আবাসন বিল

মধ্যবিত্তই বাদ, বিরোধিতায় বাম-কংগ্রেস

নরেন্দ্র মোদী সরকারের নয়া আবাসন বিলে প্রোমোটারদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে আগেই অভিযোগ তুলেছিলেন বিরোধীরা। বিলের বিরুদ্ধে এ বার নতুন অভিযোগ— ছোট মাপের আবাসনে ফ্ল্যাট কিনতে গেলে ক্রেতাদের জন্য কোনও আইনি সুরক্ষাই রাখা হয়নি।

Advertisement

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৭ অগস্ট ২০১৫ ০২:৪৩
Share:

নরেন্দ্র মোদী সরকারের নয়া আবাসন বিলে প্রোমোটারদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে আগেই অভিযোগ তুলেছিলেন বিরোধীরা। বিলের বিরুদ্ধে এ বার নতুন অভিযোগ— ছোট মাপের আবাসনে ফ্ল্যাট কিনতে গেলে ক্রেতাদের জন্য কোনও আইনি সুরক্ষাই রাখা হয়নি। অথচ ছোট প্রোমোটারদের বিরুদ্ধেই প্রতারণার অভিযোগ বেশি ওঠে।

Advertisement

আবাসন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আইন তৈরি করতে চাইছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। কিন্তু সরকারের বিল বলছে, যে সব আবাসন ৫০০ বর্গমিটার বা তার কম মাপের জমির উপর তৈরি এবং যে সব অ্যাপার্টমেন্টে ৮টি বা তার কম ফ্ল্যাট রয়েছে, সেখানে ওই আইন প্রযোজ্য হবে না।

কংগ্রেস ও সিপিএম এককাট্টা হয়ে অভিযোগ তুলেছে, এর ফলে শহুরে এলাকার অধিকাংশ ফ্ল্যাট বা আবাসন প্রকল্পই আইনের বাইরে থাকছে। মধ্যবিত্তরাই ছোট ছোট আবাসনে ফ্ল্যাট কেনেন। তাঁরাই প্রোমোটার বা দালালদের হাতে সব থেকে বেশি প্রতারিত হন। অথচ প্রস্তাবিত বিলে তাঁদের জন্যই কোনও আইনি রক্ষাকবচ রাখছে না মোদী সরকার।

Advertisement

মোদী সরকারের রিয়েল এস্টেট (রেগুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) বিল নিয়ে প্রথম থেকেই আপত্তি তুলেছিল কংগ্রেস। অভিযোগ ছিল, ক্রেতাদের স্বার্থের কথা বলে আসলে এই বিলে প্রোমোটারদের স্বার্থই বড় করে দেখা হয়েছে। রাজ্যসভায় আপত্তি ওঠায় বিলটি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। বিজেপি সাংসদ অনিলমাধব দাভের সিলেক্ট কমিটি ক্রেতাদের স্বার্থরক্ষার জন্য একগুচ্ছ সুপারিশ করেছে। ফ্ল্যাটের মাপের মধ্যে যাতে ছাদ-বারান্দা বা সিঁড়িকেও জুড়ে দেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, ফ্ল্যাটের ভিতর আসলে কতটুকু জায়গা বা ‘কার্পেট এরিয়া’ রয়েছে, তা স্পষ্ট করে জানাতে হবে। এত দিন ‘সুপার বিল্ট এরিয়া’ বলে যে বাড়তি অংশের মাপ ফ্ল্যাটের কার্পেট এলাকার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হতো, তার কোনও সুনির্দিষ্ট নিয়ম নীতি ছিল না। অর্থাৎ একই মাপের দাম দিয়ে এক এক জন ক্রেতা এক এক রকম কার্পেট এলাকার ফ্ল্যাট হাতে পেতেন। সুপারিশে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা আনতে চেয়েছে সিলেক্ট কমিটি। সঙ্গে ক্রেতাদের স্বার্থে আরও একগুচ্ছ প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

তবে তার পরেও সিলেক্ট কমিটির সুপারিশে আপত্তি জানিয়ে আলাদা নোট দিয়েছেন কংগ্রেসের কুমারী শৈলজা, শান্তারাম নায়েক, এম ভি রাজীব গৌড়া এবং সিপিএমের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের আপত্তির মূল কারণ— এত ঘটা করে যে আইন আনা হচ্ছে, অধিকাংশ ক্রেতাই তার আওতায় পড়ছেন না। সূত্রের খবর, দু’দলের নেতারা আলোচনা করেই একজোট হয়ে এই আপত্তি তুলেছেন। নির্বাচনী জোট না হলেও সীতারাম ইয়েচুরির জমানায় সংসদে কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএমের সমন্বয় যে ক্রমশ মজবুত হচ্ছে, এ ঘটনায় ফের তার প্রমাণ মিলল।

কংগ্রেস-সিপিএম নেতাদের যুক্তি, দিল্লি-মুম্বই-কলকাতার মতো শহরে ঘিঞ্জি এলাকায় বড় মাপের আবাসনের জায়গা কমই মেলে। মূলত ছোট মাপের জমিতেই ফ্ল্যাট-বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট বা আবাসন তৈরি হয়। ৫০০ বর্গমিটার বা তার অনেক কম জমির উপরে এই সব আবাসন মাথা তোলে। নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের সিংহ ভাগ ওই সব ফ্ল্যাটই কেনেন। কিন্তু সরকার যে আইনি সুরক্ষার কথা বলছেন, তা থেকে তাঁদেরই বাদ রাখা হয়েছে। কংগ্রেস-সিপিএমের দাবি— ক্রেতাদের স্বার্থে ছোট-বড় ভেদাভেদ না করে সব আবাসন প্রকল্পকেই আইনের আওতায় আনা হোক।

আর একটি বিতর্কিত বিষয়েও কংগ্রেস-সিপিএম সাংসদরা মোদী সরকারের বিরোধিতা করছেন। তা হল ঠিক সময়ে আবাসন প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রেই ক্রেতারা পুরো টাকা মিটিয়ে দেওয়ার পরও কাজ শেষ না-হওয়ায় ফ্ল্যাটের চাবি হাতে পান না। প্রোমোটাররা একটি আবাসনের ক্রেতাদের থেকে টাকা নিয়ে অন্য আবাসন তৈরির কাজ শুরু করে দেন। আগের ইউপিএ-সরকারের প্রস্তাবিত বিলটিতে বলা হয়েছিল, কোনও প্রকল্পে ক্রেতাদের থেকে নেওয়া টাকার ৭০ শতাংশ একটি নির্দিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরিয়ে রাখতে হবে। অন্য কোথাও তা খরচ করা যাবে না। এই শর্তটি নিয়েই সব থেকে বড় আপত্তি ছিল ছোট-বড় প্রোমোটারদের। সিলেক্ট কমিটির সামনে ক্রেতা সংগঠনগুলি দাবি তুলেছিল, ১০০ শতাংশ অর্থই নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে রাখতে বলা
হোক। কিন্তু এর পরেও মোদী সরকারের প্রস্তাবিত বিলটিতে তা কমিয়ে ৫০ শতাংশ করে প্রোমোটারদের সুবিধা করে দেওয়া হয়েছে। সিলেক্ট কমিটিও এ বিষয়ে ৫০ শতাংশ টাকা সরিয়ে রাখার পক্ষেই সুপারিশ করেছে। কংগ্রেস-সিপিএম এই টাকার অংশ অন্তত ৭০ ভাগ করার দাবি তুলেছে।

মোদী সরকারের বিলে বলা হয়েছে, আবাসন ক্ষেত্রের জন্য একটি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ তৈরি হবে। যে কোনও আবাসন প্রকল্প সেখানে নথিভুক্ত করতে হবে। কংগ্রেস-সিপিএমের অভিযোগ, প্রকল্পের নথিভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হলেও নতুন বিলে প্রোমোটারদের নথিভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তাই তাঁদের দাবি, সবার আগে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রোমোটারদের নাম নথিভুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement