সুপ্রিম কোর্ট পরিষদীয় সচিব নিয়ে সব পক্ষের বক্তব্য চায়

রাজ্য সরকারের পরিষদীয় সচিব নিয়োগের সিদ্ধান্তকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে বাতিল করে দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। রাজ্যের আর্জি মেনে সেই রায়ের উপরে স্থগিতাদেশ দিতে রাজি হল না সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত, আগে সব পক্ষের বক্তব্য শোনা হবে।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৮ অগস্ট ২০১৫ ০৩:১০
Share:

রাজ্য সরকারের পরিষদীয় সচিব নিয়োগের সিদ্ধান্তকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে বাতিল করে দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। রাজ্যের আর্জি মেনে সেই রায়ের উপরে স্থগিতাদেশ দিতে রাজি হল না সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত, আগে সব পক্ষের বক্তব্য শোনা হবে। তার পরে হবে ফয়সালা। এক মাস পরে ফের এই মামলার শুনানির দিন ধার্য করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

Advertisement

সংবিধানের ১৬৪ (১ এ) ধারা মতে, মন্ত্রিসভার আয়তন সেই রাজ্যের বিধানসভার মোট সদস্যের ১৫%-এর বেশি হবে না। সেই হিসাবে ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ৪৪ জন মন্ত্রী থাকার কথা। কিন্তু মন্ত্রিসভার ‘কোটা’ পূরণ করে ফেলার পরেও ২০১২ সালে পরিষদীয় সচিব পদের (নিয়োগ, বেতন, ভাতা ও আনুষঙ্গিক নিয়মবিধি) জন্য আইন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। এই আইনের বলেই প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার সমতুল পরিষদীয় সচিব পদ তৈরি হয়। মন্ত্রীদের মতো তাঁদেরও বেতন, ভাতা থেকে শুরু করে নীল বাতির গাড়ি, আর্দালি, পিএ ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করেন মুখ্যমন্ত্রী। এঁদের মূল বেতন ছিল মাসে ৭৮৫০ টাকা। সঙ্গে ৩০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা। প্রথম ধাপে ২৬ জন পরিষদীয় সচিব নিয়োগ করা হয়েছিল। তাপস রায়, পুলক রায়, রবীন্দ্রনাথ ঘোষের মতো অনেকেই পরিষদীয় সচিবের পদ পেয়েছিলেন। আবার মুকুল রায়ের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠতা’র অভিযোগে শীলভদ্র দত্তকে পদ পেয়েও হারাতে হয়েছিল। ফলে, হাইকোর্টের রায়ে ওই পদ বাতিলের সময়ে পরিষদীয় সচিবের সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছিল ২৩-এ।

রাজ্যের আইনকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৩ সালে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থের মামলা হয়। আবেদনে বলা হয়েছিল, কিছু বিধায়ককে ‘পদ পাইয়ে’ দিতেই এই আইন তৈরি। জনগণের টাকায় পরিষদীয় সচিবদের প্রতিমন্ত্রীর সমান মর্যাদা, বেতন ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় দু’বছর মামলার শেষে গত ১ জুন আইনটিকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে আখ্যা দিয়ে খারিজ করে দেয় প্রধান বিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুরের ডিভিশন বেঞ্চ। রায়ে স্থগিতাদেশ চেয়ে রাজ্যের তরফে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চেই আবেদন জানানো হয়েছিল। বেঞ্চ নাকচ করে দেয়। রাজ্যের সামনে তাই সুপ্রিম কোর্টে এসে হাইকোর্টের রায়ের উপরে স্থগিতাদেশ চাওয়া ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না।

Advertisement

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এইচ এল দাত্তূর বেঞ্চে শুক্রবার এই মামলা উঠেছিল। রাজ্যের তরফে আইনজীবী ছিলেন মোহন পরাশরণ ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের আবেদনে বলা হয়েছে, পরিষদীয় সচিবেরা কখনওই মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পরিষদীয় সচিব নিয়োগ ও তাঁদের কাজ ঠিক করে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তাঁদের সরানোর ক্ষমতাও রয়েছে। কাজেই এই আইন ‘অসাংবিধানিক’ নয়। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ অবশ্য হাইকোর্টের রায়ের উপরে এখনই স্থগিতাদেশ দিতে রাজি হয়নি। মামলায় এ দিন দ্রুতই সব পক্ষকে নোটিস জারি করেছে আদালত। তিন সপ্তাহের মধ্যে সবাইকে বক্তব্য জানাতে বলা হয়েছে। চার সপ্তাহ পরে ফের শুনানি হবে।

রাজ্যের আইনজীবী মহলের অবশ্য যুক্তি, বিচারপতিরা কিছু বলারই সুযোগ দেননি। যদিও ঘটনা হল, সারদায় সিবিআই তদন্ত, পঞ্চায়েত বা পুর নির্বাচন সংক্রান্ত মামলায় এর আগে রাজ্যের যে তৎপরতা চোখে পড়েছিল, এ দিন স্থগিতাদেশ আদায়ের ক্ষেত্রে তা দেখানোর সুযোগ পাননি আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য জানার পরে নবান্নেরও হেলদোল দেখা যায়নি। তৃণমূল নেতৃত্বও এই নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাতে নারাজ।

বিরোধী শিবির তো বটেই, শাসক দলেরও একাংশের মতে, সরকারে আসার পরে যাঁদের মন্ত্রী করা যায়নি, তাঁদের ক্ষোভ চাপতে ‘ইনাম’ হিসাবেই পরিষদীয় সচিব পদ তৈরি করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। শুরু থেকেই পরিষদীয় সচিব পদের প্রয়োজন নিয়ে নানা স্তরে বিতর্ক ছিল। হাইকোর্ট আইনটি বাতিল করে দেওয়ায় তৃণমূল তথা রাজ্য সরকার সেই বিতর্কের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে। তবু দলীয় বিধায়কদের পাশে থাকার বার্তা দিতে সরকার সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল। যাতে দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের দেখানো যায়, রাজ্য সরকার তাঁদের জন্য আইনি লড়াই চালিয়েছে। কিন্তু পরিষদীয় সচিব পদ শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে না পারলে তার ‘দায়’ আদালতের উপরেই চাপিয়ে দেওয়া যাবে! তার ফলে সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার পরিণতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্য সরকারের বিশেষ হেলদোল নেই বলেই কারও কারও ধারণা।

শাসক দলেরই অন্য একাংশ অবশ্য তা মনে করেন না। তাঁদের মতে, এ দিন না হলেও যত দ্রুত সম্ভব হাইকোর্টের রায়ের উপরে স্থগিতাদেশ পাওয়ার জন্য ঝাঁপানোই দরকার। তা না হলে যাঁরা বিভিন্ন দফতরের পরিষদীয় সচিবের পদে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে। সে ক্ষেত্রে বিধানসভা ভোটের আগে দলে গোষ্ঠী-দ্বন্দ্বেই আরও ইন্ধন পড়বে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement