Comfortable Fashion

স্বাচ্ছন্দ্যই আজ বিলাসিতা, আরাম ও সাজের মিল হবে কী ভাবে? ফ্যাশন সাম্রাজ্যে রাজকন্যে হয়ে ওঠার পাঠ

আরাম আর সাজগোজের ভাব ভালবাসা হলেই আপনার মন ফুরফুরে দখিনা বাতাসের মতো হয়ে উঠবে। ঠিক কী ভাবে মেলবন্ধন ঘটাবেন? রইল তারই পাঠ।

Advertisement

শর্মিলা বসুঠাকুর

শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৩০
Share:

আরামদায়ক অথচ স্টাইলিশ হয়ে উঠবেন কী ভাবে? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ছোটবেলায় রূপকথায় পড়া আসল রাজকন্যের গল্পটা মনে আছে? পাহাড়প্রমাণ গদি-তোষকের তলায় ছোট্ট এক মটরদানা রাজকন্যের রাতের ঘুম কেড়ে নিলে। আর তাই দিয়েই সেই মেয়ের রাজকন্যাত্ব প্রমাণিত হল। এই শিবের গীতের কারণ হল এই মুহূর্তে ফ্যাশনের রূপকথায় আরাম বা স্বাছন্দ্যকে যাঁরা প্রাধান্য দেন, তাঁদের মাথাতেই রাজকন্যের মুকুট ঝলমলিয়ে ওঠে। আসল কথা হল, কষ্ট করে নিজের সাইজ়ের চেয়ে ছোট মাপের পোশাকে প্রায় হাঁটতে না পারা, পেন কিলার খেয়ে রণপা সুলভ স্টিলেটো পরে পার্টিতে যাওয়া, দম বন্ধ করা করসেটে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থার দিন শেষ। কোনও ডিজ়াইনার তাঁর বিশেষ কালেকশন প্রদর্শনে এ সব বানাতেই পারেন কিংবা কেউ যদি তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দে নিজের ওয়ারড্রবে এমন সব পোশাক রাখতে চান, সে স্বাধীনতা নিশ্চয়ই তাঁর আছে। কিন্তু আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে ফ্যাশনের বাতাবরণ বুঝতে গেলে শ্লোগান হল— ‘কমফর্ট ইজ় দ্য নিউ ওয়ে অফ লাক্সারি’ বা স্বাচ্ছন্দ্যই আজ বিলাসিতা।

Advertisement

আরাম আর সাজগোজের ভাব-ভালবাসা হলেই আপনার মন ফুরফুরে দখিনা বাতাসের মতো হয়ে উঠবে। ছবি: সংগৃহীত

আমি অবশ্য ব্যক্তিগত ভাবে চিরকালই এই মতে বিশ্বাসী। আমার মতে, যে কোনও ক্ষেত্রেই এমন পথ বেছে নেওয়া উচিত, যে পথে আমি অনেক দিন ধরে বিনা বিভ্রাটে চলতে পারব। সে ডায়েট, মেকআপ, ফিটনেস— সব কিছুর ক্ষেত্রেই এই সত্য প্রযোজ্য। যা-ই করি, সেই পথ যেন বেশ টেকসই হয়, দীর্ঘ দিন ধরে তা বজায় রাখা যায় বা চালিয়ে নেওয়া যায়। তবেই সে জুতসই মেজাজের হবে। তাই তো আজ কমফর্টেব্‌ল ফ্যাশনের এত জয়গান। আমার মতে, ফ্যাশন তো শূন্যে ভাসমান বায়বীয় কোনও বস্তু নয়। তার আধার মানুষ, মানুষের মন, তার চাহিদা, ভাললাগা, ভাল থাকা। আর ভাল থাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরাম, স্বাছন্দ্য, তৃপ্তি, স্বীকৃতি। ফ্যাশনের এই মনস্তাত্বিক আঙ্গিক থেকেই আমার মতে কমফর্টেব্‌ল ফ্যাশনের জন্ম। ভাল থাকতে, নিজেকে সুন্দর দেখাতে কে না চায়! আরাম আর সাজগোজের ভাব ভালবাসা হলেই আপনার মন ফুরফুরে দখিনা বাতাসের মতো হয়ে উঠবে। তবে শুনতে সহজ হলেও এদের ঘটকালিতে একটু বুদ্ধির ঘনঘটা প্রয়োজন। শুধুই আরামের কথা মাথায় রেখে ঘরে পরার পোশাক পরে তো বেরোনো চলবে না। আরামদায়ক অথচ স্টাইলিশ হয়ে ওঠা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! এর জন্য বেশ কিছুটা জ্ঞানগম্যির প্রয়োজন আছে বইকি। আপাতদৃষ্টিতে দেখতে ন্যাতানো, রং ওঠা মনে হলেও, সেই ফ্যাব্রিক বা কাপড় আদতে কি তা-ই? আপনি ন্যাচারাল ডাই, খাদি লিনেন জানেন না, কলা কটনের খোঁজ রাখেন না, মালখা কী বোঝেন না, সেটা আপনার অজ্ঞতা। কাজেই, স্বাচ্ছন্দ্য অত সস্তা নয়। স্বাচ্ছন্দ্য বোঝার পদ্ধতিতে আপনি কতটা স্বচ্ছন্দ, তার উপর নির্ভর করবে আপনি কতখানি কমফর্টেব্‌লি ফ্যাশনেবল। স্বাচ্ছন্দ্য আর ফ্যাশন মেলাতে তাই বেশ মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। আসলে যে কোনও বিষয় বুঝতে গেলে, তাকে নিজের যাপনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে গেলে, তার গভীরে যাওয়া দরকার, আন্তরিক ভাবে পাঠ নেওয়া জরুরি। এই অভ্যাস শুধু ফ্যাশনেবল হয়ে ওঠার জন্য নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত।

অ্যান্টি ফিট পোশাকে বেশ একটা আলাভলা, সিধেসাদা মেজাজ আছে বটে। ছবি: সংগৃহীত

তবে আজকাল বহু ফ্যাশন সচেতন মানুষই কিছু পোশাক তাঁদের ওয়ারড্রবে রাখছেন, যা নিয়ে ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা কম। যেমন লাউঞ্জ ওয়্যার। কোথাও বেড়াতে গিয়েছেন, ভাল হোটেলে উঠেছেন, সেখানে ইনি এককথায় মুশকিল আসান। স্বাছন্দ্য বজায় রেখে ফ্যাশনেবল হয়ে উঠতে গেলে পোশাকের কাপড় আর কাট, দুই-ই মাথায় রাখতে হবে। খুব সাধারণ বাংলায় বলতে গেলে, এমন ক্ষেত্রে ঢিলেঢালা সুতির পোশাক আদর্শ। কিন্তু ওই যে, ফ্যাশনেবল হতে হবে, তাই ঢিলেঢালা মানে কোনও শেপের ছিরিছাঁদ নেই, যেমন তেমন পোশাক কিন্তু চলবে না। অনায়াস কিন্তু বিলাসী হতে হবে। তাই তো কাফতান আজ ফ্যাশনের মূল স্রোতে ঢুকে পড়েছে। পালাজ়ো, ওভারসাইজ় শার্ট, কুর্তা, স্কার্ট, নরম হ্যান্ডলুম শাড়ি, সঙ্গে ক্রপ টপ। মনের মতো কাপড়ে নানা ধরনের কাট নিয়ে খেলা করা যেতেই পারে, আপনার পছন্দ এবং প্রয়োজন মাথায় রেখে। অ্যান্টি ফিট পোশাকে বেশ একটা আলাভোলা, সিধেসাদা মেজাজ আছে বটে, কিন্তু এই আপাত সিধেসাদা স্বভাবে ভুলেছেন কি মরেছেন! তখন আপনার অ্যান্টি ফিট পোশাক বাঘা বাইনের ঢোল হয়ে মরমে বেজে উঠবে। সে দুঃখ রাখার জায়গা পাবেন কোথায়? তাই অ্যান্টি ফিটেও যে একটা ফিটের বা কাটের কারিকুরি আছে তা ভুললে চলবে না। আর ফুরফুরে মেজাজের জন্য চাই এমন কাপড়, যার মধ্যে দিয়ে দখিনা বাতাস বয়ে যেতে পারে। গরমে ঘেমে নেয়ে সর্বসমক্ষে আপনার পোশাক আপনাকে ভালবেসে জাপটে ধরলে বেইজ্জতির একশেষ! হ্যান্ডলুম, ন্যাচারাল ফাইবার, লিনেন কাপড় আরামের। কোনও মিক্সড কাপড়েই সুতির আরাম পাওয়া যায় না, জানবেন। জুতোর ক্ষেত্রেও আজকাল স্পোর্টস শু, ক্রক্‌স, স্নিকার্স, বুট দিব্যি রমরমিয়ে চলছে। জুতো কোম্পানিরাও পদসেবায় নেমে ক্রেতাদের আরামের কথাই চিন্তা করছেন, ফ্যাশনের কথাটিও মাথায় রেখে। সেই আমাদের ছেলেবেলায় শোনা ‘হিলতোলা জুতো’-য় আজ পা ডোবানো সোলে ডুবস্নানের আরাম। জুতোর ওপরে মৃদু চাকচিক্যে ফ্যাশনের হাতছানি। ‘বিউটি ইজ় পেন’ অর্থাৎ ‘সুন্দর হতে গেলে যন্ত্রণা সইতে হবে’— এই মন্ত্র আজ বাতিল।

Advertisement

আজকাল স্পোর্টস শু, ক্রক্‌স, স্নিকার্স, বুট দিব্যি রমরমিয়ে চলছে। ছবি: সংগৃহীত

হ্যাঁ, ফ্যাশনের ব্যাকরণে ক্যাজ়ুয়াল, ফর্মাল, সেমি-ফর্মাল— এমন সব বিভাজন আছে এবং অনেক সময়েই তা মেনে চলতে আমরা বাধ্য হই। তবে এই নিয়মের কড়াকড়ির আঙিনা খুব বড় নয়। তাই খুব চিন্তিত হওয়ারও কিছু নেই। আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কখন যাচ্ছেন, তার উপর নির্ভর করবে আপনি কেমন পোশাক বাছবেন। বিলাসী আরামের পোশাক ফ্লাইটে, সারা দিনের আউটিংয়ে, সাগরসৈকতে, গরমের জায়গায় বেড়াতে গেলে বেশি প্রয়োজন। আরও নানা প্রেক্ষিতেই তা প্রযোজ্য। কতগুলো উদাহরণ দিলাম মাত্র। সাধারণ একটা ধারণা দেওয়ার জন্য কয়েকটা কথা বলা। আমি নিজে শীতের সময় ছাড়া সর্বদাই আরামের বিলাসিতায় বিশ্বাসী। সেজেগুজে আপনি যদি আপনিই না থাকলেন, লটারি পাওয়া মেজাজটাই যদি হারিয়ে ফেললেন, তা হলে কী লাভ?

এ বার ফ্যাশন সাম্রাজ্যে আসল রাজকন্যা হয়ে ওঠার পালা আপনাদের।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement