Wedding Planning in Crisis

জৌলুসের সঙ্গে আপস নয়, তবু বাঁচানো যাবে জ্বালানি, কমবে বিয়ের খরচ, দিশা দেখাচ্ছেন পেশাদার আয়োজকেরা

বিয়ে তো এক বারই হচ্ছে— এই ভাবনা থেকেই বাহারি আয়োজনের শুরু হয়। কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রীই যখন কম জ্বালানি খরচের উপদেশ দিয়েছেন, তখন সে বিষয়ে দ্বিতীয় বার ভাবা উচিত। তবে কাটছাঁট করেও, নানা বিকল্পের হাত ধরেও এলাহি হতে পারে বিবাহ অনুষ্ঠান। কী ভাবে পরিকল্পনা করা উচিত? কী বলছেন বিবাহ অনুষ্ঠান পরিকল্পক এবং কেটারিং সংস্থাগুলি?

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ ০৯:৪৩
Share:

সঙ্কটের সময়ে বিয়ের পরিকল্পনা করবেন কী ভাবে? ছবি: সংগৃহীত।

পরিকল্পনায় ঘাটতি নেই, ঘাটতি পড়েছে জ্বালানিতে!

Advertisement

বিয়ের সব পরিকল্পনা হয়ে গিয়েছে। বাজেট কয়েক লক্ষ টাকা। ভিন্টেজ গাড়ি থেকে বর নামবে, মণ্ডপে পা রাখবে কনে। দপ করে আলো জ্বলে উঠবে চারদিকে। আলোর রোশনাইয়ে অতিথিদের চোখ ঝলসে যাবে। তার পর একে একে ২০-৩০ পদের ব্যুফের দিকে এগিয়ে যাবে অতিথির দল। পরিকল্পনায় তো খামতি নেই। কিন্তু শেষমেশ কি জ্বালানিই কম পড়বে? জ্বালানির ঘাটতি হলে যে জৌলুস নিবে ঝুপ করে আঁধার নেমে আসবে! তা হলে?

তা হলে পরিকল্পনায় কাটছাঁট করতে হবে।

Advertisement

বিয়ে তো এক বারই হচ্ছে— এই ভাবনা থেকেই বাহারি আয়োজনের শুরু হয়। কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রীই যখন কম জ্বালানি খরচের উপদেশ দিয়েছেন, তখন সে বিষয়ে দ্বিতীয় বার ভাবা উচিত। নয়তো কোভিড পরিস্থিতির মতো সঙ্কট নেমে আসতে পারে দেশে। সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনার আবহে দেশবাসীকে কৃচ্ছ্রসাধনের বার্তা দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। দেশবাসীর কাছে জ্বালানি সাশ্রয় করতে, সোনা কেনা স্থগিত রাখতে, অফিস এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম পদ্ধতি গ্রহণ করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা জড়িত অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোরও আহ্বান জানান তিনি।

পরিকল্পনায় কাটছাঁট করতে হবে। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত

এ দিকে, মেয়ের বিয়ের জন্য কত কী জাঁকজমকের পরিকল্পনা ছিল আপনার। বর-কনের বিশেষ দিন, তাঁদেরও নানাবিধ শখ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে কী ভাবে বিয়ের আয়োজন করা যায়, যেখানে আশ মিটবে, আবার দেশের অর্থনীতির উপরেও চাপ পড়বে না?

আলোকসজ্জা হোক সূর্যের শক্তিতে

কলকাতা-সহ সব বড় বড় শহরে বিয়ের আয়োজন করেন রোহন বাদোড়িয়া। মোদীর ভাষণ শোনার পর থেকেই নানা মিতব্যয়িতামূলক পদক্ষেপ করার কথা ভাবছেন তিনি। ইতিমধ্যেই নিজের কর্মচারীদের বিভিন্ন শহরের এমন ভেন্যুর সন্ধান করতে বলে দিয়েছেন, যেখানে মূলত সৌরশক্তির ব্যবহার হয়। যাতে আলো জ্বালালেও অতিরিক্ত শক্তি খরচ হবে না। রোহন জানাচ্ছেন, এমন জায়গার অভাব নেই এই রাজ্যেও। সে ভাবেই বিয়ের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। তা ছা়ড়া, এলইডি আলোর ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে, কারণ সাধারণ বৈদ্যুতিক আলোর তুলনায় প্রায় ৮৫ শতাংশ কম শক্তি খরচ হয় এতে। এখন উজ্জ্বল আলোর চেয়ে ‘মুড লাইটিং’-এর দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। তাতে বিয়েবাড়ির সজ্জায় রাজসিক ছোঁয়া লাগবে।

বাদ যাক কিছু অনুষ্ঠান

বাঙালি বিয়েতেও অবাঙালি বিয়ের নানা রকম পর্ব যোগ হয়ে গিয়েছে। ফলে দু’দিনের অনুষ্ঠান প্রায় সপ্তাহভর চলে। ফলে শক্তির খরচও বেশি হয়। দেশের নানা প্রান্তে বিদ্যুতের চাপ, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ডিজ়েলের খরচ— চারদিকে শুধু শক্তিব্যয়ের নিদর্শন। রোহন বলছেন, ‘‘আমরা পরিবারগুলিকে অনুরোধ করছি যাতে শক্তি খরচের বিষয়ে তাঁরাও ভাবেন। যেমন, বাঙালি বিয়েতে সঙ্গীতানুষ্ঠান না হলেও হয়। আর সেই অনুষ্ঠানে আলো, জেনারেটর, খাওয়াদাওয়ায় প্রচুর খরচ হয়। তা হলে অন্তত সে রকম কিছু অনুষ্ঠান যদি বাদ দেওয়া যায়, তা হলে ভাল। প্রয়োজনে গায়েহলুদের দিনই গানবাজনা, হুল্লোড় হয়ে যাক।’’ ঠিক যেমন গায়েহলুদ ও মেহন্দির অনুষ্ঠান একই দিনে রেখেছিলেন রশ্মিকা মন্দানা ও বিজয় দেবরকোন্ডা।

কিছু অনুষ্ঠান বাদ দিলে ক্ষতি কি? ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত

দিনের আলোয় আয়োজন

রাতের বিয়েতে আলোর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়। তাই এখন অনেকেই দিনে অনুষ্ঠান করার জন্য সুপারিশ করছেন। সকালে গায়েহলুদ বা মেহন্দির অনুষ্ঠান রাখা যায়, অথবা সঙ্গীতানুষ্ঠানও এমন সময়েই আয়োজন করা যায়। তা ছাড়া সূর্যাস্তে বিয়ে বা রিসেপশনের আয়োজন করলে বিদ্যুৎও বাঁচবে, বিয়ের ছবিও ভাল উঠবে। আলিয়া ভট্ট ও রণবীর কপূরও কিন্তু নিজেদের ছবি তুলিয়েছেন সূর্যাস্তের মুহূর্তে। বিয়ের লগ্ন যদি আপনার পরিকল্পনায় সায় না দেয়, তা হলে রিসেপশন সে ভাবে করা যেতে পারে। আলোকশিল্পীরাও কম আলো ব্যবহার করে ছবি তুলতে পারবেন। ফলে বিদ্যুৎ খরচ অনেকটাই কম হবে।

স্থানীয় খাবার, স্থানীয় ফুল

বিদেশি ফুল, দূরদূরান্ত থেকে আনা খাবার— এ সবের জেরে প্রচুর জ্বালানি খরচ হয়। তার চেয়ে বরং স্থানীয় ফুল, মরসুমি উপকরণ আর আঞ্চলিক মেনুর কথা ভাবা যেতে পারে। গাঁদা, রজনীগন্ধা, শিউলি, কলাপাতা— বিয়েবাড়ির সজ্জায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে এই ধরনের ফুলগুলি। খাবারের ক্ষেত্রেও বিলাসী ভিনদেশি পদের বদলে শিকড়ের সঙ্গে জুড়ে থাকলে শক্তির অপচয় কমবে। মাটির বাসন, কলাপাতায় পরিবেশন, এ সব বরং আজকের অতিথিদের জন্যও ভিন্ন অভিজ্ঞতার।

মেনুতে কাটছাঁট

সাত কেন সাতশো খুন মাফ হয়ে যেতে পারে খাবার যদি লা জবাব হয়! আবার উল্টোটাও সত্যি। পেট আনন্দ না পেলে অতিথিরা তা মনে রাখেন বহু দিন। আর তাই তো দিন দিন মেনুতে পদের সংখ্যা বাড়ছে। দেশবিদেশের খাবারদাবার ৫০০-১০০০ জনের জন্য হাজির করতে হচ্ছে কেটারারদের। এতে খাবার নষ্টও হচ্ছে, আবার জ্বালানির খরচও বাড়ছে। কলকাতার নামী কেটারিং সংস্থার কর্ণধার মনোজিৎ বসু বলছেন, ‘‘যথাসম্ভব জ্বালানি খরচ কমানোর চেষ্টায় আছি আমরা। কিন্তু সমস্যা হল, বর-কনের পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে। তাঁদের এলাহি খাবারের দাবি থাকা স্বাভাবিকও। কিন্তু এই মুহূর্তে সব রকমের খাবারের বন্দোবস্ত করতে হলে জ্বালানির খরচ হবেই। তবে তার জন্য কিছু কিছু পদক্ষেপ আমরা করেছি।’’ সঙ্কটের সময়ে মেনুতে বিরিয়ানি রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা। যা কাঠকয়লাতেও রাঁধা যায়। তা ছাড়া, খোলা আকাশের নীচে আয়োজন হলে, সেখানে কাঠকয়লায় তন্দুরের ব্যবস্থা করা যায় লাইভ কাউন্টারে। যদিও বক্তব্য, ধোঁয়াতে অনেকের অসুবিধা হয় বলে সেখানেও সমস্যা হতে পারে। তাই সে ক্ষেত্রেও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয় কেটারারদের। এ ছাড়া, টি-পাইপের সাহায্যে একটি সিলিন্ডার থেকে দু’টি বার্নারের ব্যবস্থা করছেন তাঁরা, যাতে দিনশেষে অল্প গ্যাস পড়ে না থাকে। সিলিন্ডারের সমস্ত গ্যাস যাতে খরচ হয়, অপচয় না হয়, তার জন্য এই ব্যবস্থা নিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু বর-কনেরা সাধারণত ভাজাভুজি রাখতে ভালবাসেন। আর ফ্রাই মানেই অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ। সেই বিষয়ে একটু সচেতন হলে ভাল বলে দাবি মনোজিতের। তা ছাড়া, মেনুর দৈর্ঘ্য ছোট করারও পরামর্শ তাঁর।

মেনু নিয়ে বিশেষ সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত

কলকাতার আর এক নামী কেটারিং পরিষেবার ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনামিকা বারিদ জানালেন, গত এপ্রিল মাস থেকেই সতর্ক তাঁরা। ইতিমধ্যেই রান্নার জন্য খানিকটা কাঠ, কাঠকয়লার মতো জিনিসের উপর ভরসা করছেন। তাঁর কথায়, ‘‘ভাত, বিরিয়ানি, ডালের মতো পদগুলো আমরা বায়োফুয়েলের মতো জিনিসেই রান্না করছি। তা ছাড়া বর-কনের পরিবারেরা যে ব্যাঙ্কোয়েট বুক করে, সেখানে বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের বন্দোবস্ত আছে কি না, আগে থেকেই জেনে নিচ্ছি আমরা। বাণিজ্যিক ইন্ডাকশন, বাণিজ্যিক ইনফ্রারেড ইত্যাদিতে রান্না করি আমরা।’’ মেনুতে মূলত বাঙালি খাবার রাখলে সুবিধা হয় বলে মত অনামিকার। চাইনিজ়ের মতো খাবার একবারে রান্না হয় না। ধাপে ধাপে রান্নার দরকার সেখানে। অর্ধেক রান্না করে রেখে আবার গ্যাসে চাপাতে হয়। অথচ বাঙালি রান্নায় এক বারে আগুনে বসিয়ে দিলে জ্বালানি খরচ অনেকটাই কমে, যেমন মাছের ঝোল, কষা মাংস, ডাল, তরকারি ইত্যাদি। তবে সঙ্কটের সময়ে প্রেশার কুকার ব্যবহার করেও মাংস সেদ্ধ করতে হচ্ছে অনামিকাদের।

তা ছাড়া, অনেক সময়ে অতিথির সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি রান্না হয়। ফলে খাবার নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়। আর রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুৎও অপচয় হয় একই সঙ্গে। তাই আরএসভিপি বা আগাম উপস্থিতি নিশ্চিত করার পদ্ধতি ব্যবহার করে এই অপচয় খানিক কমানো যেতে পারে। এতে পরিকল্পনা করাও সহজ হয়।

ডিজিটাল নিমন্ত্রণের জনপ্রিয়তা

কার্ড ছাপা, ক্যুরিয়ার করা, পরিবহণের বন্দোবস্ত— নিমন্ত্রণ জানানোর চিরাচরিত পন্থাও এখানে অপচয়ের জন্য ভাবাচ্ছে। এ সবের জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি খরচ হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই চোখ এড়িয়ে যায়। তাই ডিজিটাল আমন্ত্রণ এখন শুধু ট্রেন্ড নয়, বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তও বটে। অনেকেই এখন ভিডিয়ো ইনভাইট, অ্যানিমেটেড কার্ড বা ছোট ওয়েবসাইট বানিয়ে ফেলছেন নিমন্ত্রণ করার জন্য। সেই ট্রেন্ড এখন পরোক্ষে হলেও জ্বালানি বাঁচানোর কাজে আসতে পারে।

ক্লান্তিকর আড়ম্বরের পর শরীরের শক্তিক্ষয়ের পাশাপাশি জ্বালানি খরচও হয়। আর সেখানেই সতর্ক ও সচেতন হওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। বর-কনেরা তাঁদের আগামী জীবনের কথা ভেবেই বিয়ের অনুষ্ঠানে বিকল্প ও কাটছাঁটের কথা ভেবে দেখতে পারেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement