শতরান করে শুভমনের উচ্ছ্বাস। ছবি: পিটিআই।
আইপিএলে সবচেয়ে দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেছিল সে। দলের বিপদের দিনে একাই লড়াই করেছিল। দিনের শেষে দাম পেল না বৈভব সূর্যবংশীর ৯৬ রানের ইনিংস। বোলারদের ব্যর্থতায় দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে গুজরাতের কাছে চূর্ণ হল রাজস্থান। শতরান করে ম্যাচ বার করে দিলেন গুজরাতের অধিনায়ক শুভমন গিল। রাজস্থানের তোলা ২১৪/৬ রান ৭ উইকেট বাকি থাকতেই তুলে নিল গুজরাত। রবিবার অহমদাবাদে ফাইনালে বেঙ্গালুরুর মুখোমুখি গুজরাত। নিজেদের ঘরের মাঠেই ফাইনাল খেলতে নামবে তারা। এই নিয়ে তৃতীয় বার ফাইনালে উঠল গুজরাত।
ম্যাচ রেফারির ভুলে দ্বিতীয় বার টস হওয়ায় রেগে গিয়েছিলেন শুভমন। প্রথমে ব্যাট করার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল। তবে দিনের শেষে শুভমনের আর ক্ষোভ থাকার কথা নয়। মনে করা হয়েছিল দ্বিতীয় ইনিংসে পিচ মন্থর হবে। কিন্তু আদতে হল ব্যাটারদের স্বর্গ। সেই পিচে দাপট দেখিয়ে গেলেন শুভমন এবং সাই সুদর্শন। রাজস্থানের বোলারেরা বিন্দুমাত্র ম্যাচে ফেরার সুযোগ পেলেন না।
২১৫ রান তাড়া করতে নেমে গুজরাত নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট করে দিয়েছিল প্রথম ওভারেই। জফ্রা আর্চার চারটি চার হজম করেন। নান্দ্রে বার্গার, ব্রিজেশ শর্মারাও রেহাই পাননি। পাওয়ার প্লে-তেই ৬৯ রান তোলে গুজরাত। এর পর যত সময় এগিয়েছে ততই বেড়েছে গুজরাতের দাপট। ম্যাচকে কার্যত একপেশে করে তোলে তারা। নবম ওভারে শতরানের জুটি হয়ে যায়। এই নিয়ে ১১ বার শতরানের জুটি হল শুভমন-সুদর্শনের। পুরুষদের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি বার।
রাজস্থান ভেবেছিল স্পিনারদের এনে রানের গতি থামাবে। ফল হয় উল্টো। রবীন্দ্র জাডেজা, যশ রাজ পুঞ্জাও প্রচুর রান হজম করেন। এক সময় মনে হচ্ছিল বিনা উইকেটেই রান তুলে দেবে গুজরাত। হল না সুদর্শনের ভুলে। আগের ম্যাচের মতো এ বারও হিট উইকেট হলেন তিনি। চার মেরেও লাভ হল না। ব্রিজেশের বল অফসাইডে খেলেন। সেটি চার হয়ে যায়। তার আগেই সুদর্শনের হাত থেকে ব্যাট ছিটকে স্টাম্প ভেঙে দেয়, ঠিক আগের ম্যাচের মতোই। অবাক হয়ে দু’হাত দিয়ে মাথা ঢাকেন সুদর্শন। উল্টো দিকে থাকা শুভমনও হতাশ হয়ে হাঁটু মুড়ে ক্রিজ়ে বসে পড়েন। ধারাভাষ্যকার রবি শাস্ত্রী বলে ওঠেন, “আঠা কোথায় আছে? নিয়ে এসো এখনই।” মাথা নাড়তে নাড়তে ফেরেন সুদর্শন। ৩২ বলে ৫৮ করেন তিনি।
পরের ওভারেই জাডেজাকে চার মেরে শতরান পূরণ করেন শুভমন। নিজস্ব কায়দায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি। ১৫তম ওভারে গুজরাতের অধিনায়ককে সাজঘরে ফিরতে হয়। আর্চারের বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি। ৫৩ বলে ১০৪ রানের ইনিংসে রয়েছে ১৫টি চার এবং ৩টি ছয়। পরে ওয়াশিংটন সুন্দরও (১৬) ফিরে যান। দলকে জিতিয়ে দেন জস বাটলার (অপরাজিত ৯) এবং রাহুল তেওতিয়া (অপরাজিত ১৭)।
তার আগে, আইপিএলে সবচেয়ে পরিণত ইনিংস খেলতে দেখা যায় বৈভবকে। দলের বিপদের দিনে একাই লড়াই করে ১৫ বছরের ক্রিকেটার। প্রশংসা আদায় করে নেয় সকলের। তবে আরও একটা শতরান হাতছাড়া করে। এলিমিনেটরে ৯৭ রান করার পর দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে গুজরাতের বিরুদ্ধে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৯৬ রান।
ম্যাচের শুরুটা মোটেই ভাল হয়নি রাজস্থানের। চতুর্থ বলেই ফিরে যান যশস্বী জয়সওয়াল (১)। দ্বিতীয় ওভারে ফেরেন ধ্রুব জুরেল (৭)। বিপদ দেখে চারে নামিয়ে দেওয়া হয় জাডেজাকে। পর পর দু’টি উইকেট পড়ে যাওয়ায় চাপ বাড়ে বৈভবের উপরেও। সাধারণত সে শুরু থেকেই চালিয়ে খেলতে পছন্দ করে। এ দিন সেটা দেখা যায়নি। দলের বিপদের সময় বল বুঝে খেলার দিকে নজর দিয়েছিল সে।
রাজস্থানের চাপ আরও বাড়ে অষ্টম ওভারে চোট পেয়ে জাডেজা উঠে যাওয়ায়। মাঠে চিকিৎসককে ডেকে কিছু ক্ষণ শুশ্রূষা নেন জাডেজা। কিন্তু খেলা চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না তিনি। আহত অবসৃত হয়ে উঠে যান।
জাডেজা উঠে যেতে আবার ব্যাটিং বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় রাজস্থান। রিয়ান পরাগ (১১), দাসুন শনাকা (৩) এবং জফ্রা আর্চার (৭) পর পর ফিরে যান। ১৩তম ওভারে আবার খেলতে নামেন জাডেজা। তবে প্রথম পর্বে যেমন আগ্রাসী খেলছিলেন তিনি, সেই ছন্দ খুঁজে পাওয়া যায়নি দ্বিতীয় পর্বে।
আগ্রাসী শট খেলার দায়িত্ব নেয় বৈভব। প্রথম থেকে একটু ধরে খেললেও ধীরে ধীরে আগ্রাসন বাড়াতে থাকে সে। এ দিন সে ৩১ বলে অর্ধশতরান করেছে। যে ক্রিকেটার আগের ম্যাচে ২৯ বলে ৯৭ রানের ইনিংস খেলেছিল, এ দিন তারই অর্ধশতরান করতে লেগেছে এতগুলি বল। বোঝাই গিয়েছে বৈভবকে কতটা মন্থর গতিতে খেলতে হয়েছে দলের কথা ভেবে। আইপিএলে এটি তার মন্থরতম অর্ধশতরান। গত বছর চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে ২৭ বলে অর্ধশতরানটিই ছিল মন্থরতম। বৈভবের অর্ধশতরান আসে ১৩তম ওভারে। এর মাঝে জীবনও পেয়েছে সে। ১১তম ওভারে প্রসিদ্ধ কৃষ্ণের বলে বৈভবের ক্যাচ ছাড়েন সাই সুদর্শন।
৫০ পেরোনোর পর বৈভবকে আগ্রাসী খেলতে দেখা গিয়েছে। কারণ রাজস্থানের রান রেট ক্রমশই কমছিল। এই সময়ে বৈভবকে যে সব শট খেলতে দেখা গিয়েছে তা তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতোই। মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে শট খেলেছে সে। গুজরাতের কোনও বোলারকেই রেয়াত করেনি।
এক সময় মনে হচ্ছিল এই ম্যাচে তাঁর শতরান হয়ে যাবে। কিন্তু কাগিসো রাবাডার একটি শর্ট বল তুলে খেলতে গিয়ে থার্ডম্যানে থাকা প্রসিদ্ধ কৃষ্ণের হাতে ক্যাচ দেয় বৈভব। গোটা মাঠ উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় ১৫ বছরের ব্যাটারকে। জাডেজার সঙ্গে তাঁর ১২৭ রানের জুটি লড়াকু স্কোরে পৌঁছে দেয় রাজস্থানকে। রাজস্থানের রান ২০০ পেরোত না, যদি ডোনোভান ফেরেরা থাকতেন। শেষ ওভারে রশিদ খানকে চারটি ছয় মেরে রাজস্থানের রান ২০০ পার করে দেন জাডেজা। যদিও তাতে কোনও লাভ হল না।