ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে বিশ্বখ্যাত পিৎজ়া ব্র্যান্ড। গোটা বিশ্বেই ব্যবসার হাল খুব একটা সন্তোষজনক নয়। গত তিন-চার বছর ধরে খরচ উত্তরোত্তর বাড়ছে, আর অন্য দিকে লাভের অঙ্ক কমছে। বিভিন্ন ছোট ছোট সংস্থা তুলনায় কম দামে পিৎজ়া-সহ চটজলদি খাবার এনে বড় ফুড চেনটির সঙ্গে পাল্লা দিতে শুরু করেছে। সঙ্কটের মুখে নামজাদা আমেরিকান পিৎজ়া রেস্তরাঁ চেন ‘পিৎজ়া হাট’।
লাভের মুখ না দেখায় ‘পিৎজ়া হাট’ বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফাস্ট ফুড চেনের মালিক ইয়াম ব্র্যান্ডস। ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে দীর্ঘ দিন ধরে ধুঁকতে থাকা ৬৮ বছরের পুরনো পিৎজ়ার ব্র্যান্ডটিকে মূল সংস্থা ২৭০ কোটি ডলারে বিক্রি করে দেবে। এর মধ্যে চিনের মূল ভূখণ্ডে থাকা ব্যবসায়িক কেন্দ্রগুলি বাদে বাকি বিশ্বের ব্যবসাটি কিনে নিচ্ছে বেসরকারি ইক্যুইটি ফার্ম লংরেঞ্জ ক্যাপিটাল।
ইয়াম ব্র্যান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৫০ কোটির বিনিময়ে লংরেঞ্জ ক্যাপিটালের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হবে ‘পিৎজ়া হাট’। চিনের মূল ভূখণ্ডে ‘পিৎজ়া হাট’কে প্রায় ১২০ কোটি ডলারে কিনে নেবে ইয়াম চায়না হোল্ডিংস ইনকর্পোরেটেড। ২০১৬ সালে ইয়াম ব্র্যান্ডস থেকে আলাদা হয়ে, ইয়াম চায়না হোল্ডিংস ইনকর্পোরেটেড একটি স্বাধীন সংস্থা হিসাবে পথচলা শুরু করেছিল।
আমেরিকার বাইরে পিৎজ়া হাটের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার রয়েছে মান্দারিনভাষীদের দখলে। সারা বিশ্বের মোট বিকিকিনির১৯ শতাংশ। ইয়াম চায়নার হাতেই চিনের পিৎজ়ার বাজার ধরা থাকবে বলে জানিয়েছে পিৎজ়া হাটের মূল সংস্থা।
দীর্ঘ দিন ধরে ব্র্যান্ডটিকে পরিচালনা করে আসছে ইয়াম ব্র্যান্ডস। সংস্থার অধীনে রয়েছে আরও একাধিক আন্তর্জাতিক ফাস্ট ফুড ব্র্যান্ড। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিৎজ়া হাটের ব্যবসা আগের মতো নেই। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন ধরনের খাবারের জনপ্রিয়তা এবং অনলাইন ফুড ডেলিভারি সংস্থাগুলির উত্থান বড় পরিবর্তন এনেছে।
প্রায় সাত দশক ধরে ‘পিৎজ়া হাট’ ছিল আমেরিকার অন্যতম পরিচিত রেস্তরাঁ ব্র্যান্ড। দুই ভাই ফ্র্যাঙ্ক ও ড্যান কার্নি তাঁদের মায়ের কাছ থেকে নেওয়া মাত্র ৬০০ ডলারের ঋণ দিয়ে যে ছোট ব্যবসার সূচনা করেছিলেন, সেটিই পরবর্তী কালে পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পিৎজ়া চেনে। লক্ষ লক্ষ গ্রাহককে পিৎজ়ার স্বাদে মজিয়ে রেখেছিল ‘পিৎজ়া হাট’।
রেস্তরাঁ ব্যবসায় কার্নি ভাইদের অভিজ্ঞতা ছিল সামান্যই। তাঁরা গোড়ার দিকে লোকমুখে প্রচারের ওপর নির্ভর করতেন। বিনামূল্যে পিৎজ়ার টুকরো বিলি করতেন এবং ছাত্রছাত্রীদের আকৃষ্ট করার দিকে মনোযোগ দিতেন। এই কৌশলটি কাজে দিয়েছিল। এক বছরের মধ্যেই তাঁরা আরও শাখা খোলেন এবং কোম্পানির প্রথম ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি চালু করেন। আমেরিকা জুড়ে ইটালীয় খাবারটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায়, ব্র্যান্ডটির পরিধি দ্রুত প্রসারিত হয়।
‘পিৎজ়া হাট’ যখন ব্যবসার গোড়াপত্তন করে তখন ঘরে ঘরে সান্ধ্য জলখাবার বা রাতের খাবারের বিকল্প হয়ে ওঠেনি পিৎজ়া। পার্টি বা অনুষ্ঠানের দিনগুলিতেই সীমাবদ্ধ ছিল ইটালীয় এই খাবারটি। মধ্যবিত্তের বসার ঘরেও তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি পিৎজ়া। বিশ্ব জুড়ে হাজার হাজার রেস্তরাঁ গড়ে তোলা এবং পারিবারিক জমায়েতের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হওয়া পিৎজ়া ব্র্যান্ডটির এই দীর্ঘ যাত্রা ছিল অনন্য।
কয়েক দশকের সাফল্য, বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এবং শক্তিশালী ব্র্যান্ড মূল্য থাকা সত্ত্বেও বাজারের পরিবর্তন, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং ফাস্ট ফুড শিল্পের নতুন বাস্তবতার কারণে সংস্থাটিকে এই সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হল। ১৯৫৮ সালে কানসাসের উইচিটাতে খোলা হয় ‘পিৎজ়া হাট’। পরে পেপসিকো ১৯৭৭ সালে এই রেস্তরাঁ চেনটিকে অধিগ্রহণ করে। ১৯৯৭ সালে এর রেস্তরাঁ বিভাগটিকে আলাদা করে দেয়, যা পরে ইয়াম ব্র্যান্ডস নামে পরিচিত হয়। একই ব্র্যান্ডের ছাতার নীচে রয়েছে কেএফসি, টাকো বেলের মতো সংস্থাও।
১৯৯০ এবং ২০০০-এর সালের শুরুতে বেড়ে ওঠা বহু ভারতীয়ের কাছে ‘পিৎজ়া হাট’ মানে শুধু কোনও রেস্তরাঁ নয়। বরং স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বিশেষ স্থান। জন্মদিনের পার্টি, স্কুলের পরীক্ষায় ভাল ফলের উদ্যাপন কিংবা পরিবারের সঙ্গে বিশেষ কোনও দিনের আনন্দ— অনেকের কাছেই এ সব মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিশ্বখ্যাত পিৎজ়া ব্র্যান্ডটির নাম।
ঝাঁ-চকচকে বিদেশি রেস্তরাঁর পরিবেশ, আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা এবং টেবিলে পরিবেশিত গরম গরম পিৎজ়া, সঙ্গে নরম পানীয়— সেই সময়ের বহু পরিবারের কাছে এটি ছিল এক ধরনের বিশেষ বিলাসিতা। সেই যুগে ‘পিৎজ়া হাট’ শুধু একটি আন্তর্জাতিক ফাস্ট ফুড ব্র্যান্ড ছিল না, বরং ভারতের শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের আনন্দ উদ্যাপনের সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছিল।
পিৎজ়া হাটের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা শুরু হওয়ার অন্যতম কারণ হল এর সাম্প্রতিক আর্থিক পারফরম্যান্স। গত বছরের (২০২৫) নভেম্বরে এই ব্র্যান্ডটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন কৌশলগত বিকল্প খতিয়ে দেখা শুরু হয়।
গত বছরে সামগ্রিক ভাবে ইয়াম ব্র্যান্ডসের বিশ্বব্যাপী বিক্রি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও পিৎজ়া হাটের বিক্রি ২ শতাংশ কমে যায়। এই পতন সংস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গ্রাহকদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং ডেলিভারি-কেন্দ্রিক ব্যবসার উত্থান পিৎজ়া হাটের বৃদ্ধির গতিকে প্রভাবিত করেছে।
এর পর ফেব্রুয়ারিতে ইয়াম ব্র্যান্ডস ঘোষণা করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পিৎজ়া হাটের প্রায় ২৫০টি শাখা বন্ধ করার পরিকল্পনা করেছে তারা। এটি ছিল সংস্থার ব্যবসা পুনর্গঠন এবং কম লাভজনক রেস্তরাঁগুলিকে সরিয়ে ফেলার একটি পরিকল্পনা। তার পরেও সংস্থাটির পুনরুজ্জীবন করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ব জুড়ে এখনও পিৎজ়া হাটের ব্যবসা আড়েবহরে নেহাত কম নয়। গত বছরের শেষ পর্যন্ত এই ব্র্যান্ডের মোট ১৯,৯৭৪টি রেস্তরাঁ চালু ছিল। কয়েক দশকের পুরনো ব্র্যান্ড পরিচিতি, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং কোটি কোটি গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক— সব মিলিয়ে ‘পিৎজ়া হাট’ এখনও ফাস্ট ফুড শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে স্পষ্ট যে, শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখা যথেষ্ট নয়। নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের আকর্ষণ করা, ডিজিটাল অর্ডার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য ‘পিৎজ়া হাট’কে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
ব্র্যান্ড বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি সংস্থার মালিকানা পরিবর্তনের বিষয় নয়। বিশ্বব্যাপী ফাস্ট ফুড শিল্পে চলা বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। পুরনো ব্র্যান্ডগুলিকে এখন নতুন প্রজন্মের গ্রাহক, ডিজিটাল বাজার এবং পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টিকে থাকতে হচ্ছে। পিৎজ়া হাটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে, নতুন মালিকানা বা নতুন কৌশল কতটা সফল ভাবে এই পরিবর্তনের মোকাবিলা করতে পারে তার উপর।