বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি: পিটিআই।
সুপ্রিম কোর্টে নিজে হাজির হয়ে যখন গোটা দেশের রাজনীতিতে আবার হইচই ফেলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন প্রতিক্রিয়া শুধু রাজ্য বিজেপির তরফ থেকে কেন? প্রশ্নটা উঠেছিল বুধবারই। জবাব মিলল বৃহস্পতিবার। মমতার সুপ্রিম-সওয়াল দেখেও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফ অন্য কেউ কেন সে ভাবে মুখ খোলেননি, সংসদে তা স্পষ্ট হল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মুখ খোলার পরে। ‘অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচানোর জন্য আদালতের উপরে চাপ তৈরি করা হচ্ছে’ বলে রাজ্যসভায় মন্তব্য করলেন মোদী। যে ‘নির্মম সরকার পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছে’, তারা সংসদে এসে ‘উপদেশ’ দেয় কোন মুখে? প্রশ্ন তুললেন প্রধানমন্ত্রী।
বাজেট অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রেক্ষিতে আনা ধন্যবাদ জ্ঞাপক প্রস্তাবের জবাবি ভাষণ দিতে বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় হাজির হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে যে ভাষায় এবং যে ভঙ্গিতে তিনি তৃণমূলকে আক্রমণ করেছেন, সংসদে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের প্রতি ততটা আক্রমণাত্মক হতে মোদীকে এর আগে খুব বেশি দেখা যায়নি। ‘অপশাসন’ এবং ‘অনুপ্রবেশ’— মূলত এই দুই ‘অস্ত্রে’ই তৃণমূলকে বিঁধেছেন তিনি। মোদী বলেন, ‘‘আমাদের তৃণমূলের সতীর্থরা অনেক কথা বললেন। একটু নিজেদের দিকে দেখুন। নীচে নামার যত রকম মাপকাঠি রয়েছে, সেগুলির প্রত্যেকটিতে নির্মম সরকার নতুন নতুন রেকর্ড গড়তে গড়তে এগোচ্ছে। আর এখানে এসে উপদেশ দিচ্ছে!’’
পশ্চিমবঙ্গের চলতি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মোদী বলেন, ‘‘কী হাল করে রেখেছে! এমন নির্মম সরকারের কারণে ওখানকার (পশ্চিমবঙ্গের) মানুষের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ডুবছে। কিন্তু এঁরা পরোয়াই করেন না!’’ মোদীর কথায়, ‘‘ক্ষমতার সুখ ছাড়া কোনও আকাঙ্ক্ষা নেই এঁদের। আর এঁরা এখানে এসে উপদেশ দেন!’’
এর পরেই অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে তোপ দাগেন মোদী। সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন এসআইআর মামলার কথা তিনি সরাসরি উচ্চারণ করেননি। মমতার নামও মুখে আনেনি। কিন্তু কার উদ্দেশে বলছেন, কোন প্রসঙ্গে বলছেন, তা বুঝতে সংসদে হাজির কারওরই অসুবিধা হয়নি। মোদী বলেন, ‘‘পৃথিবীর সমৃদ্ধতম দেশও অবৈধ নাগরিকদের দেশ থেকে বাইরে বার করে দিচ্ছে। আর আমাদের দেশে অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচানোর জন্য আদালতের উপরে চাপ তৈরি করা হচ্ছে! যাঁরা অনুপ্রবেশকারীদের হয়ে জোরদার ওকালতি করছেন, আমাদের দেশের যুব সমাজ কী ভাবে তাঁদের ক্ষমা করবে?’’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘অনুপ্রবেশকারীরা আমাদের যুব সমাজের অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে, রুজিরুটি ছিনিয়ে নিচ্ছে, আদিবাসীদের জমি কেড়ে নিচ্ছে। ছেলেমেয়েদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। কিন্তু ওঁদের কিছু যায়-আসে না। মহিলাদের উপরে অত্যাচার হলে হতে থাক। ক্ষমতা-নীতির বাইরে কিছু করবেই না! আর তাঁরা এখানে এসে আমাদের উপদেশ দিচ্ছেন!’’
বিজেপির তরফে বার বার দাবি করা হচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের উপস্থিতি রয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানাচ্ছে যে, স্বচ্ছ ভোটার তালিকার লক্ষ্যে এসআইআর করা হচ্ছে। কিন্তু তৃণমূল শুরু থেকেই এসআইআর-এর পদ্ধতিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নির্বাচন কমিশনের ‘অভিসন্ধি’ নিয়েও তৃণমূল তথা মমতার তরফ থেকে বার বার সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। সংঘাত তুঙ্গে তুলে মমতা বুধবার নিজেই সুপ্রিম কোর্টে হাজির হন কমিশনের ভূমিকা এবং এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে নিজের বক্তব্য জানাতে। পশ্চিমবঙ্গকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ‘টার্গেট’ করা হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। পরের দিন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সে সব নিয়ে মুখ খুললেন। কারও নাম করলেন না ঠিকই। কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের হয়ে আদালতের উপরে চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলে যে মন্তব্য দেশের প্রধানমন্ত্রী করলেন, তাতে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মমতার সুপ্রিম-সওয়াল দেখে রণে ভঙ্গ দিচ্ছে না বিজেপি। বরং সংঘাতের আবহ আরও বাড়তে চলেছে।
মোদীর আক্রমণের জবাব তৃণমূলের তরফ থেকে সমাজমাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের ‘প্রাপ্য’ দু’লক্ষ কোটি টাকা আটকে রাখার অভিযোগ ফের তোলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বাঙালিদের হেনস্থা এবং গণপ্রহার চলতে দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। বৈধ ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্তের অভিযোগ তোলা হয়েছে। তার ভিত্তিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ‘‘কে আসল নির্মম?’’