‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’, বলে গিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। মহান এই উক্তি প্রায় কোনও ভারতীয়ের অজানা নয়। ভিন্দেশিদের কাছেও স্বামী বিবেকানন্দের উল্লেখযোগ্যতা কিছু কম নয়। হয়তো এই বাণীকেই জীবনের সত্য মেনে ছিলেন বছর পঁয়ষট্টির গ্যারি ফ্রিম্যান। কিন্তু সেই জীবই কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ।
সাউথ আফ্রিকার বাসিন্দা ফ্রিম্যান পেশায় রেঞ্জার এবং এক উদ্যানের যৌথ মালিক। পর্যটকদের জঙ্গল ঘুরিয়ে দেখানোই ছিল তাঁর নেশা।
ফ্রিম্যানের যৌথ ভাবে কেনা উদ্যানটির নাম ক্লাজ়েরি প্রাইভেট নেচার রিজ়ার্ভ, যা সাউথ আফ্রিকার ক্রুগের জাতীয় উদ্যানের অর্ন্তগত।
১৯৬৯ সালে ফ্রিম্যান ছাড়াও আরও ৩৬টি খামারের মালিকেরা যৌথ ভাবে বিশ্বের অন্যতম পাঁচ বড় প্রাণীকে সংরক্ষণ করার জন্য ক্লাজ়েরি প্রাইভেট নেচার রিজ়ার্ভ তৈরি করেন।
এই পাঁচ প্রাণীর মধ্যে রয়েছে হাতি, গন্ডার, সিংহ, মোষ এবং চিতাবাঘ। এ ছাড়াও ক্লাজ়েরিতে জিরাফ, হায়না-সহ আরও নানা বন্য প্রাণী এবং পাখি বসবাস করে। এই উদ্যান তাদের কাছে এক নিরাপদ আশ্রয়। সেখানে শিকারির হাতে প্রাণ হারানোর ভয় তাদের তাড়া করে বেড়ায় না।
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হওয়ার পর সেই দিকে আর এগোননি ফ্রিম্যান। পশুদের প্রতি প্রেম এবং জঙ্গল ঘোরার নেশায় তিনি রেঞ্জারের পেশায় যোগ দেন।
বিগত ৩৩ বছর ধরে ফ্রিম্যান রেঞ্জার পেশার সঙ্গে যুক্ত। পর্যটকদের জঙ্গল ঘুরে দেখানোই ছিল তাঁর পছন্দের কাজ। সেই সময় তিনি তাঁদের মজার নানা গল্পও শোনাতেন।
ক্লাজ়েরিতে থাকা বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে ফ্রিম্যানের সবচেয়ে কাছের ছিল হাতিরা। সাফারি চলাকালীন কোনও হাতি যদি বেগতিক কিছু করে বসত, তাতেও ফ্রিম্যান চটে যেতেন না। উল্টে ভাল ভাবে কথোপকথনের দ্বারা কী ভাবে তাকে শান্ত করা যায় সেই চেষ্টাই করতেন।
ফ্রিম্যান বলতেন, ‘‘কোনও হাতিকে গুলি করে মেরে ফেলার চেয়ে আমি সেই হাতির আক্রমণে মরে যাওয়াকে ভাল বলে মনে করি।’’ ঠিক সেই ঘটনাই ঘটল ফ্রিম্যানের সঙ্গে। স্নেহের হাতিই কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ।
৯ এপ্রিল ২০২৬, বৃহস্পতিবার। চার জন পর্যটক নিয়ে ক্লাজ়েরি ঘোরাতে গিয়েছিলেন ফ্রিম্যান। তখনই একটি হাতি তাঁদের দিকে তেড়ে আসে।
ফ্রিম্যান তাঁর হাতে থাকা বন্দুক উঁচিয়ে হাতিটিকে ভয় দেখান। কেবল ভয়ই দেখান। স্বভাববশত গুলি চালানোর কথা তিনি ভেবেও দেখেননি।
কিন্তু গুলি না চালানোটাই কাল হয়ে নেমে আসে ফ্রিম্যানের কপালে। মুহূর্তে হাতিটি হামলা করে। স্থানীয় সূত্রে খবর, হাতিটি এত দ্রুত ফ্রিম্যানের দিকে ছুটে যায় যে আর কিছু করার উপায় ছিল না।
ফ্রিম্যানের সঙ্গে থাকা পর্যটকেরা কোনও মতে তাঁকে সেখান থেকে উদ্ধার করেন। গাড়ি করে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা। কিন্তু পথেই মৃত্যু হয় তাঁর।
পর্যটকদের মতে, হাতিটি ফ্রিম্যানকে এতটাই ভয়াবহ ভাবে আঘাত করে যে তাঁর আর বাঁচার কোনও আশা ছিল না। তাঁর প্রাণ বাঁচানোর সুযোগই পাননি তাঁরা।
লিম্পোপো প্রদেশ থানার পুলিশে এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। প্রাণী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা দল গঠন করা হয়েছে যাঁরা খতিয়ে দেখবেন হাতিটি মানুষের জন্য বিপজ্জনক কি না।
প্রিয় প্রাণীর আক্রমণে ফ্রিম্যানের চলে যাওয়া স্থানীয়দের দুঃখ দিয়েছে। অতীতে তাঁর সঙ্গে সাফারি করে যাওয়া পর্যটকেরাও সমাজমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেছেন।
সকলের মুখে একটাই কথা, ফ্রিম্যান হাতিদের খুব ভালবাসতেন। একই সঙ্গে ভালবাসতেন সবুজে ঘেরা ক্লাজ়েরিকে। সেই মাটিতেই প্রিয় ‘পোষ্যের’ হামলায় প্রাণ হারালেন সাফারিপ্রেমী গ্যারি ফ্রিম্যান।