শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তাল নয়ডা। ছবি: পিটিআই।
উত্তরপ্রদেশের নয়ডা জ্বলছে। সোমবার সকাল থেকে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যের এই জেলার একটি এলাকা। বিক্ষোভকারী শ্রমিকেরা রাস্তা অবরোধ করেছেন। নিজেদের দাবি নিয়ে সরব হয়েছেন। ফলে নয়ডার সঙ্গে যোগাযোগকারী রাস্তা একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়ে দীর্ঘ যানজটে নাকাল হতে হচ্ছে লোকজনকে। পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। আগুন জ্বলে, ভাঙচুর হয়। পুলিশকে লক্ষ্য করে হয় ইটবৃষ্টিও।
প্রশাসন সূত্রে খবর, এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১০০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অক্ষরধাম থেকে নয়ডায় প্রবেশের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নয়ডার সেক্টর ৬২ থেকে সেক্টর ১৬ যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ। ৯ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ। কিন্তু কেন হঠাৎ করে রণক্ষেত্র হয়ে উঠল নয়ডার ফেজ় ২ এলাকা?
নয়ডার এই এলাকায় প্রচুর কারখানা রয়েছে। তেমনই একটি কারখানার শ্রমিকেরা গত তিন দিন ধরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে কারখানার গেটের সামনে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের দাবি, তাঁরা মাসে ১৫ হাজার টাকারও কম বেতন পান। শুধু তা-ই নয়, দিনে আট ঘণ্টার বদলে ১২ ঘণ্টা ধরে কাজ করানো হয়। অথচ বেতন বাড়াতে বললে, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনও জবাবই মেলে না। বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের মধ্যে লক্ষ্মী নামে এক ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘মালিকপক্ষের কাছে আমাদের দু’টি দাবি রয়েছে। এক, ওভারটাইম করলে যেন তার উপযুক্ত টাকা দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, আমাদের মাসিক বেতন ২০ হাজার টাকা করতে হবে।’’ তাঁর কথায়, ‘‘কারখানায় কর্মীদের শোষণ করা হয়। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না। মহিলাদের জন্য কোনও নিরাপত্তা নেই।’’
আরও এক বিক্ষোভকারী শ্রমিকের দাবি, ‘‘কারখানার প্রত্যেক কর্মীকে দিনে ৮০০ টাকা করে দেওয়া উচিত। বর্তমানে আমরা দিনে ৩০০-৪০০ টাকা পাই।’’ একই সুর শোনা যায় বেশির ভাগ কর্মীর কণ্ঠে। এক মহিলা কর্মী জানিয়েছেন, দিন দিন যে হারে সংসারের খরচ বাড়ছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ বাড়ছে, তা নিয়ে কথা বললে, বেতন বাড়ানোর কথা মালিকপক্ষকে জানাতে গেলে তাঁরাও মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকছেন। বেতন বাড়ানোর কোনও সদিচ্ছাই দেখা যায় না তাঁদের মধ্যে। তাঁর কথায়, ‘‘১৩ হাজার টাকায় কী ভাবে মাস চালাব, বলতে পারেন?’’ রাজেশ নামে আরও এক প্রতিবাদী কর্মী বলেন, ‘‘মাসে আমাদের ২০ হাজার টাকা বেতন দিতে হবে। টাকা না বাড়ালে সংসার টানতে পারছি না।’’
প্রসঙ্গত, মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে কর্মীদের এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল হরিয়ানার এক কারখানায়। ঠিক একই রকম দাবিতে তাঁরা মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। কারখানায় ভাঙচুর, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেই ঘটনা রাজ্য সরকারকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। হরিয়ানা সরকার সম্প্রতি ঘোষণা করে অদক্ষ, আধা-দক্ষ, দক্ষ এবং অত্যন্ত দক্ষ শ্রমিকদের জন্য ৩৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। সেই বেতন বৃদ্ধির ফলে হরিয়ানায় অদক্ষ কর্মীরা এখন মাসে ১৫,২২০ টাকা এবং আধা-দক্ষ কর্মীরা মাসে ১৬,৭৮০ টাকা পান। আর বেতনবৃদ্ধির সেই আঁচ নয়ডার শিল্পাঞ্চলে এসে পৌঁছোয়। কর্মীরা প্রশ্ন তোলেন, পড়শি রাজ্যে যদি শ্রমিকদের বেতন বাড়তে পারে, তা হলে তাঁদের কেন বেশি কাজ করিয়ে কম বেতন দেওয়া হচ্ছে? অনেকে আবার এই অভিযোগও তুলেছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকারের বেঁধে দেওয়া ন্যূনতম বেতনও অনেক সংস্থা দিচ্ছে না। হরিয়ানার স্ফুলিঙ্গ নয়ডায় পৌঁছোতেই তা আগুনের রূপ নেয়। দীর্ঘ দিনের দাবিতে সরব শ্রমিকেরা সোমবার বড় আন্দোলনের পথে নামেন। রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় নয়ডার ফেজ় ২ এলাকা। রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। বেশ কয়েকটি গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ জানান, প্রত্যেক শ্রমিকের উপযুক্ত বেতন পাওয়া উচিত। কাজের সুস্থ পরিবেশ এবং প্রাথমিক সুবিধাগুলি থাকা উচিত কারখানাগুলিতে। শিল্পাঞ্চলকে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন, শ্রম আইন যেন ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়। কর্মীদের অভাব, অভিযোগ ঠিকমতো শোনা হয়। রাজ্যের শ্রম দফতরকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসন এবং কারখানা কর্তৃপক্ষগুলির সঙ্গে আলোচনায় বসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি এটাও বলেন, ‘‘যাঁরা শ্রমিক আন্দোলন এবং প্রতিবাদের নামে অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করবেন, তাঁদের চিহ্নিত করে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ দাবি করেছেন, রাজ্যের উন্নয়নকে থমকে দিতে এ ধরনের অশান্তির বাতাবরণ সৃষ্টির চক্রান্ত করা হচ্ছে। সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যাঁরা এই হিংসা ছড়ানোয় উস্কানি দেবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে। বিভ্রান্তিমূলক খবর ছড়ানোর জন্য দুই সমাজমাধ্যম প্রভাবীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে রাজ্য পুলিশ। তাদের সতর্ক করা হয়েছে, যাঁরা শ্রমিকদের বিক্ষোভের ঘটনা নিয়ে গুজব ছড়াবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রসঙ্গত, এই ঘটনায় পুলিশ গুলি চালিয়েছে বলে খবর ছড়াতে শুরু করে সমাজমাধ্যমে। তার পরই পুলিশ দাবি করেছে, গুলি চালানোর কোনও ঘটনা ঘটেনি।