Yoga Practice

যোগ বনাম আসন! যোগাভ্যাসের সহজ পাঠ দিতে মুঙ্গের থেকে কলকাতায় নিরঞ্জনানন্দ সরস্বতী

যোগচর্চা মানেই অনেকে ভেবে নেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরিয়ে আসন-প্রাণায়াম অভ্যাস। তা কিন্তু নয়। তবে তা কী, কলকাতাবাসীকে শেখাতে মুঙ্গের থেকে এলেন বিশ্বখ্যাত যোগগুরু নিরঞ্জানন্দ সরস্বতী।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ ২৩:০৮
Share:

যোগচর্চা ও আসন এক নয়, যোগবিদ্যা আসলে কী তা বোঝালেন স্বামী নিরজানন্দ। ছবি: সংগৃহীত।

যোগচর্চা আর আসন কি এক? যোগাভ্যাস মানে ভেবেই নেওয়া হয় নানা রকম আসনের অভ্যাস বা প্রাণায়াম। তা কিন্তু নয়। আসন শুধুই শারীরিক কসরত আর যোগচর্চা এক বিস্তৃত অধ্যায়। সেখানে আসন, প্রাণায়াম, ধ্যান, মন্ত্রপাঠ ও সাধনার নানা স্তর আছে। যোগাভ্যাস আর যোগাসন আসলে কী, কোথায় মিল আর কোথায়ই পার্থক্য, তার সহজ পাঠ দিতে মুঙ্গেরের ‘বিহার স্কুল অব যোগ’ থেকে কলকাতায় এসেছেন যোগগুরু স্বামী নিরঞ্জনানন্দ সরস্বতী।

Advertisement

কলকাতার সঙ্গ যোগচর্চার সম্পর্ক অতি প্রাচীন। শ্যামাচরণ লাহিড়ী, পরমহংস যোগানন্দ, যুক্তেশ্বর গিরি, বিষ্ণুচরণ ঘোষ, বুদ্ধ বসু মতো প্রসিদ্ধ যোগগুরু ও যোগাচার্যদের নাম জড়িয়ে রয়েছে। এ শহরের যোগমাহাত্ম্য দেখে আগেও একবার কলকাতায় এসেছিলেন যোগগুরু নিরঞ্জনানন্দ। ১২ বছর পরে ফের শহরে এলেন তিনি। নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে শুক্রবার ২৬ জুন থেকে রবিবার ২৮ জুন অবধি চলবে যোগ সাধনা সত্র। সেখানে যোগবিদ্যার নিয়ম শেখাবেন প্রসিদ্ধ যোগগুরুরা।

বিহারের এই যোগ প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন স্বামী সত্যানন্দ। তাঁরই শিষ্য ও যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে যোগসাধনার মাহাত্ম্য গোটা বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন স্বামী নিরঞ্জনানন্দ। শেখাচ্ছেন যোগচর্চার অর্থ ও যোগসাধনার সঠিক কৌশল। ২০১৭ সালে তিনি পদ্মভূষণ পান। দেশ-বিদেশে বিহার স্কুল অব যোগের যে খ্যাতি, তা হয়েছে তাঁর হাত ধরেই। দশ বছর বয়সেই দশনামী সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন স্বামী নিরঞ্জনানন্দ। তখন থেকেই জীবনকে বেঁধে ফেলেন কঠোর নিয়মে। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকায় যোগের প্রচার শুরু করেন। তাঁর যোগনিদ্রা দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করে। বিহার স্কুল অব যোগ, শিবানন্দ মঠ ও যোগ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শুরু হয় ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতির প্রচার।

Advertisement

যোগগুরু স্বামী নিরঞ্জনানন্দ।

যোগের আসল অর্থ কী?

যোগ কথাটি এখন আর অপরিচিত নয়। যোগাসন বা যোগচর্চা দেশ-বিদেশ ঘুরে এখন বহুজনের অন্দরমহলেও ঠাঁই পেয়েছে। স্বামী নিরঞ্জনানন্দ যোগকে কেবল গুটিকয়েক আসন ও প্রাণায়ামে বেঁধে ফেলতে রাজি নন। যোগ ও আসন এক নয়। দৃঢ়ভাবে এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করেছেন যোগগুরু স্বামী নিরঞ্জনানন্দ সরস্বতী। বলেন, ‘‘যোগবিদ্যা আর আসন এক নয়। হাত-কান-নাক যেমন শরীর নয়, তার নানা অঙ্গ। তেমনই যোগবিদ্যা এক বিস্তৃত অধ্যায়। তারই নানা অংশ হল আসন, প্রাণায়াম। যোগ কোনও ধর্মের প্রচার নয়, মোক্ষ বা ত্যাগের পথ নয়। কোনও দর্শনও নয়। যোগ এক অনুশাসন যা শরীর ও মনের মধ্যে সামঞ্জস্য ঘটায়।’’

যোগ বনাম আসন

যোগের ব্যাপ্তি অনেক বড়। প্রথম, যোগ সূত্র। পতঞ্জলির এই দর্শনটি এতই দুরূহ যে সাধারণ মানুষের বোধের বাইরে। দুই, অলৌকিক যোগ যেখানে যোগবলে বা মন্ত্র পাঠ করে অতীন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী হওয়া যায় বলে ব্যাখ্যা করা হয়। তিন, শারীরিক যোগ। এটি হঠযোগ, তান্ত্রিক যোগ ও প্রাণায়ামের এক রকম মিশ্রণ। যোগগুরু শেখালেন, এত জটিলতার প্রয়োজন নেই। কেবল আসন-সর্বস্ব হয়ে থাকলে শরীরের উন্নতি হবে না। এর জন্য জরুরি যৌগিক জীবনশৈলী। দৈনন্দিন জীবনে যোগচর্চাকে এমন ভাবে মিলিয়েমিশিয়ে দেওয়া যে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে শুতে যাওয়া অবধি, শরীর ও মনের নিয়ন্ত্রণ থাকে। যোগচর্চা অর্থে শুধু আসন বা প্রাণায়াম নয়, সেখানে ধ্যান, মন্ত্রপাঠ, সাধনার নানা স্তরও রয়েছে। বিষয়টা ঠিক কেমন?

দিনের শুরুটা হবে দিনচর্চা দিয়ে। যোগগুরুর পরামর্শ, প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে সবাই ছুটছে। এক মিনিট বিশ্রামের সময়ও নেই। এতে শরীর যতটা ক্লান্ত হচ্ছে, তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত হচ্ছে মন। এর থেকে নিস্তার পেতে তিনটি কাজ করতে হবে— ১) দিনচর্চা ২) মিতাহার ৩) সঠিক সময়ে ঘুম। দিনচর্চায় ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসেই মিনিট দশেক ধ্যানে মনশুদ্ধি করতে হবে। দৈনন্দিক কাজ শেরে প্রাতরাশের আগে ফের একবার ধ্যান ও মন্ত্রপাঠে শরীর ও মন দুয়েরই ব্যায়াম হবে। প্রাতরাশের পরে আরও একবার ধ্যান করলে ভাল। একই রকম কাজ থেকে ফিরে রাতে শোয়ার আগেও করতে হবে। এর পর রয়েছে খাওয়ার পালা। শরীরে পুষ্টি জোগাবে এমন খাবারই খেতে হবে। কোনও রকম বাইরের বা মশলাদার খাবার নয়। তিন নম্বর হল ঘুম। যোগগুরুর পরামর্শ, ভোর ৪টে উঠতে হবে এমন নিয়ম নেই। তবে চেষ্টা করতে হবে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ওঠার ও নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোতে যাওয়ার। যদি সকালে উঠে সূর্যোদয় দেখতে পারেন, তা হলে সবচেয়ে ভাল হয়।

যোগাভ্যাস আর যোগাসন কি এক?

যোগ ক্যাপসুল

অবসাদ, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে জয় করার কৌশল ‘যোগ ক্যাপসুল’। তা শেখালেন যোগগুরু নিরঞ্জনানন্দ। এর অর্থ হল, ছোট ছোট ভাগে যোগচর্চাকে জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া। যেমন, সকালে ১০ মিনিট মন্ত্রের সাধনা (১১ বার মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র, ১১ বার গায়ত্রী মন্ত্র, ৩ বার দুর্গামন্ত্র) করতে হবে।

দৈনিক কাজের পরে ১০ মিনিট আসন অভ্যাস করা যেতে পারে। সব আসন নয় চার থেকে পাঁচটি আসনই যথেষ্ট— পবনমুক্তাসন, তাড়াসন, মার্জারাসন ও সূর্য নমস্কার। শীর্ষাসন বা ময়ূরাসন করতেই হবে তা নয়। কম সংখ্যক ও সঠিক আসন অভ্যাসেই শরীর ভাল থাকবে।

এর পরের কাজ হল প্রাণায়াম। সেটি অফিসে গিয়ে ডেস্কে বসেও করতে পারেন, আবার ফিরে এসে সন্ধ্যাতেও করতে পারেন। এর জন্যেও সময় বরাদ্দ ১০ মিনিট। প্রাণায়াম মানেই এখন ইউটিউবে নানা ধরনের জটিল কৌশল শেখানে হয়। তা করার প্রয়োজন নেই। যোগগুরুর পরামর্শ, দু’ধরনের প্রাণায়ামেই যাবতীয় অবসাদ, উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা দূর হবে। প্রথম অভ্যাস করতে হবে নাড়ি শোধন প্রাণায়াম, এর পরে ভ্রামরী প্রাণায়াম। নিয়ম করে দু’টি প্রাণায়াম অভ্যাসেই সুফল পাওয়া যাবে।

এর পরের ধাপ হল যোগ-নিদ্রা বা শরীর শিথিলকরণ। সেখানে শবাসন থেকে শুরু করে নানা পদ্ধতি আছে। যোগ-নিদ্রায় শরীর ও মনের উপর নিয়ন্ত্রণ আসে। এতে যেমন নীরোগ থাকা যায়, তেমনই মনের শান্তি ও স্থিতিও বজায় থাকে।

যোগ ‘লাইফস্প্যান’-এর পাঠ দেয় না। যোগের আসল অর্থ হল ‘হেলথস্প্যান’। অর্থাৎ, সুস্থ জীবনকাল বা রোগমুক্ত আয়ুষ্কাল। জিমে গিয়ে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে করা ব্যায়ামে তা হয় না। যন্ত্রের ব্যায়ামে পেশির প্রদর্শন হয়, মনের শান্তি ফেরে না। কিন্তু যোগচর্চায় শরীর ও মন দুইই সবল থাকে। আপনি কত বছর বেঁচে রয়েছেন তা জরুরি নয়। কত বছর সুস্থ ও রোগমুক্ত ভাবে বেঁচে আছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ। যৌগিক জীবনশৈলী এই শিক্ষাই দেয়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement