অনলাইন গেমিংয়ের আসক্তিতে কি শেষ হচ্ছে শৈশব? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
অনলাইন গেমের আসক্তিই কেড়ে নিল ১২, ১৪ এবং ১৬ বছর বয়সি তিন নাবালিকার প্রাণ। অনলাইনে গেম খেলার ব্যাপারে বাবা-মায়ের বারণ মেনে নিতে না পেরে ১০তলা থেকে একসঙ্গে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করল তিন বোন। ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরপ্রদেশের গাজ়িয়াবাদে। এখন অনলাইন গেমের নেশায় বুঁদ কমবয়সিরা। বাসে, ট্রেনে, মেট্রোয়— সর্বত্রই মোবাইলে গেম খেলতে ব্যস্ত তারা। অনলাইনে গেম খেলায় তারা এতটাই বুঁদ থাকে যে, চারপাশে কী ঘটছে তার খেয়াল থাকে না। এই গেমের আসক্তি এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে, দুরত্ব তৈরি হচ্ছে তাদের বাবা-মায়েদের সঙ্গে। বাবা-মা বারণ করলেই তাঁরা এখন শত্রু। এই মোবাইল-নির্ভর জীবনে কতটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে অভিভাবকত্ব?
প্রতিনিয়ত মুঠোফোন কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনের মাধ্যমে যে অবিরাম কন্টেন্টের প্লাবনে ভাসছে মন আর মাথা, তা আসলে অকেজো করে দিচ্ছে চিন্তাশক্তি, স্মৃতিশক্তি, একাগ্রতা ও আরও অনেক কিছু। এককথায়, অলস মস্তিষ্কে পচন ধরছে, এমনটাই মত মনোসমাজকর্মী মোহিত রণদীপের। তিনি বলেন, ‘‘ফোনের আসক্তি কিন্তু এক দিনের নয়, আর এই আসক্তি ধরানোর ক্ষেত্রে বড়দের বড় ভূমিকা থাকে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ১ বছরের কম বয়স থেকেই শিশুদের হাতে ফোন ধরানো হচ্ছে। বড়দের প্রশ্রয় পেয়েই শিশুদের মোবাইলের প্রতি নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে, আর তা না পেলেই তারা হিংস্র আচরণ শুরু করছে। এখন একাদশ শ্রেণিতে উঠলেই সরকারের তরফ থেকে পড়ুয়াদের হাতে ফোন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার কি সত্যিই খুব প্রয়োজন আছে? মোবাইল ছাড়া কি আমরা পড়াশোনা করিনি!’’
এখন শিশুদের সোশ্যালাইজ়িংয়ের সুযোগ কম। তারা বাইরে খেলতে বেরোয় না। তাদের উপর পড়াশোনার বোঝা বেড়ে যাওয়ায় বিকেলের খেলার আর তেমন কোনও অস্তিত্বই নেই তাদের জীবনে। মনোসমাজকর্মী বলেন, ‘‘খেলাধূলোর মাধ্যমে শিশুরা হারতেও শেখে। চাইলেই যে সব কিছু পাওয়া যায় না, এই বোধ তৈরি হয় তাদের মধ্যে। তবে দুঃখের বিষয়, এখন খুদেরা প্রাণ খুলে খেলতে পারে না। এই সমস্যা কিন্তু আর কোনও বাড়ির পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি এখন সামাজিক সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে।’’
ছোটদের মুঠোফোনের আসক্তি কখনও কখনও এতটা প্রবল যে, বাবা-মায়ের সঙ্গও চায় না অনেক শিশু। তার চাইতে পছন্দ একান্তে সময় কাটাতে। এটাকে বলা যেতে পারে 'স্ক্রিন অ্যাডিকশন', যা শিশুদের মগজ ধোলাই করছে। মোবাইলের প্রতি আসক্তি শিশুদের স্বপ্ন আর কল্পনার পরিসর কেড়ে নিচ্ছে। তারা ভাবতেও ভুলে যাচ্ছে। মোবাইল-মগ্নতা যতটা আনন্দ দেয় ছোটদের, সেখানে চিন্তাশক্তির প্রয়োজন পড়ে কম। এতে অনেকটা সময় ধরে ছোটরা শুধু দেখছে, ভাবছে না, ফলে সেই সময়ে তাদের মস্তিষ্ক কম সক্রিয় থাকছে। এতে ছোটদের চিন্তাশক্তির বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। এইখানেই লুকিয়ে আছে মোবাইলের বিপদ। এ বিষয় এখনওই সতর্ক না হলে সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে বাবা-মায়েদের জন্য, এমনটাই মত যাদবপুর বিদ্যাপীঠের শিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্যের। পার্থপ্রতিম বলেন, ‘‘এখনকার দিনে অভিভাবকত্ব ভীষণ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন শিশুরা বড়ই অস্থির, ধৈর্য কারও নেই। কোভি়ড পরবর্তী যুগে মোবাইল আসক্তি, অনলাইন গেমিংয়ের বাড়বাড়ন্ত ছাত্রসমাজ আর যুবসমাজকে শেষ করে দিচ্ছে। তাদের রাগ, ক্ষোভ অস্বাভাবিক রকম ভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এই সমস্যার মোকাবিলার জন্য শিক্ষক আর বাবা-মায়েদের ধৈর্য বাড়াতে হবে। শিশুদের সমস্যাটা আমাদের বুঝতে হবে। তাদের সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আর অভিভাবকদের বলব, দয়া করে শিশুদের সময় দিন। বাবা-মায়েদের তরফে তাঁদের সন্তানের সঙ্গে কথা বলার জন্য দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় বার করতেই হবে। শিশু যা চাইছে, সেটাই তাদের হাতে তুলে দেওয়া কিন্তু সঠিক নয়। এতে শিশুদের অভ্যাস খারাপ হচ্ছে। সব চাইলেই পাওয়া যায় না, এই বোধটা শিশুর মধ্যে তৈরি করতে হবে।’’
প্রথম শ্রেণিতে পড়ে অন্যন্যা রায়। তার মা অর্পিতা রায়ের মতে মেয়ে, অত্যধিক পরিমাণে মোবাইল-নির্ভর হয়ে পড়েছে। ফোন না পেলেই প্রচুর কান্নাকাটি করছে, জেদ দেখাচ্ছে। অর্পিতা বলেন, ‘‘আমি আইটি ফার্মে কাজ করি। আমার স্বামী রণজিৎ পেশায় উকিল। ছোট থেকে কাজের কারণেই মেয়েকে খুব বেশি সময় দিতে পারি না আমরা দু'জনে। বাড়িতে ঠাকুমা-দাদু আর একজন পরিচারিকার সঙ্গেই মেয়ের দিনের বেশির ভাগ সময়টা কাটে। ছোটবেলায় অল্পস্বল্প কার্টুন দেখত খাওয়ার সময়, তবে কখন যে সেটা ওর আসক্তি হয়ে উঠেছে, বুঝতেই পারিনি। এখন ফোন না দিলেই ও জেদ করে, খাবার ছুড়েও ফেলে দিয়েছে এক দিন। অনেক ভাল ভাবে ওকে বোঝাই। মাঝেমধ্যে বকুনিও দিই। তবে এই সমস্যার সমাধান কিছুতে হচ্ছে না।’’
এখনকার বেশির ভাগ শিশুর মোবাইলের প্রতি আসক্তির বিষয়ে দমদম অরবিন্দ বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষক অসীমকুমার নন্দ বলেন, ‘‘শিশুদের মোবাইল আসক্তি দূর করার জন্য বাবা-মায়েদের যেমন সচেতন হওয়া জরুরি, তেমনই তাদের শিক্ষাকেন্দ্রগুলিকেও দায়িত্ব নিতে হবে। স্কুলে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুদের মনের কথা বুঝতে হবে। ওদের সমস্যা বুঝে বাবা-মায়েদের সে বিষয় সতর্ক করতে হবে। স্কুলগুলি দায়িত্বশীল না হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’’
সমাধান কোন পথে?
সমস্যা বড়। শিশুদের মোবাইলের আসক্তি, ইন্টারনেটের আসক্তি, অনলাইন গেমের আসক্তি কমাতে এখনই যদি বাবা-মায়েরা সতর্ক না হন, তা হলে উত্তরপ্রদেশের মতো ঘটনা আরও ঘটতে থাকবে, এমনটাই মত মনোবিদদের। শিশুর হাতে মোবাইল একেবারেই দেবেন না, এ কথা ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে বলা সম্ভব নয়, এমনটাই মত মনোবিদ অনন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের। অনিন্দিতা বলেন, ‘‘মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় বেঁধে দিতে হবে। বাবা-মায়েরা যদি সময় না-ও পান, তা হলে বাড়িতে একজন কাউকে রাখতে হবে, যিনি এ বিষয় শিশুর উপর নজরদারি করবেন। এর পাশাপাশি শিশুরা যা দেখে, তা-ই শেখে। তাই বাবা-মায়েদেরও বাড়িতে ঢোকার পর বিনোদনের উদ্দেশ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। শিশুদের কাছে দুঃখ-সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হল ইন্টারনেট, এমন ভাবাটাই ঠিক নয়। তাদের অন্য জিনিসে ব্যস্ত রাখতে হবে।’’
মোবাইলের আসক্তি বাড়তে থাকলে শিশুদের মধ্যে বেশ কিছু বদল চোখে পড়ে। তাদের পড়াশোনায় মন বসে না, কোনও কাজ করতে বড্ড বেশি সময় লাগায় তারা। অতিরিক্ত জেদ, রাগের মতো উপসর্গ তো আছেই। এই সব লক্ষণগুলি শিশুর মধ্যে আসতে শুরু করলেই বাবা-মায়েদের সতর্ক হতে হবে। অনিন্দিতার মতে, ‘‘বাবা-মা যদি শিশুর মোবাইল তথা ইন্টারনেট আসক্তি দূর করতে না পারেন, তা হলে তাঁদের উদ্যোগ নিয়ে সন্তানকে মনোবিদের কাছে নিয়ে আসতে হবে। এটা অনেকেই অবহেলা করেন, আর তাতেই কিন্তু সমস্যা অনেকখানি বেড়ে যায়।’’
রাজ চক্রবর্তীর পরিচালিত ‘হাবজি গাবজি’ ছবিতে শিশুদের অনলাইন গেমিংয়ের প্রতি চরম আসক্তির আর সেই আসক্তি দূর করতে বাবা-মায়ের ভোগান্তির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। সমস্যার কথা ধুলে ধরলেও সমাধানের পথ সে ভাবে দেখানো হয়নি ছবিতে। সমস্যা এখন আর একটি বাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যানসারের মতো ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে। এখনই সতর্ক না হলে কিন্তু অনেকটা দেরি হয়ে যাবে।