আবার আলোচনায় ব্রিটেনের তরুণী-কিশোরীদের জীবন ছিঁড়ে খাওয়া পাক ‘গ্রুমিং গ্যাং’। ইংলিশ চ্যানেলের পারে দাপিয়ে বেড়ানো পাকিস্তানের সেই গ্যাং অনেক দিন ধরেই চিন্তার কারণ ব্রিটেনের জন্য! তাদের ভয়ে কাঁটা ব্রিটিশ শৈশব। অভিযোগ, নাবালক-নাবালিকাদের যৌন নির্যাতন থেকে শুরু করে মাদকাসক্তি বা ধর্ম পরিবর্তন, কিছুই নাকি বাকি রাখে না পাক দুষ্কৃতীরা।
ব্রিটিশ পুলিশ একে সংগঠিত অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই দলের সদস্যদের নিশানায় মূলত স্কুল বা শিশু আবাসিক কেন্দ্রগুলি থাকে। সেখানেই গাড়ি এবং বিভিন্ন উপহার নিয়ে ঘোরাঘুরি করেন তাঁরা। ‘গ্রুমিং গ্যাং’য়ের মধ্যে এমন কয়েক জন রয়েছেন, যাঁরা কথাবার্তায় বেশ পটু। নাবালক-নাবালিকাদের সঙ্গে দ্রুত বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলেন তাঁরা। এর পর চকোলেট এবং বিভিন্ন উপহার দিয়ে তাদের বিশ্বাস অর্জন করেন।
শেষে ওই কিশোর বা কিশোরীকে মদ-সিগারেট এবং অন্যান্য মাদকের নেশা ধরান তাঁরা। শেষ ধাপে তাদের তুলে নিয়ে গিয়ে চলে যৌন নির্যাতন। এর পাশাপাশি ‘গ্রুমিং গ্যাং’য়ের বিরুদ্ধে রয়েছে ধর্মান্তরণের অভিযোগও।
নতুন বছরের গোড়ায় এই ইস্যুতে ব্রিটেনের কিয়ের স্টার্মার সরকারকে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ বলে সুর চড়ালেন আমেরিকার ধনকুবের শিল্পপতি ইলন মাস্ক। হ্যারি পটার খ্যাত জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যিক জেকে রাউলিংকেও পাশে পেয়েছিলেন তিনি। এ বার সেই পাক ‘গ্রুমিং গ্যাং’ নতুন করে চর্চায়।
ব্রিটেনের পাক ‘গ্রুমিং গ্যাং’ বা যৌন শোষণে লিপ্ত অপরাধীচক্রের সঙ্গে জড়িত পাকিস্তানি পুরুষদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে বুধবার পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন ব্রিটেনের আইনসভার সাংসদ (এমপি) রুপার্ট লো।
অভিযুক্ত পুরুষদের হাতে বেশ কয়েক জন নারীর যৌন নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ সম্বলিত ‘ধর্ষণকারী চক্র বিষয়ক তদন্ত প্রতিবেদন’ প্রকাশের ঠিক পরের দিনই তিনি এই পদক্ষেপ করেন।
ব্রিটেনে সক্রিয় ‘গ্রুমিং গ্যাং’ (অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে প্রলুব্ধকারী চক্র) কেলেঙ্কারির ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি পড়ে শোনানোর সময় লো দাবি করেন যে, বেশ কয়েক জন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তাদের উপর চালানো নির্যাতনের ক্ষেত্রে জাতি এবং ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক নির্যাতিতার জবানবন্দি পড়ে শোনানোর সময় লো বলেন, ‘‘প্রায়ই এমন মন্তব্য করা হত যাতে মনে হত শ্বেতাঙ্গ বা খ্রিস্টান মেয়েদের নৈতিকতা বা মূল্যবোধ কম। অন্য দিকে মুসলিম মেয়েদের মর্যাদা এবং উচ্চ নৈতিক অবস্থানের অধিকারী হিসাবে বর্ণনা করা হত। আচরণের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে এবং আরও বেশি অপমান এবং নিয়ন্ত্রণ করতে এই তুলনাগুলো ব্যবহার করা হত।’’
পার্লামেন্টে জবানবন্দিগুলো পড়ে শোনানোর আগে ব্রিটেনের ওই এমপি সমাজমাধ্যম এক্স-এর একটি পোস্টে লেখেন, ‘‘মামলা দায়ের বা পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে আমরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করছি। তবে স্বাধীন ভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার উপর আমার খুব একটা আস্থা নেই। আর সে কারণেই আমরা ব্যক্তিগত ভাবে আইনি পদক্ষেপ (প্রাইভেট প্রসিকিউশন) ও দেওয়ানি মামলার পথ বেছে নিচ্ছি।’’
লো তাঁর পোস্টে আরও লেখেন, ‘‘একটি ‘টার্গেট লিস্ট’ বা লক্ষ্যভুক্তদের তালিকা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেই তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। সুস্পষ্ট কারণেই পুরো বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। তবে আমি পদক্ষেপ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অনেক কথা হয়েছে, এখন আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট— অপরাধীদের কারাগারে পাঠানো এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। আমরা বেশি কথা না বলে কাজ করে দেখাব।’’
ব্রিটিশ এমপি লো-কে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটেনের বিভিন্ন এলাকায় প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের ফাঁদে ফেলে ‘গ্রুমিং গ্যাং’য়ের যৌন নির্যাতনের ঘটনা একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে এ ধরনের অপরাধ এখনও ঘটছে।
লো-এর কথায়, ‘‘আমাদের তদন্ত প্রতিবেদন নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে ধর্ম এবং ধর্ষণকারী দলগুলির মধ্যে একটি অনস্বীকার্য যোগসূত্র রয়েছে। একটি দেশ হিসাবে, আমাদের অবশেষে তা স্বীকার করার মতো সাহস অর্জন করতে হবে। মূলত পাকিস্তানি মুসলিম পুরুষদের দল শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক শ্রেণির অসহায় মেয়েদের উপর সংঘটিত গণধর্ষণ ছিল চরম ও অবাধ নোংরা কর্মকাণ্ড। আমাদের প্রতিবেদনে বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে তা রোধ করতে আমাদের কী করণীয়। আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।’’
আর একটি পোস্টে লো বলেন, ‘‘ব্রিটেনের রাজনৈতিক মহল এমন সব ‘ভিন্ন সংস্কৃতি’ থেকে লক্ষ লক্ষ অভিবাসীকে নিয়ে এসেছে যা ব্রিটিশ জীবনধারার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যহীন।’’ তিনি বলেন, ‘‘কনজ়ারভেটিভ, লেবার এবং রিফর্ম— সব দলের রাজনীতিবিদেরাই এই বিপুল সংখ্যক অভিবাসী নিয়ে আসার জন্য সরাসরি দায়ী। ব্যক্তিগত ভাবে, যাঁরা এর জন্য দায়ী, তাঁদের আমি কখনওই ক্ষমা করব না।’’
এক্স-এ করা পোস্টে লো মন্তব্য করেছেন, ‘‘শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক শ্রেণির অসহায় মহিলাদের সঙ্গে মাংসের টুকরোর মতো আচরণ করা হয়েছে। তাঁদের ধর্ষণ, নির্যাতন এবং খুন করা হয়েছে। এটি ছিল একটি জাতিগত আক্রমণ এবং সুপরিকল্পিত হামলা। এই মেয়েদেরই লক্ষ্যবস্তু করার কারণ তাঁরা অসহায়, কমবয়সি এবং শ্বেতাঙ্গ।’’
এমপি বলেন, ‘‘একটি ‘রিস্টোর ব্রিটেন’ সরকার সংস্কারের উদ্দেশ্যে এমন লক্ষ লক্ষ বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করবে যাঁরা আমাদের জীবনধারাকে ঘৃণা করে এবং যাঁদের আমাদের দেশে থাকার কোনও যৌক্তিক কারণ নেই। যদি কোনও পাকিস্তানি পুরুষ কোনও তরুণী ইংরেজ নারীকে গণধর্ষণ করেন? তাঁকে নির্যাতন করেন? এমনকি নিজের পরিচিতদের হাতেও তাঁকে ধর্ষণের জন্য তুলে দেন? তবে আমরা তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেব। এবং আমি সেই দিনটির অপেক্ষায় আছি।’’
লো আরও যোগ করেছেন, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পুরুষদের বহিষ্কারের কারণে যুক্তরাজ্য যদি ‘চরমপন্থী’, ‘বর্ণবাদী’ বা ‘ইসলামবিদ্বেষী’ হিসাবে আখ্যায়িত হয়, তবে তাতে তাঁর কোনও মাথাব্যথা নেই।
লো-এর প্রকাশিত ‘দ্য রেপ গ্যাং এনকোয়ারি রিপোর্ট’ শীর্ষক একটি অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত অর্থায়নে প্রস্তুতকৃত ২১৯ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে এ-ও দাবি করা হয়েছে, ব্রিটেনে পাকিস্তানি পুরুষদের দ্বারা আড়াই লক্ষ শ্বেতাঙ্গ তরুণী এবং মহিলা ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরের শিকার। যদিও এই হিসাব কোনও সুনিশ্চিত নথিবদ্ধ বা সরকারি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি অনুমান-ভিত্তিক হিসাব বলেই মনে করছেন অনেকে।
ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্রিটেনে পাক গ্রুমিং গ্যাংয়ের হাতে ধর্ষণের শিকার এক তরুণী জানিয়েছেন যে, শত শত পাকিস্তানি পুরুষ তাঁকে ধর্ষণ করেছে। তরুণী জানিয়েছেন, তাঁকে এক গাড়ি থেকে অন্য গাড়িতে হস্তান্তর করা হত এবং মাদক প্রয়োগের মাধ্যমে অচেতন করে তাঁর উপর নির্যাতন এবং ধর্ষণ করা হত। প্রতিটি ঘটনায় অপরাধীরা ছিলেন মুসলিম এবং মূলত পাকিস্তানি। এক বার এক নির্যাতনকারী তাঁকে অপহরণ করে একটি সমাধিক্ষেত্রে নিয়ে যায়।