ঋতুভেদে নানা ধরনের শাকের আগমনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা রন্ধনপ্রণালী, স্বাদ ও স্মৃতি। লালশাকের মিষ্টি স্বাদ, পুঁইয়ের মোলায়েম গঠন বা নটেশাকের নিজস্ব গন্ধ— প্রতিটি শাকেরই রয়েছে নিজস্ব অনুরাগী-দল। স্বাস্থ্যসচেতনতার নতুন ঢেউয়ের মধ্যেও বাঙালির শাকপ্রীতি অটুট। পাশাপাশি রয়েছে দুর্দান্ত সমস্ত গুণাবলি। এমনই শাকপ্রেমী বাঙালির জন্য রইল ১৮টি শাকের উপকারিতা এবং রান্নার গল্প।
পুঁইশাক: শুধু পাতা দিয়ে দারচিনি ফোড়ন দিয়ে রাঁধা যায় শাকভাজা। কেউ কেউ হিং ফোড়নও দেন। তা ছাড়া ডাঁটা-সহ পুঁইশাক কুমড়ো, আলু, বেগুনের সঙ্গে সুস্বাদু তরকারিও বানানো হয়। পুঁইশাকের চচ্চ়়ড়ি অনেকেরই প্রিয় খাবার। পুঁইশাকে জলের পরিমাণ অনেক বেশি, এতে ফাইবারও প্রচুর পরিমাণে থাকে। এতে ফলিক অ্যাসিডের পরিমাণও বেশি। এতে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ রয়েছে এবং প্রোটিনের ভাল উৎস এই শাক।
হেলেঞ্চাশাক: রক্তে জমে থাকা দূষিত পদার্থ বার করা থেকে লিভারের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য এই শাকের বড়ই সুনাম। একই সঙ্গে বদহজম, বুকজ্বালার সমস্যাও দূর করতে পারে এই শাক। রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে এবং চর্মরোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়েরিয়া, ও হাঁপানি-সহ নানা শারীরিক সমস্যা দূর করতে দারুণ কার্যকরী। শুকনো লঙ্কা, রসুন ফোড়ন দিয়ে এই শাকের কচি ডাঁটা ও পাতা কুচিয়ে ভাজা করা হয়। অথবা বেসন, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা ও মশলা দিয়ে হেলেঞ্চা শাক বড়া হিসেবে ভেজেও খাওয়া যায়।
সর্ষেশাক: ডাল, ভাজা, স্ট্যু— নানা উপায়ে সর্ষেশাক খাওয়া হয়। বেগুন ও সর্ষেবাটা দিয়ে সুস্বাদু হয় সাদা সর্ষের এই শাক। পঞ্জাব-সহ একাধিক রাজ্যে ‘মক্কে দি রোটির’ সঙ্গে সর্ষে শাক জনপ্রিয় একটি খাবার। সর্ষে শাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ ও সি থাকে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এতে থাকা সালফার শরীর ডিটক্স করে, লিভারের স্বাস্থ্য ভাল রাখে।
বেতোশাক: পাতা আর কচি ডগা খাওয়া হয় এই শাকের। বেগুন ভেজেও খেতে পারেন। আবার পাঁচমিশালি শাকে দিলেও খুব সুস্বাদু হয়। আগাছার মতো জন্মায় এই শাক। কিন্তু প্রচুর পরিমাণে জৈব অ্যাসিড থাকে এতে। কৃমি, কোষ্ঠকাঠিন্য, অম্বল সারানোর জন্য উপযুক্ত এই শাক।
কচুশাক: নিরামিষ হলে ভেজানো ছোলা, নারকেলকুচি বা কোরা দিয়ে কচুর ডাঁটা দিয়ে রান্না হয়। আমিষে ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুশাক রাঁধা হয়। আয়রন, ভিটামিন এ এবং ক্যালশিয়ামের চমৎকার উৎস। তাই রক্তাল্পতা প্রতিরোধ করা ও দৃষ্টিশক্তি বাড়ানোর জন্য খুব উপকারী এই শাক।
কলমিশাক: পেঁয়াজ-রসুন দিয়ে শাকভাজা হয়, নয়তো চার-পাঁচ রকমের সব্জি দিয়ে ঘন্টও করা হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে ভিটামিন সি, পটাশিয়াম। এ ছাড়াও রয়েছে সোডিয়াম, আয়রন, ভিটামিন বি৬, ক্যালশিয়াম। লিভার, হার্ট ভাল রাখা, ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করা, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্য কলমিশাকের জুড়ি মেলা ভার।
লালশাক: লালশাক ভাজা খুবই জনপ্রিয়। রসুন-বাদামভাজা দিয়ে ভেজে পোস্ত ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ডালেও দিতে পারেন লালশাক। এতে থাকে প্রচুর আয়রন। এ ছাড়াও ফোলেট, ক্যালশিয়াম, ভিটামিন এ, সি-ও মেলে এতে।
মেথিশাক: ফাইবার, আয়রন, ক্যালশিয়াম, ভিটামিন এ, সি, বি ৬-এ ভরপুর মেথিপাতা। অল্প তেলে মেথিপাতার তরকারি রান্না করেও খাওয়া যায়। ডায়াবিটিসের রোগীদের জন্য ‘সুপারফুড’ও বলা হয়। মেথি ফোড়ন দিয়ে মেথিশাক ভাজা অনেকেরই পছন্দের খাবার।
পালংশাক: আয়রন, ফোলেট, ভিটামিন এ, সি-তে ভরপুর পালংশাক রক্তাল্পতার রোগীদের জন্য ভাল। পালংশাক গরম জলে ভাপিয়ে যে কোনও তরকারিতে দেওয়া যায়। অথবা কেবল শাকভাজা করে খেলেও ভাল লাগবে।
ঢেঁকিশাক: এর শুধুমাত্র কচি পাতা এবং পেঁচানো নরম ডাঁটাগুলি বেছে নেওয়া হয় খাওয়ার জন্য। শাক ভাপিয়ে নিয়ে রসুন-পেঁয়াজ-লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে আলু বা নারকেলকোরা দিয়ে সাধারণ ভাজা হিসেবে এটি চমৎকার লাগে। এর পটাশিয়াম উচ্চ রক্তচাপ কমায় এবং হার্ট সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। শাকটিতে প্রচুর ভিটামিন এ রয়েছে বলে চোখের স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ত্বকের জৌলুস ধরে রাখে। এ ছাড়া ফাইবার এবং কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স থাকার কারণে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
মুলোশাক: মুলো ছোট ছোট করে কুচি করে, আদাবাটা দিয়ে পাতাগুলি ভেজে শাকের দুর্দান্ত পদ হয়। হালকা তেতো বলে অনেকে লাবড়ার মতো তরকারিতেও ব্যবহার করেন। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সর্দি-কাশি থেকে রক্ষা করে। ফাইবারের কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয় এবং হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে সাহায্য করে। তা ছাড়া আয়রন ও ক্যালশিয়াম রক্তাল্পতা দূর করে, হাড় মজবুত রাখে।
কুমড়োশাক: শাকের ভর্তা বানাতে গেলে কুমড়োশাকই উপযুক্ত। কুমড়ো শাক ভাপিয়ে তার সঙ্গে রসুন-পেঁয়াজ-শুকনো লঙ্কা ভেজে হাতে মেখে বানানো হয় এই ভর্তা। এতে ভিটামিন এ আর সি রয়েছে, যা দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে এবং ত্বক ও চুলের ঔজ্জ্বল্য বাড়ায়। ক্যালশিয়াম ও ফসফরাস হাড় ও দাঁত মজবুত রাখে।
লাউশাক: কুমড়োশাকের মতোই ভর্তা করে খেতে পারেন লাউশাক। অথবা ভাপানো লাউশাকের সঙ্গে কাঁচা পোস্তবাটা মেখে একথালা ভাত খেয়ে নিতে পারেন। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালশিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়াম থাকে বলে হাড় ও দাঁত মজবুত রাখার কাজ ভাল করে। এবং অস্টিয়োপোরোসিসের ঝুঁকি কমায়।
ব্রাহ্মীশাক: ব্রাহ্মী শাক স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য সুখ্যাত। মস্তিষ্কের কার্যকারিতাও বাড়াতে পারে বলে পড়ুয়াদের জন্য দারুণ পথ্য এটি। শাকটি কুচিয়ে সামান্য ঘি, রসুন ও কালোজিরে দিয়ে ভেজে গরম ভাতের সঙ্গে প্রথম পাতে খাওয়া যায়।
নটেশাক: সাদা নটেশাক রসুন ও বেগুন দিয়ে ভেজে খাওয়া হয়। এই শাকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন রয়েছে, যা শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। তাই রক্তাল্পতা কমানোর জন্য খুব কার্যকরী। উচ্চ মাত্রার ক্যালশিয়াম ও ফসফরাস হাড় ও দাঁতের গঠন শক্ত করে। এই শাকের রস লিভারের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বার করতে সাহায্য করে।
নাপাশাক: উত্তরবঙ্গের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর ঐতিহ্যবাহী শাক। সে সব জায়গায় একে বলে ‘বকচয়’। এতে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, ফাইবার এবং ভিটামিন আছে বলে হজমশক্তি বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং পেটের নানাবিধ সমস্যা কমায়। উত্তরবঙ্গে গরম স্যুপে এই শাক মেশানোর রীতি রয়েছে। তবে কেউ কেউ এই শাকপাতা ভেজেও খান।
পাটশাক: পেঁয়াজ-রসুন দিয়ে শাকভাজা যেমন খেতে পারেন, তেমনই বেসনে ডুবিয়ে ভেজে বড়া হিসেবেও খান অনেকে। উচ্চ ফাইবার ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ হওয়ায় হজমশক্তি বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এই শাক। এতে থাকা প্রচুর আয়রন রক্তাল্পতা দূর করে। অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ও ম্যাগনেশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে অনিদ্রা দূর করতে এবং হার্ট ভাল রাখে।