ছবি: উজ্জ্বল দেব।
বন্ধুর দেওয়া ছোট্ট সাউন্ড-বক্সে গান আর ডিগবাজিলোকসভা-যুদ্ধের ময়দানে এটাই ‘হাতিয়ার’ ৬৬ বছরের প্রৌঢ়ের!
রাস্তার মোড়, বাজার-হাটে আচমকা দাঁড়িয়ে তিনি বলছেন, “আমার লড়াই একেবারে সনিয়া গাঁধীর সঙ্গে। এক বার ভোটে জিতি, এলাকার চেহারাটাই পালটে দেব।”
ভোট-বাজারে ওই প্রার্থীর কথা শুনতে ভিড় জমছে বরপেটা কেন্দ্রের অলিগলিতে। আশ্বাসের ‘ফুলঝুরি’তে ভোটারদের মন জিততে চাইছেন পরপর তিন বার বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত নির্দল প্রার্থী কামালউদ্দিন। চতুর্থ বার প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দিতে তিনি মরিয়া।
না-জিতলে যে বিয়েটাও করতে পারছেন না। এটাই যে তাঁর ‘ধনুক-ভাঙা পণ’!
তিন বার পরাজয়ের পরও কোন সাহসে লোকসভা ভোটে লড়ছেন কামাল? কামালের বন্ধু ও পড়শিদের বক্তব্য, ‘‘উনি যদি ভোটে লড়তে না-নামেন, তবে তো আনন্দটাই মাটি। তাই, আমরাই চাঁদা তুলে টাকা জোগাড় করে দিই।’’ প্রচারে বড় মঞ্চ, মাইকের সারি, গাড়ির কনভয়, বাইক মিছিলের বালাই নেই। বন্ধুর দেওয়া সাউন্ডবক্স নিয়ে যে কোনও রাস্তার মোড় বা বাজারে দাঁড়িয়ে যান কামাল। জনপ্রিয় গান গেয়ে ভিড় জমান। তার পরে রাস্তাতেই শুরু হয় তাঁর যোগব্যায়াম প্রদর্শনী। কখনও চক্রাসন, কখনও ফ্রন্টরোল-ব্যাকরোল। ধুলো ঝেড়ে উঠে কোনও গাড়ি, ভ্যান বা রিকশর উপরে দাঁড়িয়ে শুরু করেন বক্তৃতা। তাঁর কথার সারাংশ লড়তে নয়, জিততে এসেছেন। তাঁকে ভোট দিলে সব সমস্যার সমাধান। বরপেটার সবার মাথার উপরে ছাদ হবে। বেকারদের চাকরি বাঁধা। দূরে হঠবে মূল্যবৃদ্ধি। এলাকার মহিলারা সকলে স্বনির্ভর হবেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি সাংসদ হলে বন্যা রুখতে সরুক্ষেত্রীর চারপাশে এত উঁচু দেওয়াল তুলবেন, কোনও নদীর জলই তা টপকাতে পারবে না।
পেশায় কামার। এ বারই প্রথম লোকসভার লড়াইতে নেমেছেন কামাল। তবে, বিধানসভা নির্বাচনের মতোই পকেটের টাকা খরচ করে প্রচার চালাতে হচ্ছে না তাঁকে। কামালের ভাষণ শুনতে ভিড় জমানো লোকজন হাসতে-হাসতে ১০-২০ টাকা স্বেচ্ছায় দিয়ে যাচ্ছেন। কামালের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৫২ হাজার ৮৩৬ টাকা অক্ষতই রয়েছে। লোকসভা ভোটের মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে, খোদ জেলাশাসক তথা রিটার্নিং অফিসারকে কামাল অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর কাছে টাকা কম পড়লে, জেলাশাসক যেন নিজের পকেট থেকেই বাকি টাকা দিয়ে দেন!
আগের তিনটি বিধানসভা ভোটে কামালের পক্ষে শ’পাঁচেকের মতো ভোট পড়েছিল। কিন্তু এরপরও তাঁকে খাটো করে দেখতে নারাজ কামালের নির্বাচনী এজেন্ট আমসের আলি। তিনি বলছেন, ‘‘কামালবাবু বরপেটার মঙ্গলের জন্য অনেক কিছু করতে চান। কিন্তু, মানুষের কপাল খারাপ। তাঁরা না-বুঝে অন্যদের জিতিয়ে নিজেদের বঞ্চিত করছেন।”
লোকসভা ভোটে বরপেটায় ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীর সমাবেশ। বর্তমান কংগ্রেস সাংসদ ইসমাইল হুসেন তো আছেনই, লড়ছেন এআইইউডিএফ-এর সিরাজুদ্দিন আজমল। দীর্ঘদিনের দুই বন্ধু, অগপ-র ফণীভূষণ চৌধুরি এবং সম্প্রতি অগপ ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া চন্দ্রমোহন পাটওয়ারিও প্রতিদ্বন্দ্বী। রয়েছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদের ছেলে পরভেজ। তিনি কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে নাম লিখিয়েছেন। নির্দল কামাল কিন্তু তাঁদের কাউকেই গুরুত্ব দিতে নারাজ। বয়স ৬৬ ছুঁলেও তিনি অবিবাহিত। ঠিক করেছিলেন, অন্তত এক বার ভোটে না-জিতলে বিয়ের পিঁড়িতে বসবেন না। ক্ষোভের সুরেই কামাল বললেন, “এত গুলো বছর সাংসদরা বরপেটার উন্নয়নে কিছুই করেননি। আমি সব করতে চাইছি। কিন্তু মানুষ বুঝছে না। বিয়ে তাহলে আর কবে করব? মনে হয় এ বার আমার কুমারত্ব ঘুচবে।”