প্রাক্তন সেনাপ্রধান নরবণের অপ্রকাশিত স্মৃতিকথা হাতে রাহুল গান্ধী। কংগ্রেসের প্রকাশ করা ছবি ফাইল চিত্র।
বিরোধীদের হট্টগোলের কারণে কিছুটা নজিরবিহীন ভাবেই আজ লোকসভায় বলতেই পারলেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের ধন্যবাদজ্ঞাপন প্রস্তাবের জবাবে মোদীর বলার কথা থাকলেও, বিরোধীদের প্রবল হট্টগোলের কারণে অধিবেশন মুলতুবি করতে বাধ্য হয় শাসক শিবির। যা নজিরবিহীন বলেই মন্তব্য করছেন রাজনীতিকেরা। তাঁদের মতে, অতীতে প্রধানমন্ত্রীর বলার সময়ে পুরোদস্তুর বাধা দিয়েছেন বিরোধীরা। কিন্তু আজ তো বক্তব্য শুরুই করতে পারলেন না মোদী। সূত্রের মতে, সব ঠিক থাকলে আগামিকাল লোকসভায় বলার কথা মোদীর। যদিও বিরোধীরা জানিয়েছেন, তাঁরা বিন্দুমাত্র জমি ছাড়তে নারাজ।
প্রাক্তন সেনাপ্রধান এম এম নরবণের অপ্রকাশিত বই তো অছিলা মাত্র। আসলে ঘুষ কেলেঙ্কারিতে নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু শিল্পপতি গৌতম আদানিকে আমেরিকার সমন ও আমেরিকার ধনকুবের তথা যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের ফাইলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম আসার কারণে তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শর্ত মেনে বাণিজ্য চুক্তি করে দেশের স্বার্থের সঙ্গে আপস করেছেন—কংগ্রেসের তোলা ওই অভিযোগের কারণে গত দু’দিন ধরে দফায় দফায় মুলতুবি হয়ে চলেছে লোকসভা। আজও লোকসভার অধিবেশন শুরু হতেই ওই একই বিষয় নিয়ে ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ দেখাতে থাকে কংগ্রেস-সহ বিরোধী প্রায় সব দলই। বারণ সত্ত্বেও আজ প্রায় পনেরো ফুট লম্বা একটি ব্যানার নিয়ে এসেছিলেন রাহুলেরা। যাতে এক দিকে নরবণের ছবি ও অন্য দিকে মোদী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের ছবি ছাপা ছিল। মাঝে লেখা, ‘যো উচিৎ সমঝো ও করো’ (যেটা ঠিক মনে হয়, সেটাই করো)।
বইয়ের প্রকাশিত অংশ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৩১ অগস্ট লাদাখে চিন সেনার অগ্রগতির খবর পেয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান নরবণে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ, চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ বিপিন রাওয়াত, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল—সকলকে ফোন করে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা জানতে চান।... বেশ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরে রাজনাথ সেনাপ্রধানকে ফোন করে জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বলেছেন ‘যো উচিৎ সমঝো ও করো’। বিরোধীদের অভিযোগ, ওই কথা বলে আসলে ঘটনার ভাল-মন্দের দায় সেনাপ্রধানের উপর ঠেলে দিয়েছিলেন সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব। আজ তাই সরকারকে কটাক্ষ করে ওই ব্যানারটি নিয়ে আসেন কংগ্রেস সাংসদেরা। রাহুল বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যদি লোকসভায় আসেন, তা হলে আমি নিজের হাতে ওই বইটি উপহার দেব।”
বেলা ২টোর পরে লোকসভা বসতেই বক্তব্য রাখার জন্য বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের নাম ডাকেন সেই সময়ে স্পিকারের আসনে থাকা কৃষ্ণপ্রসাদ টেনেটি। নিশিকান্তবলতে উঠেই জহওরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে লেখা বইয়ের প্রসঙ্গ তুলে সরব হন। ফলে হট্টগোল তুঙ্গে ওঠে। বিরোধী সাংসদেরা স্পিকারের চেয়ার লক্ষ্য করে কাগজ ছুঁড়ে দিয়ে প্রতিবাদ জানান। মুলতুবি হয়ে যায় সংসদ। বৈঠক বসে স্পিকার ওম বিড়লার ঘরে। স্পিকারকে কংগ্রেস নেতৃত্ব জানিয়ে দেন, আগে নিশিকান্তকে ক্ষমা চাইতে হবে, তবেই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সময়ে বাধা দেওয়া হবে না। কংগ্রেস সাংসদ দীপেন্দ্র হুডা প্রশ্ন তোলেন, রাহুল বইয়ের উদাহরণ তুলে বলতে গেলে তাঁর মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু আজ নিশিকান্তের সময়ে কেন তা করা হয়নি? বিষয়টি নিয়ে স্পিকারের ঘরেই শাসক শিবিরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন বিরোধীরা।
নিশিকান্তের বিষয়ে জানাবে বলে আশ্বাস দেয় সরকার। যদিও ক্ষমা চাওয়া তো দূরে থাক, পরে সাংবাদিক সম্মেলন করে নিশিকান্ত দাবি করেন, নেহরু জামানায় ওই বইগুলি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কেন, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হোক। বিরোধীরা বুঝে যান, নিশিকান্ত ক্ষমা চাইবেন না। পাল্টা বার্তায় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হয়, প্রধানমন্ত্রীকেও ছেড়ে কথা বলা হবে না। অচলাবস্থা কাটাতে প্রধানমন্ত্রী ও তার পরে স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
বিকেল পাঁচটায় অধিবেশন শুরু হলে দেখা যায় শাসক শিবিরের সামনের সারির আসন সম্পূর্ণ ফাঁকা। অনুপস্থিত মোদী। স্পিকারেরআসনে থাকা সন্ধ্যা রায় বিজেপি সাংসদ পি পি চৌধুরীকে বিতর্কে বলার নির্দেশ দিতেই হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। বিরোধী সাংসদেরা ওয়েলে নেমে আসেন। কংগ্রেসের মহিলাসাংসদেরা শাসক শিবিরের বেঞ্চের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েন। কিছু মহিলা সাংসদ প্রধানমন্ত্রী যে পথে এসে বেঞ্চে বসেন, সেই পথে দাঁড়িয়ে পড়েন। বিজেপির এক সাংসদের অভিযোগ, ‘‘বিরোধী মহিলা সাংসদদের আসল নিশানা ছিল আসলে নিশিকান্ত দুবে।’’ মহিলা সাংসদদের এগিয়ে আসতে দেখে পিছনের দিকে চলে যানরেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ও নিশিকান্ত। যা নিয়ে প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরার কটাক্ষ, ‘‘রেলমন্ত্রী ও নিশিকান্ত তো বুলেট ট্রেনের গতিতে পালিয়ে গেলেন।’’ বিজেপি সূত্রের মতে, আগামিকাল রাষ্ট্রপতি বক্তব্যের ধন্যবাদজ্ঞাপন বিতর্কে বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সূত্রের মতে, যদি আজকের মতোই ফের ঝামেলা হয়, তা হলে প্রয়োজনে মার্শালের সাহায্য নেওয়া হতে পারে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে