ফেসবুক-এ বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের শ্যামল সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল মাহি দেবের। শিলচরের শপিং মলে কাজ করেন মাহি। বাড়ি কাছাড় জেলার বারিকঅফিস এলাকায়। তার পরামর্শে চোরাপথে সীমান্ত পেরিয়ে শিলচর পৌঁছয় শ্যামল। নতুন নাম নেয় শান্ত রায়। কাজ নেয় রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে হিসেবে। শিলচরেই দু’জনে বিয়ে করে। ঘর ভাড়া নেয় শিলচর মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি।
দেড় বছর ধরে ভালই চলছিল সংসার। তার মধ্যে প্রস্তাব আসে— প্রেমের প্রলোভনে ফেলে এক যুবককে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। মাহি সফল ভাবে কাজটি করতে পারলে ৬ হাজার টাকা মিলবে। দোটানায় পড়ে যায় স্বামী-স্ত্রী। দু’মাস ধরে ঘরভাড়া বাকি। ৬ হাজার টাকায় তা মিটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু পুলিশের হাতে ধরা পড়লে! অনেক যদি-কিন্তু করে রাজি হয়ে যায় তারা।
মোবাইল নম্বর নিয়ে এসেছিল শামিম আহমদ চৌধুরী। যার সঙ্গে প্রেমের নাটক করতে হবে, তিনি শামিমের মামাতো ভাই, ২০ বছরের সোহেল লস্কর। সোনাই কলেজের ছাত্র। বাবা শিলচর মেডিক্যাল কলেজের কর্মী, মা স্কুলশিক্ষিকা। ছক অনুযায়ী মোবাইলে কথাবার্তা শুরু হয়। তার পর দেখা। কয়েক দিন আগে সোহেলের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে মাহি। ঠিক হয়, ১০ জানুয়ারি উধারবন্দ এলাকায় যাবেন তারা। পথে অপেক্ষা করছিল চুক্তির অপরপক্ষ, অপহরণকারীর দল। ডলুতে তাদের হাতে নতুন প্রেমিককে তুলে দেয় মাহি। তার কাজ ফুরিয়ে যায়।
এ দিকে, ছেলে বাড়ি না ফেরায় দু’দিন পর বাবা থানায় এজাহার দেন। পুলিশ অভিযানে নামে। ১৪ জানুয়ারি পুলিশ খবর পায়, সোহেল মুক্তি পেয়েছে। কয়েক দিনে কয়েকটি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই ভাবে পুলিশ পরে মুক্তির খবর পায়। রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ সুপার রজবীর সিংহ দায়িত্ব দেন নতুন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অভিজিৎ গৌরবকে।
অভিজিৎবাবু আজ জানিয়েছেন, তদন্তে নেমে তাঁরা প্রথমে মাহি দেব ও শ্যামল সরকার ওরফে শান্ত রায়ের সন্ধান পান। তাদের গ্রেফতার করে জানতে পারে অপহরণকারী চক্রের মাথা ৩১ বছরের বাপন মজুমদার। সোনাবাড়িঘাটের সইদপুরে তার বাড়ি। সহ-নেতা উত্তর কৃষ্ণপুরের আক্তার হোসেন লস্কর। দু’জনকে তুলে আনা হয়। তাদের জেরা করে একে একে গ্রেফতার করা হয় বাঁশকান্দি হাতিরহাড়ের ইমরান হোসেন রাজবড়ভুঁইঞা, সোনাইয়ের নুরুল মহম্মদ, গুমড়া পাইকানের আব্দুল রহমান তাপাদার এবং রেহিমউদ্দিন ওরফে মইনুল হক বড়ভুইয়া ওরফে লেম-কে। আটক হয় অপহৃতের পিসতুতো ভাই শামিম আহমদ চৌধুরীও। মাহি-সহ ৯ জন পুলিশের জালে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে দু’টি সুমো গাড়ি, দু’টি মোটরসাইকেল, ২০টি মোবাইল সেট, কয়েকটি সেনাপোশাক। লক্ষাধিক টাকাও মিলেছে তাদের কাছ থেকে। পাওয়া গিয়েছে তিনটি খেলনা বন্দুক, দু’টি ছুরি। পুলিশ সুপার রজবীর সিংহ জানান, তাদের দলে ১৫ জন সদস্য রয়েছে। তিন জন নগাঁওয়ের বাসিন্দা। এরা বিশেষ মুহূর্তে হাজির হয়ে অভিযানে অংশ নেয়। পরে ফিরে যায়। তাদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ সুপার জানিয়েছেন।
প্রেমে সফল হলেও শ্যামল-মাহি প্রেমের নাটকে ব্যর্থ হয়ে যায়। প্রথম কাজেই পুলিশের জালে আটকে পড়ে। সোহেল অপহরণ তাদের প্রথম ঘটনা হলেও বাপ্পন-শামিমদের কাছে এ মোটেও নতুন ব্যাপার নয়। তারা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, এর আগে আরও চারটি অপহরণ করেছে। ডাক বিভাগের কর্মী সাকিব মহম্মদ, এনআইটি-র ইব্রাহিম আলি, সোনাবাড়িঘাটের দিলওয়ার হোসেন এবং গুমড়ার স্করপিওচালক রুবেল তাদের শিকার হয়েছেন। সবাইকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে মুক্তি পেতে হয়েছে। সোহেলের পরিবারের কাছ থেকেও মুক্তিপণ আদায় করেছে বাপ্পন-বাহিনী। টাকার সঙ্গে শর্ত ছিল, কাউকে কোনও কথা বলা যাবে না। প্রাণে মারার হুমকিও দেওয়া হয় তাঁদের।
কী করে শান্তু-মাহির সন্ধান পেল বাপ্পনরা— এ নিয়ে আজও দু’পক্ষ দু’রকম কথা বলছে। শান্তু-মাহি জানায়, মেডিক্যাল কলেজের নির্মাণকাজে গিয়ে ঠিকাদার হিসেবেই পরিচয় হয়েছিল বাপ্পন মজুমদারের সঙ্গে। সেখান থেকে কথাবার্তা, ঘনিষ্টতা। এক দিন অপহরণে সহায়তার প্রস্তাব দেয়। জড়িয়ে পড়ে স্বামী-স্ত্রী। বাপ্পনের বক্তব্য, আগের চারটি ঘটনায় প্রেমের প্রলোভন দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। এ বার সোহেলের জন্য নতুন ছক কষে তারই পিসতুতো ভাই শামিম। কিন্তু প্রেমের ফাঁদের জন্য তো মেয়ে চাই। তখনই তারা মাহিকে খুঁজে বের করেন। মেয়েটিকে ‘কলগার্ল’ হিসেবেই জানে এরা। তার স্বামীর নাম শান্তু বা শ্যামল যাই বলুক না কেন, বাপ্পন জানায়, আগে তার সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল না। তার প্রকৃত নাম কী, বাংলাদেশের কোথায় বাড়ি, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করে অপহরণকারী দলের নেতা বাপ্পন মজুমদার।
পুলিশ সুপার রজবীর সিংহের কথায়, ‘‘তদন্তের এখনও অনেকটা বাকি। অন্যান্য অপহরণকারীদলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’