টানা দশ বছর। কোনও খাবার মুখে তোলেননি। খাবার বলতে স্রেফ গাছের কাঁচা পাতা। দিনরাত তাই চিবিয়ে দিব্যি বেঁচে রয়েছেন ভারতের দক্ষিণের রাজ্যের এই তরুণ। এক দশক ধরে তিনি বনবাসী। নিভৃতবাসের এমন এক জীবন বেছে নিয়েছেন যা খুব কম লোকই কল্পনা করতে পারেন।
শস্য, ডাল, শাকসব্জি এবং মাছ-মাংস ছাড়া মানুষ বেশি দিন সুস্থ থাকতে পারে না। এই ধারণাকে সম্পূর্ণ মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছেন কর্নাটকের বেলাগাভি জেলার এই বাসিন্দা। পাথুরে খেত এবং গ্রামের সীমান্ত লাগোয়া ঝোপঝাড়ে ভরা বনভূমিতে আস্তানা গেড়েছেন ৩৪ বছর বয়সি বুদান খান হোসামানির। আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা তাঁকে ভালবেসে ‘মডার্ন ডে টারজ়ান’ বলেই ডাকেন।
সভ্য জীবন থেকে দূরে সরে পাতা এবং ভেষজ উদ্ভিদের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে জীবনযাপন করছেন বুদান। আশ্চর্যজনক ভাবে, এই দীর্ঘ এক দশকে তিনি কখনও অসুস্থ হননি। কখনও ওষুধের সাহায্য বা হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়নি।
১০ বছর ধরে, তিনি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। রান্না করা খাবার মুখে তোলা তো দূর, নাগরিক জীবনের কোনও স্বাচ্ছন্দ্যের কোনও প্রয়োজন পড়ে না এই তরুণের।
১০ বছর আগে বুদান বাড়ি ছেড়ে তাঁর গ্রামের উপকণ্ঠে হেগগোল্লা পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস আরম্ভ করেন। তার পর থেকে, সমস্ত সামাজিক যোগাযোগ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে দূরেই রয়েছেন। তাঁর নিত্য দিনের খাবার মুঠো মুঠো গাছের পাতা।
বুদানের দাবি, তিনি বনে বসবাসকারী বানরদের কাছ থেকে এই অনন্য জীবনধারা শিখেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর গোটা জীবনটাই বদলে দিয়েছে। বনে বানরের দলকে পর্যবেক্ষণের পর থেকে তাঁর জীবনযাত্রা পাল্টে গিয়েছিল। তিনি প্রায়শই লক্ষ করতেন শুধুমাত্র গাছের পাতা খেয়ে সুস্থ ও সক্রিয় থাকে বানরের প্রজাতিরা। কোনও রান্না করা খাবারের দরকার পড়ে না তাদের।
কৌতূহলবশত, তিনি কিছু গাছের পাতার স্বাদ নিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে, তিনি কাঁচা পাতার স্বাদ এবং শরীরে এর প্রভাব উপলব্ধি করতে শুরু করেন। এর পরে তিনি রুটি, ভাত এবং অন্যান্য রান্না করা খাবার খাওয়া পুরোপুরি ছেড়ে দেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির উপর তাঁর এই আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সম্পূর্ণ ভাবে পাতা এবং ভেষজ গাছগাছড়ার উপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই পরিবর্তনটি হঠাৎ করে নেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং তাঁর সুচিন্তিত মনোভাব কাজ করেছিল।
তাঁর পরিচিতেরা অবশ্য অন্য কাহিনিই শুনিয়েছেন। তাঁরা জানান, পরিবারের বিয়ের চাপেই বিবাগী হয়ে ‘টারজ়ানে’ পরিণত হয়েছেন বুদান। পরিবারের তরফে বিয়ের জন্য জোরাজুরি করা হচ্ছিল তাঁকে। পরিবারের ‘বিয়ের অত্যাচারে’ ঘরছাড়া হতে বাধ্য হয়েছেন এই তরুণ। এর পর বনেই খুঁজে পান শান্তি।
এই ঘটনার কথা স্বীকার করে নিয়েছে বুদানের পরিবারও। তাঁর বাবা-মা এবং দুই ভাই গ্রামেই থাকেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ঘরের ছেলেকে বহু বারই বাড়িতে ফিরে আসতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছেন। যখনই তাঁর বিয়ের প্রসঙ্গ উঠত, তখনই তিনি পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিতেন।
বুদানের বাবা-মা তাঁকে অবিবাহিত থাকার অনুমতি দেওয়ার পরেও তিনি বনবাসী জীবন ত্যাগ করে সংসারজীবনে ফিরতে চায়নি। তাঁর মা জানিয়েছেন, ছেলে অত্যন্ত একগুঁয়ে। পরিবারে ফিরতে চায় না। তাই তাঁকে ফিরিয়ে আনার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বন ছেড়ে বাড়ি ফিরতে রাজি হননি বুদান।
বুদান যে পাহাড়ে থাকেন সেখানে ১৫০ থেকে ২০০ ধরনের গাছপালা রয়েছে। তিনি দিনে প্রায় ছ’বার বিভিন্ন পাতা খান। আধুনিক যুগের টারজ়ানের দাবি, পাতাগুলি স্বাদে মিষ্টি এবং দীর্ঘ সময় ধরে পেট ভরিয়ে রাখে। তবে, যখনই তিনি গ্রামে যান, তিনি খুব সীমিত পরিমাণে চা বা স্যুপ খান। পাতাগুলিই তাঁর রোজের খাবার। প্রকৃতির কাছে প্রতিটি প্রয়োজনের সমাধান রয়েছে, তাই-ই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন বুদান।
গত ১০ বছরে তিনি এক বারও অসুস্থ হননি বলে দাবি তরুণের। তাঁকে এক বারও হাসপাতালে যেতে হয়নি বা কোনও ওষুধের প্রয়োজন হয়নি। শুধুমাত্র বনের সবুজ গাছপালা খেয়ে বেঁচে থাকা সত্ত্বেও, বুদানের দেহ সুগঠিত। অনেকেই তাঁকে সিক্স প্যাকের অধিকারী বলে বর্ণনা করেছেন। অনেক স্থানীয়দের কাছেই ঈর্ষার পাত্র হয়ে উঠছেন বুদান। তাঁর অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস এবং রুটিন সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি হয়েছে এলাকায়।
দীর্ঘ সময় ধরে বানরদের পর্যবেক্ষণ করেছেন বুদান। শিখেছেন কোন পাতা খাবেন আর কোনটি খাবেন না। তিনি প্রতি দিন বনের ভেতরে একা একা অনেকটা পথ হেঁটে বেড়ান। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য কয়েকটি যোগব্যায়াম করেন। তাতেই শরীরের কোনও সমস্যা ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেনি বুদানের। কাঁচা গাছপালা হজম করতে এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এই ক’টি ব্যায়াম।
দীর্ঘ দিন ধরে গাছের পাতা খাওয়ার কারণে এলাকায় ব্যাপক পরিচিত বুদান খান। এলাকার সবাই তাঁর এই খাদ্যাভ্যাসের কারণে বিস্মিত। শুধুমাত্র পাতা খেয়ে বেঁচে থাকার ঘটনা বিরল হলেও একেবারে অস্বাভাবিক নয়।
পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশে এক প্রৌঢ় রয়েছেন যিনি গত ২৫ বছর ধরে গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে রয়েছেন। নাম মেহমুদ বাট। স্রেফ গাছের ডাল আর পাতা খেয়ে বেঁচে আছেন তিনি। মারাত্মক দারিদ্রের কবলে পড়ে বাধ্য হয়ে জীবনধারণের জন্য এই পন্থা বেছে নিয়েছিলেন তিনি।