাননি। তাই মেয়েকে কোলে নিয়েই বাজারে ঢুকছিলেন দাওরাও। হঠাৎ গ্রেনেড বিস্ফোরণে দোকান জ্বলে ওঠে। মুহূমুর্হু গুলির শব্দে মেয়েকে বুকে আগলে ছুটতে শুরু করেছিলেন দাওরাও। তত ক্ষণে আড়াই বছরের ফারমিনার পায়ে গ্রেনেড বিস্ফোরণের পরে ছিটকে আসা কোনও কিছু লেগে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে। দাওরাও উদভ্রান্তের মতো ছুটতে শুরু করেন। একটা গুলি তাঁর মাথায় লাগে। একটা গুলি পিঠে। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেও মেয়েকে বুকে আগলে কিছুটা ছোটেন। শেষে একটা দোকানের ছাউনির আড়ালে গিয়ে লুটিয়ে পড়েন দাওরাও (৩৮)। মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ছোট্ট মেয়েটাকে বুক দিয়ে আড়াল করে রেখেছিলেন। লড়াই থামার পরে রক্তাক্ত ফারমিনাকে উদ্ধার করার সময় চিরঘুমে চলে গিয়েছেন দাওরাও।

হাসপাতালে আহতদের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা কোকরাঝাড় থানার এক পুলিশ অফিসারের কথায়, ‘‘দাওরাওয়ের মুখে কিন্তু যন্ত্রণার চিহ্ন ছিল না। হয়তো মেয়েকে বাঁচাতে পেরে প্রশান্তি নিয়ে মরেছেন উনি।’’ অন্যমনস্ক হয়ে যান প্রবীণ পুলিশ অফিসার।

Advertisement

পাশের ওয়ার্ডে শুয়ে রয়েছেন লালচান আলি। তাঁর কাঁধে গুলি লেগেছে। কাপড় ব্যবসায়ী লালচান বলেন, ‘‘দোকান খুলেছি সকালেই। দুপুর নাগাদ বেশ ভিড় ছিল। হঠাৎ শুনি কানা ফাটা শব্দ। ভাবলাম ডাকাত পড়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি আগুন, রক্তারক্তি কাণ্ড। জান বাঁচাতে ছুট লাগাই সকলেই। তখনই কাঁধের মধ্যে যেন হাতি ধাক্কা দিল। পড়ে গেলাম রাস্তায়। পরে কারা যে, কখন তুলে হাসপাতালে ভর্তি করল জানি না।’’

একের পর এক শয্যায় একই করুণ কাহিনী। ঘুরে ঘুরে হাট-বাজারে ব্যবসা করেন অধিকাংশই। পালানোর সময়ে দোকানের কোনও জিনিস নিতে পারেননি। সব এলোমেলো গিয়েছে তাঁদের।

সেই ছবি ধরা রয়েছে বালজান বাজারেও। কোথাও ঢ্যাঁড়সের ঝুড়িতে টাটকা রক্তের দাগে। ফিনকি দিয়ে পরা রক্তে লাল হয়ে যাওয়া লাউ কোথাও গড়াগড়ি খাচ্ছে দুমড়ে যাওয়া সাইকেলের পাশে। কোথাও মসলার দোকান রক্তে ছয়লাপ। কোথাও আবার রাশি রাশি কাচের চুড়ি ছড়িয়ে রয়েছে। বাজারের এক কোণে কত ধরনের শাকের পাহাড়। অদূরেই গবাদি পশুর হাট। কিন্তু, গরু-ছাগলও কেমন সিঁটিয়ে অনেকটা দূরে জঙ্গলের দিকে সরে গিয়েছে। সুনসান বাজারে শুধুই টহলদারি বাহিনীর বুটের শব্দ। তারই মধ্যে দুয়েকজন ক্রেতা-বিক্রেতার বুকফাটা আর্তনাদ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement