নামে কী আসে যায়— এ কথা অন্তত আমের ব্যাপারে বলা যাবে না। আম-ভক্তদের কাছে তো একেবারেই নয়। কারণ, তাঁরা আম খান, খাওয়ান এবং বাজারে গিয়ে আম কেনেনও নাম দেখেই। নাম দিয়েই চিনে রাখেন আমের স্বাদ-গন্ধ-আদল। তা ছাড়া বঙ্গদেশে আম আছেও নানা নামের। রয়েছে সেই সব নামের পিছনে নানা রকম গল্পও।
হিমসাগর-ফজলি-ল্যাংড়ার নাম নয় জানেন। কিন্তু তাদের নামকরণের গল্প জানা আছে কি? শুনেছেন কি তুলোয় মোড়ানো এক বিশেষ আমের গল্প? কিংবা এমন আম, যা কেবল রানিদের খাওয়ার জন্যই ফলানো হত? চেনা-অচেনা সেই সব আমের সঙ্গেই হোক পরিচয়।
ফজলি। চেনা নাম। তবে খাঁটি মালদহের ওই আমের নামকরণের গল্পটি তত চেনা নয়। শোনা যায়, ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে এক ব্রিটিশ কালেক্টর সাহেব কর আদায়ের জন্য গৌড়ে যাওয়ার পথে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। জল খেতে চান গ্রামের এক মহিলার কাছে। সেই মহিলার নাম ছিল ফজলু বিবি। তিনি তাঁর উঠোনের আম গাছের আম দিয়ে সাহেবকে আপ্যায়ন করেন। আম খেয়ে সাহেব এতটাই তৃপ্ত হন যে, সে আমের নাম ছড়িয়ে পড়ে 'ফজলু বিবির বাগানের আম' বলে। যা পরে অপভ্রংশে হয় ফজলি।
লক্ষ্মণভোগ। এই আম জিআই ট্যাগ প্রাপ্ত। চাষ হয় মালদহ জেলার ইংরেজবাজার এবং রতুয়া অঞ্চলে। তবে এ আমের সঙ্গে রামায়ণের লক্ষ্মণের কোনও সম্পর্ক নেই। সোনালি হলুদ রঙে সিঁদুরে আভার এই আম দেখতে আকর্ষণীয়। শাঁসও অন্য আমের চেয়ে কিছুটা কঠিন। চট করে নরম হয়ে নষ্ট হয় না। তাই রফতানির জন্য আদর্শ। লোকমুখে শোনা যায়, ওই আমের প্রজাতি প্রথম দেখা যায় মালদহের ইংরেজ বাজারের চণ্ডীপুরের বাসিন্দা এক আমচাষি লক্ষ্মণ রায়ের বাগানে। পরে তাঁর নামেই ওই আমের নাম হয় লক্ষ্মণভোগ।
হিমসাগর। বাংলার আমের অঘোষিত সম্রাট বলা যায় একে। প্রচলিত কাহিনি বলেছে, এই আম প্রথম ফলতও বাংলার নবাবের বাগানে। নদীয়ার শান্তিপুর ও মুর্শিদাবাদে একই সময়ে এই আমের চাষ শুরু হয়। তীব্র গরমে ওই আম খেয়ে শরীর-মনে শীতল অনুভূতি বা হিমেল ভাব নামত বলেই নবাবেরা ওই আমের নাম রেখেছিলেন ‘হিমসাগর’।
কোহিতুর। কোনও জিনিস অতিরিক্ত স্পর্শকাতর হলে তাকে ব্যঙ্গ করে বলা হয়, ফুলের ঘায়ে মূর্চ্ছা যায়! এই আমের ক্ষেত্রেও তা বলা চলে। কোহিতুর এতটাই নরম আম, যে গাছ থেকে পাড়ার সময় নীচে জাল পেতে রাখতে হয়, তার পরে তা রাখা হয় তুলোয় মুড়ে। সাধারণ ছুরি দিয়ে ওই আম কাটলে নষ্ট হয়ে যায় স্বাদ। এক কালে ওই আম কাটার জন্য হাতির দাঁতের ছুরি ব্যবহার হত। পরে বাঁশের ছুরি ব্যবহার করা হয়। নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লার আমলে ওই আমের কলমটি তৈরি করা হয়েছিল। বিরল জাতের আম বলে বিরল হিরে কোহিনুরের অনুকরণেই নামকরণ হয় ওই আমের। এমনই বিশ্বাস অনেকের।
নবাবপসন্দ। মুর্শিদাবাদের নবাবি আমবাগানে জন্ম বিরল জাতের এই আমের। এক অন্য রকম সুগন্ধের জন্য মুর্শিদাবাদের নবাব আসফ উদ-দৌলা এবং তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের নৃপতিদের অত্যন্ত প্রিয় বা পছন্দের ছিল ওই আম। এতটাই যে, তার নামই রাখা হয় 'নবাবপসন্দ'। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকা ওই আম কেবল রাজপরিবারের সদস্যদের আপ্যায়নে পরিবেশন করা হত।
রানিপসন্দ। নামেই বোঝা যায় রানিদের পছন্দের আম। কিন্তু নানা রকমের স্বাদু আম ছেড়ে এই আমটিই কেন পছন্দের ছিল রানিদের? ইতিহাস বলছে, নবাবের বেগম বা রানিদের ওই আমের সুবাস অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তবে শুধু সেটিই কারণ নয়। আম খেতে গেলে মুখ বা হাতে যে ভাবে রস লেগে যায়, তা রানিদের পছন্দ ছিল না। রানিপসন্দের শক্ত শাঁসের কারণে তেমন হত না। তাই রানিরা ওই আম স্বচ্ছন্দে খেতে পারতেন। সেই থেকেই নামকরণ।
ল্যাংড়া। এর আদি উৎস উত্তরপ্রদেশের বেনারস। তবে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদেও অত্যন্ত উন্নত মানের ল্যাংড়া আম পাওয়া যায়। আমের এমন নামকরণের নেপথ্যে একটি প্রচলিত কাহিনি রয়েছে। শোনা যায়, বেনারসের এক খঞ্জ সাধু তাঁর কুটিরে ওই আমের গাছের পরিচর্যা করতেন। সেই সাধুর ভাঙা পায়ের কারণেই সাধারণ মানুষ আমটিকে ‘ল্যাংড়ার আম’ বলতে শুরু করেন। সেখান থেকেই ওই নাম। পরবর্তী কালে বাংলার নবাব ও জমিদারেরা ওই গাছের চারা এনে মালদহ ও মুর্শিদাবাদে রোপণ করেন।
গোলাপখাস। গোলাপখাস আমের বিশেষত্ব এর সুগন্ধে। ওই আম কাটলেই গোলাপজলের গন্ধ পাওয়া যায়। দিল্লির মোগল সম্রাট এবং পরবর্তী কালে মুর্শিদাবাদের নবাবের মহলে গোলাপজলের প্রতিও বিশেষ টান ছিল। বিহার এবং বঙ্গের ওই আমে গোলাপের প্রাকৃতিক সুবাস পেয়ে তাঁরা আমটির ভক্ত হয়ে পড়েন। গোলাপখাস আমের লাল গোলাপের মতো আভা দেখে এবং তার গন্ধে মিল পেয়েই নবাবেরা ওই আমের নাম দিয়েছিলেন ‘গোলাপখাস’।
সূর্যপুরী আম। উত্তর দিনাজপুরের এই আমের আদি উৎসস্থল বর্তমান বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলা। সেখানেই ২০০ বছরের পুরনো এক বিশাল সূর্যপুরী আমের গাছ রয়েছে। যাকে এশিয়ার বৃহত্তম আমগাছ বলেও দাবি করেন অনেকে। স্থানীয় মানুষজনের মতে, গাছটি যে এলাকায়, এক কালে তার নাম ছিল সূর্যপুর। তার থেকেই আমের ওই নামকরণ হয়।
আম্রপালি। এই আম কৃষিবিজ্ঞানীদের হাতে তৈরি। এটি দশেরি এবং ও নীলম আমের সংকর প্রজাতি। প্রাচীন ভারতের বৈশালীর বিখ্যাত রাজ নর্তকী ‘আম্রপালি’-র নামানুসারে ১৯৭৮ সালে বিজ্ঞানীরা আমটির নামকরণ করেন। যুক্তি ছিল, ওই নর্তকীর সৌন্দর্যের মতোই আমটির রূপ এবং গুণ অনন্য। আম্রপালি গাছের আকার বেশ ছোট প্রকৃতির হয়, তাই বাড়ির ছাদে বা ছোট বাগানেও চাষ করা যায়। এর শাঁসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ এবং ক্যারোটিন থাকে।
মল্লিকা। লেবু, তরমুজ এবং মধু এই তিন রকম স্বাদের মিশেল রয়েছে মল্লিকা আমে। আকারে বেশ বড় এবং লম্বাটে। অথচ আঁটি খুব ছোট আর পাতলা। ফলে শাঁসের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে মল্লিকা আমে। গবেষণাগারে হাইব্রিড প্রযুক্তিতে তৈরি ওই আম সহজে নষ্টও হয় না। শোনা যায় ১৯৭২ সালে ওই আম তৈরি করেছিলেন কৃষিবিজ্ঞানী রামনাথ সিংহ। আর তার নামকরণ করেছিলেন তাঁর পছন্দের শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী মল্লিকা সারাভাইয়ের নামে।
চৌসা। পড়শি রাজ্য বিহারের বক্সার জেলার চৌসা টাউনে জন্ম। স্থানের নামেই আমের নাম। তবে আর একটি তত্ত্ব বলছে, ১৫৩৯ সালে চৌসার যুদ্ধে শেরশাহ সুরি মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করার পর আনন্দ উৎসবে ওই আম খেয়েছিলেন এবং খুশি হয়ে আমের নাম রেখেছিলেন ‘চৌসা’।
গোপালভোগ। আকারে ছোট, অথচ আঁটি কিছুটা বড়। কিন্তু স্বাদের নিরীখে ল্যাংড়ার পরেই গোপালভোগকে রাখেন আমপ্রেমীরা। কথিত আছে, মালদহের এক জমিদার তাঁর গৃহদেবতা ‘গোপাল’ বা কৃষ্ণের ভোগের জন্য আমটি উৎসর্গ করেছিলেন। স্বাদের জন্যই একে দেবভোগ্য বলে মনে করা হত। সে জন্যই নাম রাখা হয় ‘গোপালভোগ’। তবে অন্য একটি মতে, ইংরেজবাজারে নরহাট্টার গোপাল নামের এক আমচাষির নামেই নামকরণ হয় ওই আমের।
তোতাপুরী। দক্ষিণ ভারতে জন্ম হলেও এ আমের বিপুল চাষ হয় বাঁকুড়া, পুরুলিয়া মুর্শিদাবাদে। হালকা টক-মিষ্টি স্বাদ। শাঁস কিছুটা শক্ত। তবে এর আসল বৈশিষ্ট্য আকৃতিতে। আমের নীচের দিকটি তোতাপাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো আর লালচে হয় বলেই আমের নাম তোতাপুরী।
কালীভোগ। কালচে রঙের আম। কাঁচা অবস্থায় এর খোসা কালচে সবুজ থাকে। পাকার পরেও সেই কালচে ভাব থেকে যায়। নামকরণের একটি কারণ সেটি তো বটেই। তবে লোকমুখে শোনা যায়, কালীর পূজার সময় বা জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যায় দেবীর চরণে অর্পণ করার জন্য ওই আম ব্যবহার করা হত। সেই কারণেই নাম হয়েছে কালীভোগ।
গুটি। আকারে বেশ ছোট। কাঁচা অবস্থায় অত্যন্ত টক আবার পাকলে খুব মিষ্টি। মালদহের এক আমচাষি ওই আম খেয়ে তার আঁটি পুঁতেছিলেন নিজের বাগানে। আঁটি বা গুটি থেকে গাছটি জন্মায় বলেই ওই আমের নাম হয়ে যায় 'গুটি আম'।
বোম্বাই। মুম্বই থেকেই এই আমের নামকরণ। ১৯ শতকে ভারতের তৎকালীন বোম্বাই বন্দর থেকে যখন চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকেদর জামাইকায় পাঠানো হচ্ছিল, তখনই এই আমের চারা পৌঁছয় আফ্রিকার শহরে। ভারতীয় ফল জামাইকার মাটিতে এক নতুন স্বাদ ও গন্ধের আমের জন্ম দেয়। যা অনেক বেশি রসালো এবং নরম শাঁসের। তৎকালীন বম্বে থেকে আসা বীজ থেকে জন্মানো গাছের ফলের নামও দেওয়া হয় 'বোম্বাই'।
মোলামজাম। মুর্শিদাবাদের নবাবজাদা কাজেম আলি মির্জার বাগানে ওই আম হত। আমের শাঁস এতই মোলায়েম যে, পাকার সঙ্গে সঙ্গেই গাছ থেকে পেড়ে খেয়ে ফেলতে হত। আমের নাম 'মোলামজাম' হওয়ার কারণও সেটিই। শোনা যায়, ওই আম পাকার নিখুঁত সময়টিতে নজর রাখার জন্য বিশেষ পেয়াদাও মোতায়েন করা হত নবাবের বাগানে।
চম্পা। মুর্শিদাবাদের আম। চম্পা আমের গন্ধ চম্পক বা চাঁপা ফুলের মতোই মিষ্টি। তবে নামকরণের কারণ সেই গন্ধ নয়, এক সুন্দরী নারী। তাঁর নাম চম্পা। তিনি ছিলেন মোগল দরবারের গণিকা। যাঁর রূপে মুগ্ধ হয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাব। তাঁরই নামে আমের নামকরণ হয় 'চম্পা'।
বৈশাখী। আম পাকার সময়েই নামকরণ আমের। অধিকাংশ আমই পাকতে শুরু করে জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি সময় থেকে। তবে এই আমটি চৈত্র মাসের শেষ বা বৈশাখ মাসের শুরুতেই পেকে যায়। গ্রীষ্ম ঋতুর প্রথম মাসেই আম খাওয়ার আশ মেটায় বলে বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম মাসের নামেই এর নাম।
সিঁদুরি। দেখে মনে হবে পাকা আমের গাঢ় হলুদ রঙের উপর অনেকখানি সিঁদুর ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ। এতটাই গাঢ় লাল রং। সেই রঙের জন্য আমের অমন নাম।
আশ্বিনা। এই আমের নামও বাংলা মাসের নামেই। প্রায় সমস্ত আম যখন বাজার থেকে যেতে বসেছে, তথন এই আম পাকে। বর্ষা পর্যন্ত গাছেই থাকে আশ্বিনা। পাকে শরতে। ভাদ্র-আশ্বিন মাসই এই আম পাকার সময়। সেপ্টেম্বরেও এই আম পাওয়া যায়।