মায়ের ছবির সামনে ছোট্ট আলফুল। —নিজস্ব চিত্র।
চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগে স্ত্রীর মৃত্যুর প্রতিবাদে পথে নামলেন স্বামী। দিল্লির দুই হাসপাতাল ও দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়ে ইতিমধ্যেই দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী-সহ দিল্লির পুলিশ কমিশনারকে চিঠি লিখেছেন গুয়াহাটির বাসিন্দা অঙ্কুরন দত্ত। তাঁর স্ত্রীর মতো অন্য কাউকে চিকিৎসার গাফিলতির শিকার যাতে না হতে হয়, তার জন্য তিনি আমরণ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন অঙ্কুরনবাবু।
গলব্লাডারে পাথর হয়েছিল বলে দিল্লির একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে যান অঙ্কুরনবাবুর স্ত্রী এবং গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক অনামিকা রায় (দত্ত)। ১৯ জুলাই মৃত্যু হয় তাঁর। স্ত্রীর মৃত্যুর সময় দিল্লিতে ছিলেন অঙ্কুরনবাবু। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের গাফিলতিতেই মৃত্যু হয়েছে স্ত্রীর। এই ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়কেও চিঠি দিয়েছেন।
ঠিক কী ঘটেছিল?
গত বছর জুলাইয়ে কর্মসূত্রে অঙ্কুরনবাবু দিল্লিতে ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি থাকায় অনামিকা স্বামীর কাছে দিল্লিতে এসেছিলেন। তখনই গলব্লাডারে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত হয়। সেই মতো ১৬ জুলাই দিল্লির নবজীবন হাসপাতালে ভর্তি হন অনামিকা। অঙ্কুরনবাবুর অভিযোগ, পর দিন সকালে অপারেশনের পরে তাঁর স্ত্রীর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। হাসপাতালের তরফে তাঁকে জানানো হয়, অপারেশনের সময় হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। হৃৎপিণ্ড বৃদ্ধি হওয়ার কারণেই এমনটা হয়েছে।
অথচ অঙ্কুরনবাবুর দাবি, অনামিকার হার্টে কোনও সমস্যা ছিলই না। তা ছাড়া, অপারেশন করার আগে হাসপাতাল এই সংক্রান্ত কোনও পরীক্ষাও করেনি। ভর্তি করানোর পর দিন হাসপাতাল সূত্রে তাঁকে বলা হয়, স্ত্রীকে অন্যত্র পাঠানো হবে। কিন্তু কোন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে, সেটা পর্যন্ত তাঁকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ অঙ্কুরনের। নবজীবন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে অনামিকাকে ১৭ জুলাই সন্ধ্যাবেলায় অন্য হাসপাতালে ভর্তি করে বলে জানাচ্ছেন তিনি। ১৯ জুলাই গভীর রাতে মৃত্যু হয় অনামিকার।
অঙ্কুরন বলছেন, ‘‘চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ চাপা দিতে ডেথ সার্টিফিকেটে প্রথমে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর কারণই লেখা হয়নি। পরে তিনি যখন মৃত্যুর কারণ জানতে চান, তখন ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয়, ‘কার্ডিও মায়োপ্যাথি’।’’ যা মানতে নারাজ অঙ্কুরন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি দুই চিকিৎসক চন্দনকুমার ডেকা এবং অভিজিৎ খাউন্ডের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে তাঁর। তিনি বলছেন, ‘‘দ্বিতীয় বার অন্য হাসপাতালে ভর্তি করার পরে অনামিকার ইকো কার্ডিও হয়েছিল। ওই রিপোর্ট কিন্তু বলছে, হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিক। তা হলে মৃত্যুর কারণ হিসাবে কেন ভুল তথ্য লেখা হচ্ছে?’’
দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে গত বছরের ৬ নভেম্বর দিল্লির দক্ষিণ রোহিণী থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন অঙ্কুরনবাবু। মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবালকে চিঠি লিখেছেন ৭ নভেম্বর। অঙ্কুরন জানিয়েছেন, তাঁর চিঠির জেরে ইতিমধ্যে দিল্লির মেডিক্যাল কাউন্সিল ও ডিরেক্টর অব হেলথ সার্ভিস-এর তরফে তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। নবজীবন হাসপাতালের কর্ণধার নবীন বনশল বলেন, ‘‘অপারেশনের সময় অনামিকা দত্তের অ্যানাস্থেশিয়া করার পরে তাঁর হৃদ্যন্ত্রের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু একে বড় করে দেখানো হচ্ছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক।’’ তিনি আরও জানান, অনামিকার যিনি অপারেশন করেছেন, সেই চন্দনকুমার ডেকা অভিজ্ঞ চিকিৎসক। এর আগে প্রায় এক হাজার রোগীর গলব্লাডার অপারেশন সাফল্যের সঙ্গে করেছেন। তাই চিকিৎসকের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠার কথা নয়।
অনামিকা-অঙ্কুরনের একমাত্র কন্যা চার বছরের ‘আলফুল’। অসমিয়া এই শব্দের অর্থ, খুব নরম। একরত্তি আলফুলের জন্য দিল্লির চাকরি ছেড়ে সম্প্রতি গুয়াহাটিতেই ফিরে এসেছেন অঙ্কুরন। বাড়ি থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে একটি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করছেন। নিজেই সময় করে মেয়েকে খাওয়ান। ছোট্ট মেয়ের নিরাপত্তায় বাড়ির চারদিকে বসিয়েছেন সিসিটিভি।
এত অভিযোগ জানিয়েছেন। ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে যাবেন না?
অঙ্কুরন বলছেন, ‘‘ক্ষতিপূরণ চাই না। মা হারা ছোট্ট মেয়েকে টাকা দিয়ে কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় কি?’’ তিনি শুধু চান, চিকিৎসায় গাফিলতিতে অনামিকার মতো আর কারও যেন মৃত্যু না হয়। ফেসবুকে ‘জাস্টিস ফর অনামিকা’ নামে একটি পেজ তৈরি করেছেন তিনি। দুঃস্থ পড়ুয়াদের সাহায্যার্থে গড়ে তুলেছেন ‘অনামিকা রায় মেমোরিয়াল ট্রাস্ট।’