গোমাংস বিতর্কের রেশ ধরে অসহিষ্ণুতার পারদ ক্রমেই চড়ছে দেশ জুড়ে। বিহার ভোটে জিততে মরিয়া অমিত শাহ বাহিনী মেরুকরণের স্বার্থে কোনও মন্ত্রোচ্চারণই বাদ রাখছে না। এই আবহে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বাধা পেতে পারে বলে আন্তর্জাতিক স্তর থেকে সতর্কবার্তা এসেছিল গত কালই। আজ তা নিয়ে মুখ খুলেছে দেশের ব্যাঙ্কিং ও শিল্পমহলও। তার মধ্যে ঐক্যের সুর শোনা গেল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখে। তবে মোদীর এই বার্তা নেহাতই ভাঁওতা বলে মনে করছেন বিরোধীরা।
অসহিষ্ণুতা নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরেই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন শিল্পী-সাহিত্যিকেরা। গত কাল সর্তকবার্তা আসে অন্য শিবির থেকে। এই ধরনের পরিবেশ বিনিয়োগ ও উন্নয়নের পথে বাধা হতে পারে বলে জানিয়ে দেয় আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা মুডিজ। আর্থিক পরিস্থিতির ওই বিশ্লেষক সংস্থার পক্ষে সাফ জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী যদি দলের নেতাদের নিয়ন্ত্রণ না করেন তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে মোদী সরকার। হোঁচট খাবে সরকারের আর্থিক সংস্কারের কর্মসূচি।
এই সতর্কবার্তার জের কাটতে না কাটতেই মুখ খুলেছে দেশের ব্যাঙ্কিং ও শিল্পমহল। দিল্লি আইআইটির এক অনুষ্ঠানে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর রঘুরাম রাজন বলেন, ‘‘নিষেধাজ্ঞা জারি করে কিছু হয় না। উল্টে তা আলোচনা ও বিতর্কের পরিবেশকে নষ্ট করে দেয়। মানুষ তখন মত প্রকাশে ভয় পায়।’’ রাজনের কথায়, ‘‘এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হোক যেখানে মানুষ একে অপরের মতামতকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে সহিষ্ণুতার পরিচয় দেবেন।’’
নাগরিকদের প্রশ্ন করার অধিকারের পক্ষে জোর সওয়াল করে রাজন বলেছেন, ‘‘ভারতকে যদি দ্রুত এগিয়ে যেতে হয় তা হলে নাগরিকদের প্রশ্ন করার অধিকার দিতে হবে।’’ ইনফোসিস-এর প্রতিষ্ঠাতা এন আর নারায়ণমূর্তিও মনে করেন, এখন দেশে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় ও অস্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দূর না হলে দেশ প্রগতির পথে হাঁটতে পারবে না। আজ বহুত্ববাদের পক্ষে ফের সওয়াল করেছেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ও।
বিভিন্ন শিবিরের চাপের মধ্যেই আজ ঐক্যের বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। সর্দার বল্লভভাই পটেলের জন্মদিনে জাতীয় একতা দৌড়ের সবুজ পতাকা দেখিয়ে মোদী বলেন, ‘‘উন্নয়নের পথে এগিয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছনোর প্রথম শর্ত হল গোটা দেশে ঐক্য, শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষা।’’
প্রত্যাশিত ভাবেই প্রধানমন্ত্রীকে বিঁধেছে কংগ্রেস। বিজেপি-সঙ্ঘের উদ্দেশে তোপ দেগে সনিয়া গাঁধী বলেন, ‘‘দেশে অসহিষ্ণুতার পরিবেশ বিক্ষিপ্ত ভাবে তৈরি হচ্ছে না। বিভাজনের বিষ ছড়ানো হচ্ছে ষড়যন্ত্র মাফিক। ইন্দিরা গাঁধী বেঁচে থাকলে বলতেন, এই পরিস্থিতি রুখে দিতে লড়াইয়ে নেমে পড়া উচিত সকলের।’’
বিরোধীদের দাবি, বিহার ভোটের শেষ পর্বে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় মেরুকরণের রাজনীতিই করছে বিজেপি। তাই দিল্লিতে মোদীর বার্তা ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। এক বিরোধী নেতার কটাক্ষ, ‘‘মোদীর মুডটা আসলে মুডি’জ বুঝতে পারছে না।’’ তাঁর মতে, একে তো বিনিয়োগ আসছে না। অর্থনীতির চাকা ঘুরছে না। ডাল-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া। এই অবস্থায় ইচ্ছাকৃত ভাবেই গোমাংস বিতর্ক জিইয়ে রেখে প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে ঢাকতে চাইছে বিজেপি। কারণ, বাস্তবে উন্নয়ন করতে পারলে এ সব কড়া হাতে দমন করে মোদী বিকাশের কর্মসূচি নিয়ে ঢাক পেটাতেন। উন্নয়ন হচ্ছে না বলেই মেরুকরণের রাজনীতি চলছে। তাতে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়া যাবে বলে মনে করছে মোদী সরকার। আবার বিহার ভোটে সুবিধে পাওয়ারও স্বপ্ন দেখছে বিজেপি।