শতাব্দী প্রাচীন পুঁথি নিয়ে কর্মশালা শিলচরে

একশো বছরেরও পুরনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে ফের নাড়াচাড়া শুরু হল শিলচর নর্মাল স্কুলে। সেগুলি সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়েছে গুরুচরণ কলেজের বাংলা বিভাগ। রাষ্ট্রীয় পাণ্ডুলিপি মিশনের সহায়তায় ২৩ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে দশদিনের একটি কর্মশালা। বরাক উপত্যকায় স্থানীয় ইতিহাস চর্চার ইতিহাস শতাব্দী প্রাচীন।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৯ মার্চ ২০১৫ ০২:৫৭
Share:

একশো বছরেরও পুরনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে ফের নাড়াচাড়া শুরু হল শিলচর নর্মাল স্কুলে। সেগুলি সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়েছে গুরুচরণ কলেজের বাংলা বিভাগ। রাষ্ট্রীয় পাণ্ডুলিপি মিশনের সহায়তায় ২৩ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে দশদিনের একটি কর্মশালা।

Advertisement

বরাক উপত্যকায় স্থানীয় ইতিহাস চর্চার ইতিহাস শতাব্দী প্রাচীন। কাজটি শুরু করেছিল নর্মাল স্কুল। এই শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির সব কিছুই করা হয়েছিল নিখুঁত পরিকল্পনায়। প্রধান রূপকার ছিলেন অঘোরনাথ অধিকারী। প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন শিক্ষকরা---জগন্নাথ দেব, তারিণীমোহন দাস, আব্দুল বারি, রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য নর্মাল স্কুলকে কেন্দ্র করেই প্রথম আঞ্চলিক ইতিহাসের গবেষণা শুরু করেন। সংগ্রহ করা হয়েছিল পুরনো মূর্তি, হাতে লেখা পুঁথিপত্র, নানা রকমের দলিল-দস্তাবেজ। এঁরা অবসর নিতেই সেই ঐতিহ্য হারাতে শুরু করে নর্মাল স্কুল। থমকে যায় পুঁথি-গবেষণাও।

১৯১৪-র ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুরমা উপত্যকা সাহিত্য সম্মিলনীর অধিবেশন। জগন্নাথ দেব সেখানে ‘শ্রীহট্ট-কাছাড়ের তথ্যানুসন্ধান’ শিরোনামে প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। প্রবন্ধটি পরে করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত মাসিক শ্রীভূমি-তে প্রকাশিত হয়েছিল। উক্ত প্রবন্ধে তিনি লেখেন, “...যাঁহাদের এ বিষয়ে উৎসাহ ও অভিজ্ঞতা আছে, তাঁহারা সেই সকল পুঁথির গলিত পত্ররাশির মধ্য হইতে অনেক অমূল্য রত্নও উদ্ধার করিতে পারিবেন, প্রাচীন পুঁথির আলোচনা হইতে কখন কখন প্রামাণিক ঐতিহাসিক তথ্য নির্ণীত হয় এবং প্রসিদ্ধ ও পরিচিত গ্রন্থকারগণের মুদ্রিত পুস্তকেরও পাঠশুদ্ধি, পাঠবিকৃতি ও প্রক্ষিপ্ততাজনিত দোষ সংশোধিত হয়।”

Advertisement

নর্মাল স্কুলকে কেন্দ্র করে ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয় শিক্ষাবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা শিক্ষাসেবক। এর দ্বাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যায় পুঁথির একটি তালিকা প্রকাশ করেছিলেন পুলিনবিহারী ভট্টাচার্য। সেই তালিকায় দেখা যায়, পুঁথিগুলি বাংলা এবং সংস্কৃতে লেখা। বাংলায় রামায়ণের পুঁথির সংখ্যা ৪৬, মহাভারত ৪১, পুরাণ ৬৮, বৈষ্ণব সাহিত্য ১৭, পাঁচালি ২১, গীতা ৯, যোগশাস্ত্র ৮ এবং বিবিধ ৩১। সংস্কৃতে তন্ত্র ১১, জ্যোতিষ ৩, বৈষ্ণবশাস্ত্র ৪, ব্যাকরণ ১০ এবং বিবিধ ২১। এই মর্নাল স্কুল থেকেই ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় ‘নারদী রসামৃত’। শিলচর নর্মাল স্কুল গ্রন্থ প্রচার সমিতির পক্ষে সহকারী অধ্যক্ষ কেদারনাথ চৌধুরী ছিলেন প্রকাশক। জগন্নাথ দেবের অনুলিপি অবলম্বনে সম্পাদনা করেন অধ্যক্ষ প্রমদাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। মূল্য ছিল ১ টাকা ৪ আনা। এরপর এই সংগ্রহশালা নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেন আরও তিনজন---যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, অনুরূপা বিশ্বাস ও অমলেন্দু ভট্টাচার্য। অনুরূপা বিশ্বাস সংগ্রহশালার ‘কৌতুক বিলাস’ সম্পাদনা করেন। অমলেন্দু ভট্টাচার্য তাঁর গ্রন্থে ‘নারদী রসামৃত’-এর বিভিন্ন পুঁথির তুলনামূলক পাঠ তৈরি করেন।

২০১১ সালে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপন্ন ভাষা, লোকসংস্কৃতি ও পাণ্ডুলিপি গবেষণা কেন্দ্র থেকে নর্মাল স্কুলে একটি সংরক্ষণ কর্মশালা সংগঠিত করা হয়েছিল। কিন্তু ওই কর্মশালায় সব পুঁথিকে সংরক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এখন গুরুচরণ কলেজের বাংলা বিভাগ সেগুলিকে সংরক্ষণের আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজে নেমেছে। শুরু করেছে দশ দিনের এই কর্মশলা। প্রশিক্ষক হিসেবে রয়েছেন রাষ্ট্রীয় পাণ্ডুলিপি মিশনের পুরণ চন্দ্র এবং মিথিলেশকুমার সিংহ, পুরুলিয়ার সিধো-কানো বিশ্ববিদ্যালয়ের নবগোপাল রায়, মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পি গুণীন্দ্র এবং অমলেন্দু ভট্টাচার্য। অসম ও পশ্চিমবঙ্গের ৩০ জনেরও বেশি এই কর্মশালায় অংশ গ্রহণ করছেন। রয়েছেন বিভিন্ন কলেজের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও।

অমলেন্দুবাবু বলেন, “এই সব পুঁথি পাঠ করলে বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যে কিছু নতুন কথা বলার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সংরক্ষণে যে সব পুঁথি মিলেছে তার মধ্যে রয়েছে দ্রৌপদীর যুদ্ধ। অথাৎ কুরুক্ষেত্রে দ্রৌপদীও যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে প্রাথমিক ভাবে মনে হয়। ছোট দু’-একটি পুঁথি রয়েছে, এগুলিকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে গদ্যে লেখা। একটি পুঁথিতে রয়েছে বিভিন্ন রকমের ফর্দ। এটি সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটা ভিন্ন মাত্রা এনে দিতে পারে।” গুরুচরণ কলেজের বাংলার বিভাগের প্রধান মুনমুন ভট্টাচার্য জানান, “সংরক্ষণের পর তাঁদের পরিকল্পনা হচ্ছে, একটা বিবরণাত্মক সূচি তৈরি করা। এটি করা গেলে গবেষণার কাজ সহজ হয়ে যাবে।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement