বিহারে মোদীর পরীক্ষা হচ্ছে না: অমিত

বিহারে বাকি আরও তিন দফার ভোট। এখন থেকেই কিছুটা যেন রক্ষণের সুর বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের মুখে! ক’দিন আগেও দলের সভাপতি অমিত শাহ জোর গলায় বলেছেন, বিহার ভোটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীই তাঁদের তুরুপের তাস।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০১৫ ০৩:১৭
Share:

বিহারে বাকি আরও তিন দফার ভোট। এখন থেকেই কিছুটা যেন রক্ষণের সুর বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের মুখে! ক’দিন আগেও দলের সভাপতি অমিত শাহ জোর গলায় বলেছেন, বিহার ভোটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীই তাঁদের তুরুপের তাস। কিন্তু মাঝ-ভোটেই সতর্ক অমিত এখন বলছেন, বিহারে হার-জিতের দায় মোদী সরকারের উপরে চাপানো ঠিক হবে না। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তবে কি বিহার-জয়ের স্বপ্ন অধরা থেকে যাওয়ার আশঙ্কাতেই এই মন্তব্য? অমিত কিন্তু এমন কথা মানতে নারাজ। বলছেন, হয়ে যাওয়া দু’দফার ভোটে বিজেপি-ই এগিয়ে রয়েছে। আগামী দু’ফার নির্বাচনে বিরোধীরা ভেসে যাবে। শেষ দফার লড়াইটা হবে হাড্ডাহাড্ডি।

Advertisement

ক’দিন আগে অমিতকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বিহার নির্বাচনে বিজেপির সব থেকে বড় তুরুপের তাস কী? তৎক্ষণাৎ বিজেপি সভাপতি বলেছিলেন, ‘‘নরেন্দ্র মোদী।’’ একটি দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই অমিতই বলেছেন, বিহার ভোটকে মোদী সরকার সম্পর্কে জনতার রায় হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিহারে ফল ভাল না হলেও কেন্দ্রের নীতি ও সংস্কারকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও প্রভাব পড়বে না।

দলেই প্রশ্ন উঠেছে, যে অমিত এখনও বিহারে বিজেপিই সরকার গড়বে বলে দাবি করে চলেছেন, কার্যত ঘাঁটি গেড়ে বসে রয়েছেন সেখানে, তাঁকে কেন এমন রক্ষণাত্মক অবস্থান নিতে হচ্ছে? ছোট-বড়-মাঝারি যে কোনও নির্বাচনে জয় পেলেই সেটাকে যাঁরা ‘মোদী-হাওয়া’ বা ‘মোদী-জাদু’ হিসেবে দেখান, তাঁরাই কেন আগেভাগে হারজিতের দায় থেকে মোদীকে দূরে রাখতে চাইছেন?

Advertisement

বিজেপি নেতারা মানছেন, রাজ্যের ভোটে প্রধানমন্ত্রীকে মুখ করে এগোনোর বিপদ হল, সেখানে হারের মুখে পড়লে মোদীর নীতি ও তাঁর সরকারের কাজকর্মও আরও বেশি করে প্রশ্নের মুখে পড়বে। বিহারে বিজেপির বিরুদ্ধে লালু-নীতীশ-কংগ্রেসের মহাজোট সাফল্য পেলে জাতীয় রাজনীতিতেও বিরোধীদের ঐক্য ও উৎসাহ বহু গুণ বেড়ে যাবে। সেই রাস্তা বন্ধ করতেই অমিত সম্ভবত আগাম বলে রাখছেন বিহার ভোট আদৌ মোদী সরকারের কাজকর্ম নিয়ে জনতার রায় নয়। দেশের আর্থিক হাল ফেরানোর ক্ষেত্রে সে ভাবে সাফল্য আসছে না। বেড়ে চলেছে নিত্যপণ্যের দাম। এ সব নিয়ে এমনিতেই সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারকে। তার উপরে বিভিন্ন রাজ্যে অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। গো-হত্যা রোধ নিয়ে অসহিষ্ণু প্রচার, দলিত শিশু থেকে সাহিত্যিক হত্যা, পাক শিল্পীর অনুষ্ঠান ভেস্তে দেওয়া থেকে নাটকে হামলার মতো ঘটনার দায় নিতে মোদী রাজি না হলেও, বিরোধীরা নিশানা করছেন তাঁর সরকারকেই। দাদরি থেকে মূল্যবৃদ্ধির প্রশ্নে মোদী সরকাররকে লাগাতার নিশানা করছেন লালু-নীতীশ। ডালের দাম নিয়ে মোদী কাল বিহারে এক সভায় নীতীশকে বিঁধেছিলেন, ‘‘বিহারে কালোবাজারি আটকাচ্ছেন না বলে ডালের দাম বাড়ছে। নীতীশের পাল্টা তোপ, ‘‘যেন ডালের দাম শুধু বিহারেই বাড়ছে! গোটা দেশে ডালের দাম বাড়ছে কেন্দ্রীয় সরকারের ভুল নীতির ফলে।’’ এই পরিস্থিতিতে বিহার ভোটে হারজিতের দায়ও মোদী সরকারের উপরে চাপুক, এটা কোনও মতেই চাইছেন না অমিত। সে কারণেই তাঁর ওই সতর্ক মন্তব্য, মনে করছেন দলের নেতারা।

কিন্তু তাতেও মূল প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে— তবে কি ভোটের অঙ্ক কষে বিহার জয় নিয়ে সত্যিই সংশয়ে পড়েছেন অমিত?

বিজেপি সূত্রের মতে, আসলে প্রথম দু’দফার ভোটে প্রত্যাশা মাফিক ভোট পড়েনি। বিজেপির কপালে ভাঁজ ফেলেছে তা। অমিত অবশ্য দাবি করেছেন, প্রথম দুই দফার ৮১টির মধ্যে ৫২ থেকে ৫৫টি আসন পাবে বিজেপি। পরের দুই দফায় বিজেপি ‘সুইপ’ করবে। তৃতীয় দফায় পরশু ভোট হবে সারন, বৈশালী, নালন্দা, পটনা, ভোজপুর, বক্সার-সহ ৫০টি আসনে। পরের দফায় পূর্ব ও পশ্চিম চম্পারণ, সীতামঢ়ী মুজফ্ফরপুর, গোপালগঞ্জ, সিওয়ান-সহ ৫৫টি আসনে ভোট আগামী ১ নভেম্বর।

শেষ দফার ভোট হবে ৫ নভেম্বর, সীমাঞ্চল এলাকার ৫৭টি আসনে। মধুবনী, আরারিয়া, কিষাণগঞ্জ, পূর্ণিয়া, কাটিহার মাধেপুরা, সহর্ষ ও দ্বারভাঙার মতো কেন্দ্রে। এই শেষের দফাটি যে ‘জটিল’ সেটি কবুল করেছেন খোদ বিজেপি সভাপতিই। প্রথম কারণ, দেশ জুড়ে প্রবল মোদী হাওয়ার মধ্যেও গত লোকসভা ভোটে এই এলাকা থেকে ভাল ফল করেছে লালুপ্রসাদের আরজেডি, নীতীশ কুমারদের জেডিইউ, সমাজবাদী পার্টি এমনকী এনসিপি-ও। বিধানসভা ভোটে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারেন আরজেডি থেকে বহিষ্কৃত নেতা পাপ্পু যাদবও। যে যেখানে শক্তিশালী, সংখ্যালঘু ভোট যেতে পারে সেই দিকেই। ফলে এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চালালেও বিজেপি বেশি ভরসা রাখছে তৃতীয় ও চতুর্থ দফার ১০৫টি আসনের উপরে।

অমিতের চিন্তার আরও একটি বড় কারণ, আরএসএসের অসহযোগিতা। ভোটের মুখে স্বয়ং সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত সংরক্ষণ নীতি নিয়ে বিতর্ক বাধিয়ে বিজেপিকেই বিপাকে ফেলেছেন। তার পর নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহরা পই পই করে সংরক্ষণ উঠবে না বলে চেঁচালেও থামানো যায়নি ভাগবতকে। তিনি আবার এই নিয়ে মুখ খুলে বিতর্ক বাড়ান।

এই অবস্থায় বিহার জয়ের পুরো দায়টাই বর্তেছে মোদী ও অমিতের কাঁধে। মোদীর নির্দেশেই কেন্দ্রীয় সরকারের কাজকর্ম শিকেয় তুলে প্রায় দেড় ডজন মন্ত্রী বিহারে ঘাঁটি গেড়ে বসে রয়েছেন। দিল্লিতে পরাজয়ের পর বিহার ভোটটা রীতিমতো ইজ্জতের লড়াই মোদী-শাহের জুটির কাছে। সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিচ্ছেন লালু-নীতীশও। তাই দুর্গাপুজো ও নবরাত্রির বিরতি শেষ হতেই মোদীকে দিয়েই কার্পেট বম্বিং করানো হচ্ছে।

প্রথম দু’দফার নির্বাচনে তেমন ‘সুখবর’ আসছে না মনে করে মোদীর একটি সভা বাতিল করা হয়েছিল। বিহারের নেতাদেরই গুরুত্ব দেওয়া কথা বলতে শুরু করে দল। তাতে ফল হয় উল্টো। বিরোধী শিবির প্রচার করতে শুরু করে, হেরে যাওয়ার ভয়ে মোদীকে দূরে রাখা হচ্ছে। এই অবস্থায় মোদীকেই ফের আক্রমণের মুখ করা ছাড়া গতিও নেই বিজেপির। তাই বাকি প্রতিটি দফার আগে দু’টি দিন করে প্রচারের জন্য সময় দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ছ’দিনে মোট ১৭টি জনসভা করবেন তিনি।

প্রশ্ন এটাও যে, প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজে কেন এতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন বিহার ভোটকে। জাতীয় রাজনীতি ও কেন্দ্রের সরকারের ক্ষেত্রে এই ভোট কতটা গুরুত্বপূর্ণ? একটি ইংরেজি দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এর জবাব দিয়েছেন অমিত। তাঁর কথায়, ‘‘বিহার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বিহারে জিতলে এটি হবে পূর্ব ভারতের (দলের) প্রবেশ পথ। পূর্ব ভারতে আমাদের আদর্শের স্বীকৃতির পথে এটি হবে বড় প্রতীক।’’

এর পরই জানতে চাওয়া হয়, এটাকে কি মোদী সরকার সম্পর্কে জনতার রায় হিসেবে দেখা যাবে?

তখনই পিছু হটেন সতর্ক অমিত।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement