ইংরেজ আমলে হাইলাকান্দির চা বাগানে এ রকম নাটমন্দিরেই বসত যাত্রাগানের আসর। ছবি: অমিত দাস
বোনাস হাতে পেতেই দুর্গাপুজোর গন্ধ ছড়িয়েছে হাইলাকান্দির চা বাগানে।
বাগানের দুর্গোৎসবের সঙ্গে উপত্যকাবাসীর সম্পর্ক গভীর। হাইলাকান্দির চা বাগানে দুর্গাপুজোর ইতিহাস দেড়শো বছরের পুরনো। সময়ের স্রোতে সেখানে শারদোৎসবের আঢ়ম্বর অবশ্য অনেকটাই মলিন। ইংরেজ আমলের স্মৃতিবিজড়িত কয়েকটি চা বাগানের অস্তিত্বই এখন নেই। তবে জায়গার নামটা এখনও রয়ে গিয়েছে।
এমমই একটি জায়গা ঝানলাছড়া। এক সময় সেখানে রমরমিয়ে চলত চা বাগানের কাজকর্ম। এখন অবাধে ঘোরে উদলা জঙ্গিরা। ইংরেজ আমলে ঝানলাছড়ায় ছিল চা বাগান। জেলার চা বাগানগুলির মধ্যে প্রথম দিকে সেখানেই দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল। ঝানলাছড়া বাগানের তৎকালীন কর্তা ছিলেন জন মার্শাল উইনচেস্টার। ইতিহাস বলে— তাঁর উদ্যোগে ঝানলাছড়া, আমতলা, লতাকান্দি চা বাগানে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল। সে সব চা বাগান এখন নেই।
জেলার প্রবীণ নাগরিকদের কাছে জানা যায়, ১৮৫৬ সাল নাগাদ সুরমা উপত্যকায় চা বাগানের পত্তন হয়েছিল। ১৮৬০ সালে ঝানলাছড়া, আয়নাখাল, মনাছড়া, সরসপুর, আমতলা, লতাকান্দিতে চা বাগান গড়তে শুরু করে ইংরেজরা। তৎকালীন বাংলা, বিহার, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, থেকে নিয়ে আসা হয় চা শ্রমিকদের। তেলি, মুড়া, সাঁওতাল, তাঁতি, মুন্ডা, বিন সম্প্রদায়ের মানুষ চা বাগানে কাজ করতে এসেছিলেন। তার জেরে ভিন্রাজ্যের সংস্কৃতির আঁচ ক্রমে ছড়ায় চা বাগানগুলির বসতিতে। টুসু, করম পুজো তো বটেই, শুরু হয় দুর্গাপুজোও। হাইলাকান্দির চা বাগানে দুর্গাপুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইংল্যান্ডের জার্ডিন হেন্ডারসন কোম্পানির নাম। সেই সময় হাইলাকান্দির রামচণ্ডী, আয়নাখাল, মনাছড়া, শিরিষপুরের মতো চা বাগানের মালিক ছিল জার্ডিন হেন্ডারসন কোম্পানি। ইংরেজরা চা বাগান পরিচালনায় কারও হস্তক্ষেপ পছন্দ না করলেওস দুর্গাপুজো সময় তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকত। অনেক চা বাগানেই খ্রিষ্টধর্মী ইংরেজ ম্যানেজার পুজোয় সামিল হতেন।
বর্তমানে পুজোর রীতিনীতি অনেক বদলেছে। চলছে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সংঘাত। আগে চা বাগানে দুর্গাপুজোর ধুমধাম শুরু হতো রথযাত্রা থেকেই। পুজোর সময় যাত্রাগান, রামলীলার আসর বসত। এখন সে সবের দেখাই কার্যত মেলে না বেশিরভাগ বাগানের পুজোতেই। কবি আশুতোষ দাস ছোট বয়সের স্মৃতি থেকে বলেন, ‘‘আগে চা বাগানের পুজোয় একটা প্রাণ ছিল। এখন সব কিছু কেমন ধূসর হয়ে গিয়েছে।’’ আয়নাখাল চা বাগানের ম্যানেজার সুমন্ত চৌধুরীর মন্তব্য, ‘‘আগে চা বাগানের দুর্গাপুজোয় যাত্রাগান, রামলীলার আসর ঘিরে আনন্দের জোয়ার উঠত। তবে পুরনো অনেক কিছু হারালেও, চা বাগানের পুজোয় এখনও কিছুটা হলেও প্রাণের টান রয়েছে।’’ হাইলাকান্দিতে সব চেয়ে বেশি চা বাগান রয়েছে কাটলিছড়ায়। সিঙ্গালা চা বাগানের শ্রমিক নেতা শিবনারায়ণ রবিদাস বলেন, ‘‘সারা বছর হাড়ভাঙা খাটুনির পর খুশির হাওয়া নিয়ে আসে দুর্গাপুজো।’’ বিভিন্ন কারণে এখন বরাক উপত্যকায় চা বাগানের লোকজন সুখে নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সমান হারে মজুরির দাবিতে আন্দোলন চলছে বরাকের বাগানগুলিতে। বিদেশের চা ভারতের বাজারে ছড়ানোয় অসমের চায়ের কদর এবং দাম সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এ সবে মন্দার আবহাওয়া ছড়িয়েছে।
পুজোর আনন্দের মধ্যেও সেই চিন্তার মেঘ কাটছে না চা বাগানগুলির অন্দরমহলে।