অমিত শাহ
শুধু দেশ নয়, ক্ষোভের আওয়াজ এসেছে বিদেশের মাটি থেকেও। মৌলবাদীদের হাতে বিশিষ্ট লেখকদের হত্যা, দাদরির হত্যাকাণ্ড নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন চল্লিশজনেরও বেশি সাহিত্যিক। এত ঝড়ের পরে অবশেষে কিছুটা নড়েচড়ে বসলো বিজেপি। দাদরির ঘটনার পরে দলের যে নেতারা গো হত্যা বন্ধ নিয়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক মন্তব্য করছিলেন, তাদের থামাতে রবিবার বৈঠকে বসলেন দলের সভাপতি অমিত শাহ। গোটা বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্ষুব্ধ— বিহার ভোটের আগে দলের তরফে এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। যদিও বিরোধীদের মতে পুরো ব্যাপারটাই লোক দেখানো।
বিজেপি সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত নেতা মন্ত্রীদের ডেকে আজ সতর্ক করেছেন অমিত শাহ। কেননা, এই সব প্ররোচনামূলক মন্তব্য নিয়ে নাকি বেজায় চটে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি মনে করছেন, উন্নয়ন ও বিকাশের বিষয়ে তাঁর সরকার যে রাজনৈতিক বিতর্ক গড়ে তুলতে চাইছে, কিছু নেতার বিক্ষিপ্ত মন্তব্যে তা ভেস্তে যাচ্ছে। তা ছাড়া, দাদরির ঘটনার জেরে লেখক ও লেখিকারা পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ায় সরকার সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে।
যে নেতা-মন্ত্রীদের অমিত শাহ আজ ডেকে পাঠিয়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টার, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মহেশ শর্মা ও সঞ্জীব বলিয়ান, বিধায়ক সঙ্গীত সোম বা সাংসদ সাক্ষী মহারাজ। এঁদের মধ্যে সঞ্জীব বলিয়ান ও সঙ্গীত সোম লোকসভা ভোটের আগে মজফ্ফরপুরের গোষ্ঠী সংঘর্ষের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত। সাক্ষী মহারাজের অতীত রিপোর্ট কার্ডও বেশ ‘উজ্জ্বল’। গত কাল তিনি বলেন, ‘‘যারা গো হত্যা করবে, তাদের মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত।’’ যদিও সাক্ষী মহারাজ এই মন্তব্যটি আরএসএসের মুখপাত্র পাঞ্চজন্য থেকে ‘ধার’ নিয়েছেন বলে কটাক্ষ করেছেন বিরোধীরা। কারণ, সঙ্ঘ পরিবারের এই মুখপত্রে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লেখা হয়েছে, বেদে গো হত্যাকারীদের মেরে ফেলারই নির্দেশ দেওয়া রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে গো হত্যাকারীদের ‘পাপী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মন্তব্য করা হয়েছে, ‘‘বেদের আদেশ, যারা গো হত্যা করবে তাদের প্রাণ নিয়ে নাও।’’
সঙ্ঘের মুখপত্রের মন্তব্যকেই আজ অস্ত্র করেছেন বিরোধীরা। কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিংহ বলেন, ‘‘পাঞ্চজন্যের প্রবন্ধের জন্য অমিত শাহ কি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতকেও ডেকে পাঠিয়েছিলেন?’’ কংগ্রেস নেতাদের মতে, বিজেপি সভাপতির ডাকা বৈঠক লোক দেখানো মাত্র। সাক্ষী মহারাজ বা সঙ্গীত সোম কাউকেই অমিত শাহ সতর্ক করেননি। কারণ, বৈঠকের পর বিজেপির তরফে যেমন প্রকাশ্যে কোনও বার্তা দেওয়া হয়নি, তেমনই পাঞ্চজন্য-র প্রবন্ধ নিয়েও প্রকাশ্যে কোনও কথা বলা হয়নি। দিগ্বিজয়ের কটাক্ষ, দাদরির ঘটনার পর অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নীরব কেন? কিন্তু সঞ্জীব বলিয়ান, মহেশ শর্মাদের মন্ত্রিসভায় রেখে মোদী প্রতিনিয়ত বোঝাচ্ছেন বিভাজনের রাজনীতিই তাঁদের মত ও পথ।
দাদরির পরে প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা নিয়ে সমালোচনার মধ্যে প্রথম উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। ভারতে বহুত্ববাদকে সযত্নে ধরে রাখতে সমাজে সহিষ্ণুতার পরিবেশ বজায় রাখার কথা বলেছিলেন তিনি। পরে বিহারে নির্বাচনী জনসভায় মোদী বলেন, রাজনৈতিক কারণে ক্ষুদ্র সুবিধার জন্য কেউ যদি কোনও মন্তব্য করেন, তা শোনার দরকার নেই। নরেন্দ্র মোদীও যদি তেমন কথা বলেন, তা হলেও শোনার প্রয়োজন নেই। বরং রাষ্ট্রপতি যে পথ দেখিয়েছেন, সে কথাই শুনুন। বরং দাদরি প্রসঙ্গে পরে আনন্দবাজার-কে তিনি বলেছিলেন, ওই ঘটনাকে সামনে রেখে মেরুকরণের রাজনীতি করছেন বিরোধীরা!
সব মিলিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ, অমিত শাহ-র ডাকা বৈঠকে বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। স্বাভাবিক ভাবে এটা কংগ্রেসের রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে উঠছে। পি চিদম্বরম বলেন, ‘‘দাদরির ঘটনায় লেখক লেখিকারা যে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন তা সরকারের শোনা উচিত।’’ এ দিকে, সংবাদ সংস্থা জানাচ্ছে, যে লেখক-লেখিকারা অকাদেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অন্তত ১৫০টি দেশের সাহিত্যিকরা। এম এম কালবার্গির হত্যার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখেছেন তাঁরা।