বাংলার মাটি তাঁর পরের নিশানা! বিহারে ভাগ্য খুলবে কি না, স্পষ্ট নয়। তার মধ্যেই আজ বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ঘোষণা করে দিলেন, আগামী বছর বিধানসভা ভোটে জিতে বিজেপিই সরকার গড়বে পশ্চিমবঙ্গে। একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিলেন, দ্বিতীয় দফার জন্যও দলের সভাপতি পদে থাকতে পারেন তিনি।
সভাপতির এই ঘোষণায় বাংলার বিজেপি নেতারা যারপরনাই খুশি ও উৎসাহিত হলেও, বিষয়টিকে মোটেই আমল দিচ্ছে না রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল। গত লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে দু’টি আসন পেয়ে ও ভোটের ভাগ কিছুটা বাড়িয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল বিজেপি। কিন্তু এর পরে কলকাতা, শিলিগুড়ি-সহ ৯১টি পুরসভা ও পুর-নিগমের ভোটে জোর ধাক্কা খেয়েছে। হালে বিধাননগর, আসানসোল ও হাওড়ার বালিতে তারা একেবারেই ধরাশায়ী হয়েছে। ওই তিন পুর-নিগমে তারা ভোট পেয়েছে যথাক্রমে ৮.৬%, ১৮% এবং ৬%। রাজ্য নেতারাই টের পাচ্ছেন, লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ও বামেদের যে ভোট তাঁদের ভাগে বর্তেছিল, এখন তা ফিরতে শুরু করেছে। রাজ্যে বিজেপির সংগঠন বলতেও প্রায় কিছুই নেই। তবে ভোটের আগে যে কোনও দলই দাবি করে থাকে, তারাই জিতবে। সে দিক থেকে অমিতের মুখে ২০১৬-তে পশ্চিমবঙ্গ দখলের এই দাবিতে অভিনবত্ব তেমন নেই।
তবু প্রশ্ন উঠছে অমিত কীসের ভরসায় এমন কথা বলছেন?
অমিত মনে করেন, বাস্তব ভিত্তি পর্যালোচনা করেই তিনি এই মন্তব্য করছেন। আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি তামিলনাড়ু, কেরল, অসমেও বিধানসভা ভোট রয়েছে। বিজেপি সভাপতির দাবি, এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমেই বিজেপি সরকার গঠন করবে। কেরলে বিজেপি এখনই সরকার গড়ার অবস্থায় নেই। তবে আগের থেকে ভাল ফল করবে। তামিলনাড়ুতেও এখনও রাজ্য দখলের পরিস্থিতি নেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যে বিজেপিই সরকার বানাবে, সেটি নিশ্চিত।
সম্প্রতি রাজ্যে বিধাননগর-আসানসোল ও হাওড়া পুরনিগমের বালিতে পুরভোট হয়েছে। তার ফলের উপরেও নজর রেখেছেন বিজেপি সভাপতি। আজ এক আলাপচারিতায় বলেন, ‘‘পুরভোটের ফল যা-ই হোক না কেন, বিধানসভায় ছবিটা বদলে যাবে। বিহার নির্বাচনের পর থেকেই সেখানে জোর কদমে প্রস্তুতি শুরু হবে।’’ এ বছর এপ্রিলে কলকাতা, শিলিগুড়ি-সহ রাজ্যের বিভিন্ন পুরসভায় নির্বাচন হয়েছিল। ওই ভোটের পর অমিত জানিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে যে ভাবে রিগিং হয়েছে, তাতে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হওয়া সম্ভব ছিল না। আমার জীবনে এত বড় আকারের রিগিং দেখিনি। পশ্চিমবঙ্গের পুরভোটকে জনমত হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিধানসভা ভোটে এর পুনরাবৃত্তি হবে না। সেই সময় জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে ভোট হবে। আধাসেনা মোতায়েন থাকবে। তখন আরও স্বচ্ছ ভাবে ভোট হবে।
অমিত শাহের বক্তব্যকে কোনও গুরুত্ব না দিয়ে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, এ সম্পর্কে ওঁদের কোনও ধ্যানধারণা থাকলে এ সব কথা বলতেন না। বাংলার সব মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা-মাটি-মানুষের সরকারের উপর আস্থাশীল। এ রাজ্যে এখন বিজেপি সাংগঠনিক ভাবে ব্লক স্তরেও নেতা ঠিক করতে পারে না। তারা দিল্লিতে বসে রাজ্য শাসনের দিবাস্বপ্ন দেখছেন! আগে সামলান দিল্লি। পরে বাংলা নিয়ে ভাববেন।’’
তবে বিজেপি সূত্রের মতে, অমিত আজ যে ভাবে পরের বছর পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে ভোট জেতার কথা বলেছেন তাতে স্পষ্ট, পরের বছরও তিনি সভাপতি পদে হিসেবে থাকবেন। এবং ওই সব বিধানসভা ভোট তাঁর নেতৃত্বেই হবে। এ বছরের শেষেই দলের সাংগঠনিক নির্বাচন রয়েছে। দিল্লি বিধানসভা ভোটে গোহারা হওয়ার পর দলে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল, বিহার নির্বাচন জিততে না পারলে তাঁর গদিও টলমল। যদিও অমিত বলছেন, ‘‘হার-জিতের মাধ্যমে বিজেপিতে সভাপতি পদ নির্ধারিত হয় না। অনেক বছর ধরে তো বিজেপি কোনও রাজ্যে বা কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল না। তখন কী দলের সভাপতি কাউকে করা হয়নি? সে রকম হলে তো শুধু নির্বাচনে জিতলেই দলে কেউ সভাপতি হতেন, নয়তো নয়।’’
দলের সভাপতির বক্তব্য শুনে স্বাভাবিক ভাবেই উজ্জীবিত বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাহুল সিংহ। তিনি বলেন, ‘‘আমরা তো বলছিই সে কথা। কৈলাস বিজয়বর্গীয়ও একই কথা বলেছেন। তৃণমূলের আচরণ দেখে এ রাজ্যের মানুষের পরিবর্তন শব্দটির প্রতি ঘৃণা জন্মে গিয়েছে। তাই আমরা বলছি, প্রকৃত পরিবর্তন করুন। মানুষ ভোট দিতে পারলে তৃণমূল ফিরবে না। আর সিপিএমও পরীক্ষিত। একমাত্র বিজেপি-ই এ রাজ্যে পরীক্ষিত নয়। তাই মানুষ এই দলকেই সুযোগ দেবেন।’’